Bartaman Logo
৩ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

ঝিলের নাম কঙ্কনা

দারুণ দারুণ ঘোরার জায়গা সব যদি ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকায় হয় তাহলে মধ্যবিত্ত বাঙালি কীভাবে যাবে? তাঁর কি ইচ্ছা করে না আইফেল টাওয়ার, পিরামিড, নায়াগ্রা দেখতে! কত বিশ্ববিখ্যাত লেক আছে।

ঝিলের নাম কঙ্কনা
  • ৫ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০

দারুণ দারুণ ঘোরার জায়গা সব যদি ইউরোপ, আফ্রিকা, আমেরিকায় হয় তাহলে মধ্যবিত্ত বাঙালি কীভাবে যাবে? তাঁর কি ইচ্ছা করে না আইফেল টাওয়ার, পিরামিড, নায়াগ্রা দেখতে! কত বিশ্ববিখ্যাত লেক আছে। আমেরিকার লেক সুপিরিয়র, আফ্রিকার লেক ভিক্টোরিয়া, দক্ষিণ আমেরিকার লেক তিতিকাকা। আর কোথায় আমাদের গ্রামের ঝিল! বিদেশে যাওয়ার রেস্ত যখন নেই তখন দেশি ঝিলকেই বিদেশি মনে করে ঘুরে আসি এক প্রাচীন জনপদে। বাড়তি পাওনা, পরিযায়ী পাখিদের দেখা।

Advertisement

যমুনা নদীর তীরে সে এক প্রাচীন জনপদ। এ যমুনা অবশ্য রাধা-কৃষ্ণর যমুনা নয়। উত্তর ২৪ পরগনার একটি নদী। আসলে যমুনা ও সরস্বতী নামের নদী আমাদের দেশে অনেক রয়েছে। এক সময়ের বেগবান যমুনা আজ নাব্যতা হারিয়ে মজে যেতে যেতে মৃতপ্রায়। এখানেই আছে এক বিশাল জলাশয়। নদী তার গতিপথ পরিবর্তন করে বিস্তীর্ণ জলাশয় তৈরি করে প্রাকৃতিক নিয়মে। যমুনা নদীর সঙ্গে চালুন্দিয়া নদীর মিলনমুখে তৈরি হয় বড় অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ। চালুন্দিয়া নদীর অস্তিত্ব আজ আর নেই। অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদটি স্থানীয় ভাষায় বাওড় নামে পরিচিত। নাম কঙ্কনা বাওড় বা চণ্ডী ঝিল। পূর্বস্থলীর চুপির চর, সাঁতরাগাছির ঝিল, রসিক বিল, ঢাকুরিয়া লেক, বর্তির বিলের নাম শোনা হলেও কঙ্কনা লেকের নামটি অনেকেরই অজানা।
কঙ্কনা বাওড় নামের পিছনে একটা সুন্দর গল্প আছে। স্থানীয়দের মতে, ভগবান বিষ্ণুর চক্রাঘাতের ফলে এই স্থানেই নাকি পড়েছিল সতী দেবী মায়ের হাতের কঙ্কন। তাই মায়ের নামে কঙ্কনা বাঁওড় বা চণ্ডী ঝিল। আবার অনেকে বলেন, এই জলাশয়ের এক ধারে থাকতেন দেবী চণ্ডী আর ওপারে থাকতেন তার বোন শীতলা। বোনের বাড়ি যাওয়ার পথে কোনও একদিন দেবী চণ্ডীর কঙ্কন এখানে পড়ে গিয়েছিল। তা থেকেই ঝিলের নাম কঙ্কনা। তবে দু’পারেই দেবী চণ্ডী ও দেবী শীতলার মন্দির আজও আছে।
গরমকালে লেকের অধিকাংশ স্থানে জল কমে যায়। আবার বর্ষার সময়ে জলে টইটম্বুর। গাইঘাটা বিধানসভা কেন্দ্রের পাঁচপোতায় উৎপত্তি হওয়া অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ প্রায় সাড়ে ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ। চওড়া গঙ্গার মতো। বেশ গভীর লেকটি জায়গায় জায়গায় ৩০ ফুটের কম নয়। একদিকে রয়েছে বাংলাদেশ সীমান্ত লাগোয়া বসিরহাটের স্বরূপনগর। অন্যদিকে গোবরডাঙা। ভৌগোলিক দিক থেকে অবশ্য কঙ্কনা বাওড়ের বেশিরভাগটাই পড়ছে গোবরডাঙায়। এক সময় কঙ্কনা বাওড়ের আকৃতি ছিল বিশাল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার পরিসর কমেছে। আগের থেকে অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে নাব্যতা। গোবরডাঙা এবং স্বরূপনগরের মধ্যে অবস্থিত কঙ্কনা বাওড়ের আয়তন প্রায় ২৩০ একর। বর্তমানে কঙ্কনা বাওড়কে যমুনা নদীর সঙ্গে যুক্ত করেছে একটি খাল। যা রত্না খাল নামে পরিচিত। খালের মাধ্যমে যমুনা নদীর জল ঢোকে কঙ্ক‍‍না বাওড়ে।
গোবরডাঙা নেমে টোটো ধরে প্রথমেই গেলাম চণ্ডী মন্দির। চণ্ডীতলা ঘাটে ছায়ায় ঘেরা চণ্ডীতলা। বিশাল বটবৃক্ষের নীচে অবস্থিত কঙ্কন চণ্ডী বা কাঁকন চণ্ডী দেবী মায়ের ছোট মন্দির। মায়ের মন্দিরের পাশে শিব মন্দির, শ্রী রাধাকৃষ্ণজীউর মন্দির এবং তুলসীমঞ্চ।
আগে চণ্ডী দেবী মায়ের একজন ভক্ত এই বটবৃক্ষের নীচে ঘট স্থাপন করে নিত্য পুজো করতেন, পরবর্তী সময়ে ভক্ত এবং স্থানীয় লোকজন মিলে পাকা মন্দির নির্মাণ করে। মায়ের মন্দিরের পাশে রয়েছে ঝিল বা বাওড়। ঘাটও করা আছে। এই ঘাটে বসে থাকলে সময় কী করে পার হয়ে যাবে, বোঝা যায় না। বাওড়ের পাশেই একটি পার্ক। কঙ্কনা বিনোদন পার্ক। যেহেতু লেকটি অনেকটা জায়গা জুড়ে, ফলে একই ঝিল বা বাওড়ের স্থানভেদে ভিন্ন নামে পরিচিত। বেড়ি বাওড়, মেদিয়া বাওড়, আশ্রমঘাট বাওড় ইত্যাদি।
শান্ত কাকচক্ষু লেকের বুকে একটু বোটিং করতে ইচ্ছা করতেই পারে।  মাঝির সঙ্গে দরদাম করে নৌকা ভ্রমণ করতে পারেন। পরিযায়ী পাখিদের কাছাকাছি দেখা উপরি লাভ।  
ছোট হতে হতে কঙ্কনা এখন সংকীর্ণ হ্রদ। তবু তার আকর্ষণ বিন্দুমাত্র কমেনি। শীত ও বসন্তে পরিযায়ী পাখির টানে বহু মানুষ ভিড় করে এখানে। কঙ্কনা বাওড়কে পুরোদস্তুর একটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে স্বরূপনগর পঞ্চায়েত সমিতি। তার জন্য পঞ্চায়েত সমিতির তরফে আবেদন জানানো হয়েছে রাজ্য পর্যটন দপ্তরকে। গত বেশ কয়েক দশক ধরে এই জলাশয় পরিযায়ী পাখিদের বিচরণ ক্ষেত্র। প্রতি বছর ডিসেম্বর মাস থেকে পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা শুরু হয়। মার্চ পর্যন্ত পরিযায়ী পাখিদের দেখা মেলে। এই সময় রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরবঙ্গ, ওড়িশা থেকে সিঁথি হাঁস, লালিঝুটি ভুঁতি হাঁস, রামচ্যাগা, নর্দান পিনটেল–সহ বিভিন্ন পরিযায়ী পাখি কঙ্কনা বাওড়ে ডেরা বাঁধে। কঙ্কনা বাওড়ের চারিদিকে রয়েছে সবুজের সমারোহ। সেই পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে পরিযায়ী পাখিরা। পরিযায়ী পাখিদের ক্যামেরা বন্দি করতে কলকাতা–সহ দূরের জেলা থেকে পক্ষীপ্রেমীরা ভিড় করেন গোবরডাঙায়।
এছাড়া কঙ্কনা বাওড় বা চণ্ডী ঝিল টাটকা মাছে ভরা। রুই কাতলা, ভেটকি তো বটেই, গলদা চিংড়ি, পাবদা, ট্যাংরা, মৌরলা, পুঁটি-ধরা পড়ে জালে। মাসে কয়েক কোটি টাকার মাছ ধরেন জেলেরা। যদিও, সরকারি অবহেলার শিকার কঙ্কনা বাওড়। নিয়মিত সংস্কার না হওয়ায় কচুরিপানায় ভরে গিয়েছে। নাব্যতা কমে যাওয়ায় সঙ্কটে জলজ প্রাণীরা।
ফেরার পথে দেখে নিতে পারেন গোবরডাঙার অন্য কিছু দ্রষ্টব্য স্থান। প্রায় ৩৫০ বছরের প্রাচীন প্রসন্নময়ী কালী মন্দির। কালীবাড়ির ঠিক উল্টো দিকে রাজবাড়ি। দুর্গাপুজোর ৪ দিন এই বাড়ি সর্বসাধারণের জন্য খোলা। গোবরডাঙার অতি প্রাচীন প্রসন্নময়ী কালীমন্দিরে দুপুর ১২টায় গেট বন্ধ হয়ে যায়, আর বিকেল ৫টার পর আবার খোলে। জমিদার খেলারাম মুখোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় স্ত্রী দ্রৌপদীর কোনও সন্তান ছিল না, মা কালীর স্বপ্ন পাওয়ার পর তিনি সন্তানলাভ করেন। দেবী প্রসন্ন হওয়ায় সন্তানলাভ বলে জমিদার খেলারাম ছেলের নাম দেন কালীপ্রসন্ন। মন্দিরটি ১৮২২ সালে ১১ এপ্রিল উদ্বোধন করেন জমিদার কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়। বিগ্রহের কষ্টিপাথর দেবীর স্বপ্নাদেশের পর এই যমুনাতেই পাওয়া যায়। মন্দিরের পাশেই আছে সূর্য ঘড়ি। রাজ্যে যে ক’টি সূর্য ঘড়ি আছে, এটি তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়।
কীভাবে যাবেন: শিয়ালদহ থেকে বনগাঁগামী লোকালে ঘণ্টাখানেক গোবরডাঙা স্টেশন। স্টেশনের এক নং প্লাটফর্ম থেকে বেড়িয়ে টোটো বা মোটর ভ্যানে সরাসরি চণ্ডীতলা। সময় লাগে দশ মিনিট। ভাড়া ১০ টাকা করে। সড়কপথে যশোর রোড ধরে বারাসাত, হাবড়া হয়ে গোবরডাঙা।
সুব্রত মুখোপাধ্যায়

সম্পর্কিত সংবাদ