Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

তারা খসার রহস্য

মেঘমুক্ত চাঁদবিহীন রাতের ঘন কালো আকাশে অনেক সময় নক্ষত্রের মতো ছোট উজ্জ্বল মহাজাগতিক বস্তুকে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসতে দেখা যায়।

তারা খসার রহস্য
  • ৫ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০

‘তারা খসা’ শব্দটার সঙ্গে আমাদের সকলেরই পরিচয় রয়েছে। সত্যিই কি আকাশ থেকে তারা খসে পড়ে? কেন দেখা যায় এই মহাজাগতিক দৃশ্য, তারই কারণ জানালেন কল্যাণকুমার দে

Advertisement

মেঘমুক্ত চাঁদবিহীন রাতের ঘন কালো আকাশে অনেক সময় নক্ষত্রের মতো ছোট উজ্জ্বল মহাজাগতিক বস্তুকে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসতে দেখা যায়। এই বস্তুগুলোকে উল্কা বলা হয়। গ্রাম বাংলায় একে বলা হয় ‘তারা খসা’ বা ‘নক্ষত্র পতন’। আগে সাধারণ মানুষ মনে করত, আকাশের তারাই কোনও কারণে খসে পড়লে এই তারা খসা দেখা যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, খসে পড়া তারার সঙ্গে প্রকৃত তারার কোনও সম্পর্ক নেই। কারণ নক্ষত্ররা আকারে অনেক বড়। গ্রহের থেকেও বহুগুণ বড়। আকাশের তারাগুলো রয়েছে লক্ষ কোটি কিলোমিটার দূরে। আর তারা খসা ঘটনা ঘটে ভূপৃষ্ঠ থেকে মাত্র কয়েকশো কিলোমিটার দূরে। তারাদের নিজস্ব আলো ও উত্তাপ আছে। অথচ উল্কাদের কোনও নিজস্ব আলো বা তাপ থাকে না। মহাকাশে নানা ধরণের ছোট ছোট মহাকাশীয় বস্তু ভেসে বেড়ায়। এগুলো আসলে গ্রহাণু বা ধূমকেতুর টুকরো। এগুলোকেই বলা হয় উল্কা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উল্কা আকারে ছোট। উল্কার আকার সাধারণত ৩০ মাইক্রোমিটার থেকে ১ মিটার ব্যাসের হয়। এই বস্তুগুলো যখন কোনও গ্রহ-নক্ষত্রের কাছাকাছি চলে আসে, তখন তাদের আকর্ষণে বস্তুগুলো তাদের দিকে চলে যায়। এই ঘটনা মহাকাশের সকল গ্রহ-নক্ষত্র, এমনকী চাঁদের মতো উপগ্রহেও ঘটে থাকে। চাঁদের মহাকর্ষ বল পৃথিবীর তুলনায় কম। সেখানেও কিছু উল্কাখণ্ড পড়ে, কিন্তু তাকে উল্কাবৃষ্টি বলা যাবে না। কারণ চাঁদের কোনও বায়ুমণ্ডল নেই। তাই চাঁদে যেসব উল্কাখণ্ড পড়ে, সেগুলো পাথরের কণা বা জমাট বাঁধা মহাজাগতিক ধূলিকণা হিসাবেই পড়ে। এদের আঘাতে চাঁদের মাটিতে ছোট ছোট গর্ত সৃষ্টি হয়।
পৃথিবীর দিকে ছুটে আসা অধিকাংশ উল্কাপিণ্ডের উৎস ধূমকেতু। ধূমকেতু মাঝেমধ্যে আকাশে দেখা যায়। সূর্যের চারপাশে এক চক্কর দিয়ে আবার দূরে চলে যায়। এদের চলার পথ অনেকটা ডিমের আকৃতির মতো। হ্যালির ধূমকেতুর কথা আমরা জানি। একবার সূর্য প্রদক্ষিণ করে আবার প্রায় ৭৬ বছর পর ফিরে আসে। এ ধরনের আরও কিছু ধূমকেতু সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। এসময় ধূমকেতুর মূল অংশের কিছু জমাট বাঁধা মহাজাগতিক ধূলিকণা ও অন্যান্য বস্তু আকাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থেকে যায়। পৃথিবী তার কক্ষপথে চলার সময় এসব বস্তুখণ্ডের কাছাকাছি এলে এগুলো মাধ্যাকর্ষণের টানে মাটির দিকে ছুটে আসে। যখন কোনও উল্কা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তখন এর গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে ২০ কিলোমিটার বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় (৭২০০০ কিমি/ঘণ্টা)। এসময় এরোডাইনামিক্স তাপের কারণে উজ্জ্বল আলোর ছটার সৃষ্টি হয়। এই বাহ্যমূর্তির কারণে উল্কাপাতকে তারা খসা বা নক্ষত্র খসা বলে। কিছু কিছু উল্কা একই উৎস থেকে উৎপন্ন হয়ে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে ভেঙে প্রজ্বলিত হয় যাকে উল্কাবৃষ্টি বলে। প্রায় ১৫ হাজার টন পরিমাণ উল্কা, ক্ষুদ্র উল্কাকণা এবং মহাজাগতিক ধূলিকণা প্রতিবছর পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। যখন কোনও উল্কা, ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ড, ধূমকেতু বা গ্রহাণু পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে দ্রুতগতিতে প্রবেশ করে এবং বায়ুর অণুর সঙ্গে সংঘর্ষের মাধ্যমে উত্তপ্ত হওয়ার পরে জ্বলে ওঠে, তখন তাকে উল্কাপাত বলে। উল্কা সাধারণত ৭৬ থেকে ১০০ কিমি উচ্চতায় বায়ুমণ্ডলের মেসোস্ফিয়ারে দেখা যায়। উল্কার মূল শব্দটি এসেছে গ্রিক meteöros থেকে। যার অর্থ ‘উঁচু বাতাস’।
বেশিরভাগ উল্কাই মহাকাশে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। যেগুলো পুরোটা পুড়ে ছাই হতে পারে না, সেগুলো পৃথিবী পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। এগুলিই উল্কাপিণ্ড। পৃথিবীর বুকে আছড়ে পড়া যে সকল উল্কাপিণ্ডের অবশেষ পাওয়া যায়, তাদের বেশির ভাগের রং হয় কালো। প্রচণ্ড তাপে বহির্ভাগ পুড়ে যাওয়ার কারণে এগুলোর রং কালো হয়।
পৃথিবীতে পাওয়া সবচেয়ে বড় উল্কাপিণ্ড হল ১৯২০ সালে নামিবিয়াতে আবিষ্কৃত হোবা উল্কা। হোবা উল্কাটির ওজন প্রায় ৫৪ হাজার কিলোগ্রাম। হোবা উল্কাপিণ্ডটি এত বড় ও ভারী যে এটি যেখান থেকে পাওয়া গিয়েছে, সেখান থেকে সরানো হয়নি। হোবা উল্কাপিণ্ডটি ৮০ হাজার বছর আগে পৃথিবীতে এসে পড়ে।
কোটি কোটি বছর আগে পৃথিবীতে বিচরণ করত ডাইনোসর। বিজ্ঞানীদের ধারণা, ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে প্রায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার প্রশস্ত গ্রহাণুর আঘাতে পৃথিবী থেকে ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু ২০২০ সালে ডাইনোসরের জীবাশ্মের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ডাইনোসরদের বিলুপ্তির প্রক্রিয়া গ্রহাণুর আঘাতের অন্তত ৫ কোটি বছর আগেই শুরু হয়েছিল। পৃথিবীর জলবায়ু ও পরিবেশের ক্রমবর্ধমান পরিবর্তন ডাইনোসরদের জন্য বেঁচে থাকা কঠিন করে তুলেছিল। অবশেষে গ্রহাণুর আঘাতে ডাইনোসররা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়।
১৯৫৪ সালের ৩০ নভেম্বর। যুক্তরাষ্ট্রের আলবামার সিলাকগা শহরে অ্যান এলিজাবেথ ফাউলার হজেস নামে ৩৪ বছর বয়সি এক মহিলা একটি উল্কাঘাতে আহত হয়। উল্কাপিণ্ডের ওজন ছিল প্রায় সাড়ে ৮ পাউন্ড বা প্রায় ৪ কেজি। সেই উল্কাপিণ্ডটি এখন রাখা আছে যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথসোনিয়ানাস ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব ন্যাচারাল হিস্ট্রিতে। ইতিহাসে একমাত্র উল্কাঘাতে জখম মানুষ এই অ্যান এলিজাবেথ। আর কেউ এরকম আঘাত পেয়েছেন বলে জানা যায় না। ১৯৭২ সালে ভেনিজুয়েলায় একটি গোরু মারা যায় উল্কাঘাতে। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আরও বড় পরিসরের একটি ঘটনা ঘটে রাশিয়ার চেলইয়াবিনস্কে। সেখানে একটি উল্কা সনিক বুম বা শব্দ-নিনাদ তৈরি করে। অর্থাৎ প্রচণ্ড বেগে শব্দতরঙ্গ ছুটে যায় চারদিকে। এর আঘাতে ভেঙে পড়ে জানলার কাচসহ আরও অনেক কিছু। ওই ঘটনায় আহত হন প্রায় ১ হাজার মানুষ।
উল্কাপাতের ঘটনা যে কোনও সময়ই হতে পারে। তবে উল্কাপাতের কিছু সুনির্দিষ্ট সময় আছে। এই সময় ঝাঁক বেঁধে উল্কাপতন ঘটে। এই উল্কাপাত যে নক্ষত্রমণ্ডল বরাবর হয়, তার নামেই উল্কাপাতের নামকরণ করা হয়। কোয়াড্রানটিকস: জানুয়ারি মাসে ৩-৪ তারিখে বুটিস নক্ষত্রমণ্ডলে এই উল্কাবৃষ্টি দেখা যায়। প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৪০টির বেশি বড় এবং উজ্জ্বল উল্কা দেখা যায়। এই উল্কাপিণ্ডগুলো সেকেন্ডে ২৫.৫ মাইল বেগে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। এর মধ্যে কিছু উল্কা এতটাই উজ্জ্বল থাকে যে, এগুলো নিভে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ পর্যন্ত আলোর রেখা আকাশে দেখা যায়।
লাইরিডস: এপ্রিল মাসের ১৬ থেকে ২৬ তারিখের মধ্যে দেখা যায়। এই উল্কাপাত বীণা নক্ষত্রমণ্ডলের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র অভিজিৎ বরাবর দেখা যায়।
পাই পাপিডস: এই উল্কাপাত এপ্রিল মাসের ২৩ তারিখের দিকে দেখা যায়। তবে এটি নিয়মিতভাবে প্রতি বৎসরই দেখা যায় না। ইটা কুম্ভ: এপ্রিল মাসের ২১ থেকে মে মাসের ২০ তারিখের ভিতরে দেখা যায়। এর উৎস হ্যালির ধূমকেতু। আরিয়েটিডস: মে মাসের ২২ থেকে জুলাই মাসের ২ তারিখের ভিতরে দেখা যায়। জুন বুটিস: জুন মাসের ২৬ তারিখ থেকে জুলাই মাসের ২ তারিখের ভিতরে এই উল্কাবৃষ্টি হয়।
দক্ষিণাঞ্চলীয় ডেল্টা কুম্ভ: জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহের ভিতরে এই উল্কাপাত ঘটে। আলফা মকর: ১৫ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত এই উল্কাপাত হয়। ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে এই উল্কাপাত আবিষ্কার করেছিলেন হাঙ্গেরিয়ান জ্যোতির্বিজ্ঞানী মিকলোস ভন কনকোলি। পারসিডস: জুলাই মাসের ২৩ তারিখ থেকে আগস্ট মাসের ২০ তারিখের ভিতরে এই উল্কাপাত হয়। কাপ্পা সিগনিস: জুলাই মাসের ৩ তারিখ থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এই উল্কাপাত হয়। ২০০৮ ইডি৬৯ নামক গ্রহ এই উল্কাপাতের উৎস। উল্লেখ্য, এটি সিগন্যাস নক্ষত্রমণ্ডলের কাপ্পা সিগনি নামক নক্ষত্রের একটি ক্ষুদ্রাকার গ্রহ। অরিগিডস: সেপ্টেম্বর মাসের দিকে এই উল্কাপাত ঘটে।
উল্কাপিণ্ড তিন রকমের হয়। এক ধরনের উল্কাপিণ্ড হচ্ছে খনিজ সিলিকেট দিয়ে গঠিত পাথর সমৃদ্ধ। আরেক ধরনের উল্কাপিণ্ড লোহা সমৃদ্ধ। যা লোহা-নিকেল দিয়ে তৈরি। আর সর্বশেষ রকমের উল্কাপিণ্ড বিভিন্ন রকম পাথর ও ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরি। এগুলো লোহা ও পাথর সমৃদ্ধ উল্কাপিণ্ড। তবে বেশিরভাগই হল পাথর উল্কাপিণ্ড। এই পাথর উল্কাপিণ্ড আবার কন্ড্রাইট ও একন্ড্রাইট—এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। পৃথিবীতে পতিত হওয়া ৮৭ শতাংশ উল্কাপিণ্ডই কন্ড্রাইট শ্রেণির এবং ১৩ শতাংশ একন্ড্রাইট শ্রেণির। কন্ড্রাইটগুলি এমন উপাদান দিয়ে তৈরি যা আমাদের সূর্যের রাসায়নিক গঠনের সঙ্গে খুব সাদৃশ্যপূর্ণ। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস, কন্ড্রাইটগুলির গঠন সৌর নীহারিকাতে হয়েছিল। কন্ড্রাইটগুলির মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হল কার্বোনেশিয়াম কন্ড্রাইট। এই কন্ড্রাইটগুলিতে জৈব যৌগ থাকে, যেমন—কার্বন, অ্যামিনো অ্যাসিড, বহির্জাগতিক রাইবোজ শর্করা, যা জীবনের ভিত্তি। অ্যাকন্ড্রাইট উল্কাপিণ্ড যাদের নামের অর্থ ‘কন্ড্রাইট ছাড়া’, তারা তুলনামূলকভাবে ছোট কিন্তু বৈচিত্র্যময়।
উল্কাপাত দেখে প্রার্থনা জানানোর শুরু টলেমির আমলে। দ্বিতীয় শতকে গ্রিক গণিতবিদ উল্কাপাতের উৎপত্তির একটা তত্ত্ব খাড়া করেন। তখন সব গ্রহ-নক্ষত্রকেই ভাবা হতো স্বর্গীয় বস্তু। টলেমির বিশ্বাস ছিল, ঈশ্বর কখনও কৌতূহলে বা কখনও একঘেয়েমিবশত স্বর্গের গোলক থেকে পৃথিবীর গোলকের দিকে তাকান। যখন পৃথিবীর আকাশ ভেদ করে পৃথিবীকে দেখেন, তখন ওই ছিদ্র দিয়ে দুয়েকটা তারা পৃথিবীতে খসে পড়ে। ধারণা করা হয়, টলেমির এই তত্ত্ব থেকেই উল্কাপাত দেখে ‘উইশ’ করার সংস্কৃতির শুরু।

সম্পর্কিত সংবাদ