গুঞ্জন ঘোষ: দক্ষিণেশ্বরে নিজের ঘরের ছোট খাটটিতে বসে শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তসঙ্গ করছেন। কথাপ্রসঙ্গে বৈষ্ণবধর্মের সারমর্ম বুঝিয়ে বলছেন, ‘ওই মত তিনটি বিষয় পালন করতে বিশেষভাবে উপদেশ করে — নামে রুচি, জীবে দয়া ও বৈষ্ণব পূজন। অর্থাৎ নাম ও নামী অভেদ জেনে সদা সর্বদা ঈশ্বরের নাম করবে; ভক্ত ও ভগবান, কৃষ্ণ ও বৈষ্ণব অভেদ জেনে সর্বদা সাধু-ভক্তদের শ্রদ্ধা ও পূজা করবে; আর এই জগৎ-সংসার শ্রীকৃষ্ণের এই ধারণা করে সর্বজীবে দয়া — ।’ কিন্তু ‘দয়া’শব্দটি উচ্চারণ করেই তিনি থেমে গেলেন। আর কোনও কথাই বলতে পারছেন না, তারপর মুহূর্তের মধ্যে হঠাৎ সমাধিস্থ হয়ে পড়লেন! উপস্থিত ভক্তেরা আশ্চর্য হয়ে গেলেন হয়ত এই ভেবে যিনি স্বয়ং দয়ানিধি তিনি বুঝি দয়া দিতে ‘কাতর’ হচ্ছেন! ভক্তেরা যেন প্রাণে প্রাণে বুঝতে পারেন এ যেন কোনও অন্য লোক! পৃথিবীর হিসেব এখানে মেলে না। সময় বয়ে যায়, কিছুক্ষণ পরে ঠাকুর অর্ধবাহ্যদশায় ফিরে এলেন। সেই অবস্থায় বলতে লাগলেন, ‘জীবে দয়া — জীবে দয়া? দূর শালা! কীটানুকীট তুই — জীবকে দয়া করবি? দয়া করবার তুই কে? না, না, জীবে দয়া নয় — শিবজ্ঞানে জীবের সেবা।’ ভাবাবিষ্ট ঠাকুরের এই কথা ঘর ভর্তি অনেক ভক্তই শুনলেন, কিন্তু এই কথার অর্থ কি হতে পারে সেটাও ধরতে পারলেন না। উপস্থিত ছিলেন ঠাকুরের প্রিয়
‘নরেন্দর’, ‘খাপখোলা তলোয়ার’— নরেন্দ্রনাথ। তিনি ঘরের বাইরে এসে অন্য ভক্তদের বললেন, ‘কি অদ্ভুত আলোকই আজ পেলাম! এতকাল শুনেছি অদ্বৈতজ্ঞান লাভ করতে হলে সংসার, লোকসঙ্গ, ভক্তি, স্নেহ, ভালবাসা ইত্যাদি সকল কোমল ভাব ত্যাগ করে বনে যেতে হবে। কিন্তু ঠাকুর আজ ভাবাবেশে যা বললেন, তাতে বনের বেদান্তকে ঘরে আনা যায় এবং সংসারের সকল কাজেও অবলম্বন করতে পারা যায়। মানুষ যে যা করছে করুক, তাতে ক্ষতি নেই, শুধু প্রাণের সঙ্গে বিশ্বাস ও ধারণা করতে হবে— ঈশ্বরই জীব ও জগতরূপে তার সামনে প্রকাশিত রয়েছেন। এইভাবে ‘শিবজ্ঞানে জীবের সেবা’ করতে করতে মানুষ নিজেকেও ঈশ্বরের অংশ ও চিরমুক্ত বলে ধারণা করতে পারে।’এই কথাটি একটু অন্যভাবে বলছেন ঠাকুরের গৃহীভক্ত বৈকুণ্ঠনাথ সান্ন্যাল জানাচ্ছেন…‘প্রভু একদিন অপরাহ্নে দিব্যভাবে আপন মনে কহিতেছেন—(কাছে নরেন্দ্রনাথ—স্বামী বিবেকানন্দ ও আমি ছাড়া আর কেহ ছিল না), জীবে দয়া নামে রুচি বৈষ্ণব-পূজন। দুঃশালা জীবে দয়া, অত অহঙ্কার? সৃষ্ট জীব তুই, তোরে কে দয়া করে, তার ঠিক নেই, তুই আবার জীবে দয়া করবি? নিস্তব্ধ। পরে না না, জীবের সেবা, ক্ষণপরে শিবজ্ঞানে জীবের সেবা তবে ত হবে। ধীমান নরেন্দ্রনাথ প্রভুর ভাবভঙ্গের পর বাহিরে আসিয়া আমাকে কহেন, ‘ভাগ্যে ভাই শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস এসেছিলেন, তাই আজ নূতন আলোক পেলাম। মনে রাখ, যদি বাঁচি, আর প্রভু কৃপা করেন—এই মহাবাক্যটি কার্যে পরিণত করতে পারলে ধন্য হব।’
যাইহোক নরেন্দ্রনাথের এই কথার অর্থ সেই মুহূর্তে অনেকেই বুঝতে পারেন নি। তিনি এই বলে বোঝালেন, ‘...ভক্তিপথেও ঠাকুরের ওই কথা থেকে বিশেষ আলোক পাওয়া যায়। শিব বা নারায়ণ জ্ঞানে জীবের সেবা করলে, সাধক ঈশ্বরকে সকলের ভিতর দর্শন করে অতি অল্পকালেই পরাভক্তি লাভে ধন্য হতে পারে। …আর যে সকল সাধক কর্মযোগী বা রাজযোগী, তারাও শিবজ্ঞানে জীবসেবা-রূপ কর্মের দ্বারাই সত্বর তাদের লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে। ভগবান যদি কখনও দিন দেন তবে আজ যা শুনলাম তা জগতে প্রচার করে সকলকে মুগ্ধ করব।’
নতুন মানুষ শ্রীরামকৃষ্ণ। তাঁর সবকিছুতেই নতুনত্ব। এই বিশ্বকে তিনি যে সব নতুন চিন্তাধারা উপহার দিয়েছেন তার মধ্যে একটি হল এইটি— ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা।’ বলতেন, ‘মাটির প্রতিমায় পুজো হয় আর জ্যান্ত মানুষে হয় না।’ বলা যায়, সেইদিনই রামকৃষ্ণসঙ্ঘ প্রতিষ্ঠার আগেই সঙ্ঘের লক্ষ্য স্থির হয়ে গিয়েছিল। রামকৃষ্ণসঙ্ঘের ভাবি নেতা নরেন্দ্রনাথ তাই সঙ্কল্প করলেন, ‘আজ যা শুনলাম তা জগতে প্রচার করে সকলকে মুগ্ধ করব।’ সেজন্য প্রয়োজন সংগঠন। নয় তো মানুষ তাঁর কথা নেবে কেন? এই চিন্তা তাঁকে প্রবলভাবে আলোড়িত করে তুলল। ঠাকুর একসময় তাঁর অন্তরঙ্গ ভক্তদের সম্বন্ধে বলেছিলেন, ‘আমার পাঁচফুলের সাজি।’ শ্রীমাকে বলেছিলেন, ‘ওদের বেঁধে এক করতে পারতাম!’ এ তাঁর আক্ষেপ নয় সাধ! তিনি তা পেরেছিলেন। বলাবাহুল্য এই মিলনসৌধটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তাঁর শেষ অসুখের সময় কাশীপুরে। বলা যায়, ভবিষ্যৎ রামকৃষ্ণসঙ্ঘের সূচনা সেখানেই। ঠাকুর তাঁর দেহের ব্যাধি সম্বন্ধে বলেছিলেন, ‘এতে আগাছা পালায়। যারা শুদ্ধ তারাই কেবল থাকবে। এই ব্যারাম হল কেন? এর মানে ওই। যাদের সকাম ভক্তি, তারা ব্যারাম অবস্থা দেখে চলে যাবে।’ এই শুদ্ধাত্মারাই তাঁর কাজের ঋত্বিক। তাঁরা তাঁর বাণীবাহক। অন্তরঙ্গ। পার্ষদ। কাশীপুর যজ্ঞবেদীতেই রামকৃষ্ণসঙ্ঘের বাণীবাহকদের বাছাই করা হয়ে গিয়েছিল। এরপর চলেছিল তাঁদের দীর্ঘ শিক্ষা দেওয়ার পালা। কখনও যৌথ কখনও একাকী। ক্যান্সারের অসহ্য যন্ত্রণা গলায় নিয়ে ‘রত্ন ছেলে’দের অনুক্ষণ উপদেশ দিচ্ছেন। যাঁকে যেভাবে যেকাজের জন্য দরকার, তাঁকে সেইভাবে ‘তয়ের’ করে দিচ্ছেন। এঁদের মধ্যে যিনি আবার সারথি, যিনি সঙ্ঘকে লক্ষ্যের দিকে নিয়ে যাবেন তাঁর প্রতি ছিল বাড়তি নজর। সেই সারথির নির্বিকল্প সমাধি লাভের বাসনার কথা শুনে সঙ্ঘপ্রাণ ঠাকুর ভর্ৎসনা করে বললেন, ‘লজ্জা করে না তোর ও কথা বলতে। কোথায় তুই বটগাছ হয়ে জগতকে শান্তির ছায়া দিবি!’
নরেন্দ্রকে তিনি ‘বটবৃক্ষের’ করবেন। আগের জীবের মুক্তির নিশ্চয়তা গড়ে দিয়ে তারপর নিজের মুক্তি। সেই আদর্শ কেমন হবে আর তা কীভাবে রূপায়িত হবে সেই ধারণাও গড়ে দিলেন। একসময় তাঁর অন্তর্ধান হল। শ্রীরামকৃষ্ণের স্থূল শরীর চলে গেল, এবার সূক্ষ্ম দেহে প্রবেশ করলেন সংঘশরীরে। ক্রমে সেই সঙ্ঘ দানা বেঁধে উঠল বরাহনগর মঠে। তৈরি হল বরাহনগর মঠ। এই মঠ জীবন অতি কঠোর। ত্যাগ, তপস্যায়, সংযমে মঠবাসীরা দিন কাটাতে লাগলেন। স্বামীজির কথায়, ‘সে কঠোরতা দেখলে মানুষের কথা কি, ভূত পালিয়ে যেত।’ তাঁদের তপস্যাই যেন সঙ্ঘের আত্মা। এককময় স্বামীজি ভারত পরিক্রমায় বেরোলেন। তারপর বিশ্বপরিক্রমা। তাঁর মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল অনন্তভাবময় শ্রীরামকৃষ্ণের অমৃতবাণী, বেদান্তের মর্মকথা। পাশ্চাত্যের মাটিতে বসে স্বামীজি একটা কথা প্রাণে প্রাণে উপলব্ধি করেছিলেন, যথাযথভাবে ভাবপ্রচারের জন্য, কাজ করার জন্য সংগঠনের কোনও বিকল্প নেই। তিনি তাঁর গুরুভাইদের লিখে জানালেন সে কথা, ‘একটা Organised Society চাই।’ বললেন, ‘Organisation চাই— কুঁড়েমি দূর করে দাও; ছড়াও, ছড়াও; আগুনের মতো সব জায়গায়।’ অবশ্য তিনি পুরোপুরি পাশ্চাত্যের আদলে সঙ্ঘ গড়তে চাননি। চেয়েছিলেন সঙ্ঘসৌধ গড়ে উঠবে তিনটি স্তম্ভের উপর— পবিত্রতা, ধৈর্য ও অধ্যবসায়।
১৮৯৭ সালের জানুয়ারি মাসে স্বামীজি স্বদেশে ফিরে এলেন। স্থির করে ফেলেছেন একটি সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করতেই হবে। কিন্তু সঙ্ঘ গঠনের কাজ নানা কারণে গঠনমূলক চেহারায় আনা যাচ্ছে না। স্বামীজি যেন হাঁপিয়ে উঠছেন। তিনি এবার বিঘ্ননাশিনী মহামায়ীর শরণাপন্ন হলেন। শ্রীশ্রীমায়ের সঙ্গে দেখা করে আন্তরিক প্রার্থনা জানালেন, ‘মা, আমি তাঁর বাণী প্রচার করতে চাই, আর সে জন্য যত শীঘ্র সম্ভব একটি সঙ্ঘ স্থাপন করতে চাই। কিন্তু যত দ্রুত তা করতে চাইছি, ততটা দ্রুত পারছি না বলে কষ্ট পাচ্ছি।’ স্বামীজির যেমন ছিল সংঘ স্থাপনের আপ্রাণ প্রচেষ্টা, শ্রীশ্রীমাও সেই একই চেষ্টা করেছেন বহুকাল ধরে। সদাসর্বদা প্রার্থনা করেছেন, যাতে একটি মঠ হয়, ঠাকুরের ভাব যাতে জগতের কল্যাণ করে। পরবর্তীকালে মায়ের লীলাসঙ্গিনী যোগীন মা বলেছিলেন, ‘যা কিছু দেখছ, (মঠ-আশ্রমাদি) সব ওঁরই (মায়ের) কৃপায়! যেখানে যা দেখেছেন—শিল নোড়াটি (দেববিগ্রহ) কেঁদে কেঁদে বলেছেন, ‘ঠাকুর! আমার ছেলেদের একটু মাথা রাখবার জায়গা কর, দুটি খাবার সংস্থান কর।’ মায়ের সে ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে।’ মা তাঁর নরেনের সব কথা শুনলেন। তারপর বললেন, ‘চিন্তা করো না, তুমি যা করেছ, আর যা করবে সবই চিরকালের জিনিস। এই কাজের জন্যই তুমি এসেছ, হাজার হাজার মানুষ তোমাকে পৃথিবীর সেরা আচার্য বলে গ্রহণ করবে। স্থির জেনো, ঠাকুর শীঘ্রই তোমার ইচ্ছাপূরণ করবেন। দেখবে অল্প দিনের মধ্যে তোমার ভাব কার্যকরী হচ্ছে।’ এইরকম প্রেরণাদায়ক আশার কথা এইভাবে কেউ কখনও বলেছেন কিনা জানা যায় না। আশ্চর্যের ব্যাপার, এই ঘটনার পরই রামকৃষ্ণ সংঘ স্থায়ী রূপ পাওয়ার গতি বৃদ্ধি পায়।
১ মে সৃষ্টি হল ইতিহাস। ওইদিন শ্রীরামকৃষ্ণের গৃহীভক্ত বলরাম বসুর বাড়ির দোতলার হল ঘরে স্বামীজি ঠাকুরের ত্যাগী ও গৃহী শিষ্যদের উপস্থিতিতে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করলেন। গৃহী আর ভক্ত মিলিয়ে প্রায় চল্লিশজন উপস্থিত ছিলেন বসুবাড়িতে। সময় দুপুর তিনটে, শনিবার। এই মিটিংয়ে স্বামীজি অসাধারণ একটি ভাষণ দেন। মিনিটসে লিপিবদ্ধ করা হল—‘পরমহংসদেবের চিন্তা, উপদেশ ও আদর্শ প্রসারের আন্দোলন সম্প্রসারণশীল এবং সে বিষয়ে মানুষের বর্ধমান ঔৎসুক্য লক্ষ্য করে উপস্থিত ব্যক্তিগণ এক সঙ্ঘ গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন: সঙ্ঘের মাধ্যমে কাজকর্ম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। তাঁরা সিদ্ধান্ত করেন যে, কলকাতায় একটি কেন্দ্র স্থাপনের একান্ত প্রয়োজন। সেখানে সভ্যগণ নিয়মতিভাবে মিলিত হয়ে আলোচনা করবেন, জনসাধারণের মধ্যে পরমহংসদেবের উপদেশ ও আদর্শ প্রচারের জন্য উপায় উদ্ভাবন করবেন। ভারতবর্ষের অন্যত্র এবং আমেরিকা ও ইল্যাণ্ডে গঠিত সমভাবাপন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ প্রতিষ্ঠান যোগাযোগ করবে এবং সঙ্ঘের উদ্দেশ্য-সাধনের জন্য তাদের সঙ্গে ভাবের আদানপ্রদান করবে।... আমরা যাঁর নামে সন্ন্যাসী হয়েছি, আপনারা যাঁকে জীবনের আদর্শ করে সংসারাশ্রমে কার্যক্ষেত্রে রয়েছেন, তাঁর দেহবসানের বিশ বছরের মধ্যে প্রাচ্য ও পাশ্চত্য জগতে তাঁর পূণ্য নাম ও অদ্ভুত জীবনের আশ্চর্য প্রসার হয়েছে, এই সঙ্ঘ তাঁরই নামে প্রতিষ্ঠিত হবে। আমরা প্রভুর দাস, আপনারা এ কাজে সহায় হোন।’ শুরু হল রামকৃষ্ণ মিশনের যাত্রা।
গঠিত হল সমিতি বা অ্যাসোসিয়েশন। পরিচালন সমিতিও ঠিক হয়ে গেল। মিশনের কলকাতা কেন্দ্রের সভাপতি হলেন স্বামী ব্রহ্মানন্দজি। ঠাকুরের সেই বিখ্যাত উক্তি ‘রাখালের রাজবুদ্ধি, ও একটা রাজ্য চালাতে পারে’— স্বামীজি ঠাকুরেরই সেই বাক্য পালন করলেন। স্বামী যোগানন্দজিকে করা হল সহ-সভাপতি। কলকাতা কেন্দ্রেরই সম্পাদক হলেন নরেন্দ্রনাথ মিত্র এবং সহ সম্পাদকদ্বয় ডাঃ শশিভূষণ ঘোষ ও শরৎচন্দ্র সরকার। এরপর ঠিক হল সকলের সুবিধে মতো চার দিন পর আবার বসুবাড়িতে সকলে মিলে বসা হবে। সেইমতো ৫ মে বুধবার (বারটি আবার শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মবার) অ্যাসোয়িশনের নাম ঠিক করা হল ‘রামকৃষ্ণ মিশন’। আর উদ্দেশ সম্বন্ধে মিনিটসসে লেখা হল—‘মানবের হিতার্থ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ যে সকল তত্ত্ব ব্যাখ্যা করিয়াছেন ও কার্যে যাহা তাঁহার জীবনে প্রতিপাদিত হইয়াছে, তাহার প্রচার এবং মানুষের দৈহিক, মানসিক ও পারমার্থিক উন্নতিকল্পে যাহাতে সেই সকল তত্ত্ব প্রযুক্ত হইতে পারে, সে বিষয়ে সাহায্য করা এই মিশন বা প্রচারের উদ্দেশ্য।’ এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সংযোজিত হল—‘মিশনের লক্ষ্য ও আদর্শ যেহেতু কেবল আধ্যাত্মিক ও সেবামূলক, অতএব রাজনীতির সহিত ইহার কোন সম্বন্ধ থাকিবে না।’
পূণ্য ক্ষণ, শুভ দিন। উপস্থিত সকলে স্বামীজির এই প্রস্তাব সমর্থন করলেন। শুরু হল রামকৃষ্ণ মিশনের জয়যাত্রা। যার প্রধান উদ্দেশ্য স্বামী তেজসানন্দের ভাষায়— ‘সকল ধর্মকে একই সনাতন ধর্মের বিকাশ মনে করে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীগণের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব স্থাপন করা । এ ছাড়াও উন্নতচরিত্র কর্মী তৈরি করা, যারা বিজ্ঞান ও অন্যান্য বিষয়ে পারদর্শীতা লাভ করে জনসাধারণের জাগতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য আত্মোৎসর্গ করবে; ভারতের শিল্প, সাহিত্য, ললিতকলা ইত্যাদির উন্নতি ও বিস্তারসাধন করা; শ্রীরামকৃষ্ণের সর্বজনীন শিক্ষার আলোকে জনসাধারণের মধ্যে বেদান্ত ও অন্যান্য ধর্মের প্রকৃত আদর্শ প্রচার করা এবং জাতি-ধর্ম নির্বিচারে শিবজ্ঞানে আর্তের সেবায় আত্মনিয়োগ করা।’
স্বামীজি শ্রীশ্রীমাকে সঙ্ঘজননী রূপে সঙ্ঘে স্থাপন করেছিলেন। সঙ্ঘজননীর আশীর্বাদ রামকৃষ্ণসঙ্ঘের ১২৫ বছর অতিক্রান্ত করার অন্যতম কারণ। ‘আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ’—নিজের মুক্তি ও জগতের হিতসাধন, এই হল সঙ্ঘের আদর্শ। শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন সর্বধর্মের মিলন ও সমন্বয়ভূমি। তাঁর জীবন ও উপলব্ধি যেন সঙ্ঘে আত্মপ্রকাশ করল। স্বামীজি সঙ্ঘের সিলমোহর করলেন। সেই ভাবেরই ব্যাখ্যা দিলেন, ‘চিত্রস্থ তরঙ্গায়িত জলরাশি —কর্মের, কমলগুলি —ভক্তির, উদীয়মান সূর্যটি জ্ঞানের প্রকাশ। চিত্রগত সর্প পরিবেষ্টনটি যোগ এবং জাগ্রত কুণ্ডলিনী শক্তির পরিচায়ক। আর চিত্রমধ্যস্থ হংস প্রতিকৃতিটির অর্থ পরমাত্মা। মন্ত্রটি —হংস (পরমাত্মা) আমাদিগকে উহা প্রেরণ করুন। এটি হৃৎ-সরোবর। অতএব কর্ম, ভক্তি ও জ্ঞান – যোগের সহিত সম্মিলিত হইলেই পরমাত্মার সন্দর্শন লাভ হয়, চিত্রের ইহাই অর্থ।’ ১৯০১ সালে স্বামীজি সম্পাদিত ট্রাস্ট ডিডের দ্বারা রামকৃষ্ণ মঠ আইনানুগ স্বীকৃতি লাভ করে। এর আট বছর পর ১৯০৯ সালে রামকৃষ্ণ মিশন অ্যাসোসিয়েশন রেজিস্টার্ড হয় ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ নামে। পত্রিকা প্রকাশ, বিভিন্ন স্থানে আশ্রম, সেবাকাজ শুরু হল। এইভাবে স্বামীজি তাঁর গুরুদেবের কাজকে প্রধান কর্তব্য ভেবে কাজ করে সাফল্য পেলেন। আমেরিকান শিষ্যা মেরি হেলকে স্বামীজি চিঠিতে জানালেন, ‘এটা যখন নিশ্চয় বুঝব যে, সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে অন্তত ভারতে এমন একটা যন্ত্র চালিয়ে গেলাম, যাকে কোনও শক্তি দাবাতে পারবে না, তখন ভবিয্যতের চিন্তা ছেড়ে দিয়ে আমি ঘুমুব।’
১২৫ বছর ধরে আজও স্বামীজির স্বপ্নের এই জগৎকল্যাণকারী ‘রামকৃষ্ণ মিশন’-এর গতি অব্যাহত। দেশে-বিদেশে দুরন্ত গতিতে ছড়িয়ে পড়েছে স্বামীজির দূরদৃষ্টির ফসল এই উদ্যোগ। ভবিয্যৎ প্রজন্মের প্রতি স্বামী ব্রহ্মানন্দজির সেইস্মরণীয় উক্তি—‘আমরা ছাঁচ করে দিয়ে গেলাম, তোরা শুধু দাগা বুলিয়ে যা।’
শ্রীরামকৃষ্ণ সংঘ কার? উত্তর— জগতের। স্থপতি স্বয়ং জগৎপতি শ্রীরামকৃষ্ণ। রূপকার শ্রীমা সারদা আরস্বামী বিবেকানন্দ। অশান্ত মানুষ শান্তির খোঁজ পেতে এই প্রাণ-মন-আত্মা শীতলকারী বটবৃক্ষের আশ্রয়ে প্রাণ জুড়িয়েই যাবে। সময়ের বিচারে নয়—চন্দ্র-সূর্যের উপস্থিতি যতদিন থাকবে মানুষের প্রাণ শীতলকারী অবগাহন চলতেই থাকবে! জগতের প্রতি দিব্যত্রয়ীর অশেষ এই নিবেদন!