


১ এপ্রিল থেকেই চালু হয়ে যাচ্ছে ‘যুবসাথী’। এই প্রকল্পের উপভোক্তারা প্রতিমাসে দেড় হাজার টাকা পাবেন। ১৫ আগস্ট পর্যন্তও অপেক্ষা করতে হবে না তাঁদের। অর্থাৎ নতুন অর্থবর্ষের গোড়াতেই চালু হয়ে যাচ্ছে এই সাড়া জাগানো প্রকল্প। আমরা জানি, এবারের রাজ্য বাজেটেই প্রকল্পটির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের ঘোষণা অনুসারে, মাধ্যমিক উত্তীর্ণ ২১-৪০ বছর বয়সি যুবক-যুবতীরা প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ পাঁচবছর অথবা কর্মসংস্থান না-হওয়া পর্যন্ত এই আর্থিক সহায়তা পাবেন। পাঁচবছর পর রিভিউ করে দেখা হবে, সংশ্লিষ্ট উপভোক্তার তখনো এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া উচিত কি না। মঙ্গলবার নবান্নে এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি আরো আশ্বস্ত করেছেন যে, ঐক্যশ্রী, মেধাশ্রীর মতো স্কলারশিপও যুবসাথী প্রকল্পে সহায়তার সামনে কোনো বাধা হবে না। অর্থাৎ দুটি সরকারি আর্থিক সহায়তাই একত্রে মিলবে। তবে যুবশ্রীর মতো সরকারের অন্যকোনো প্রকল্পে ভাতা পেলে যুবসাথীর সহায়তার জন্য আরজি জানানো যাবে না। ৫ ফেব্রুয়ারি পেশ হওয়া অন্তর্বর্তী বাজেটে যুবসাথীর সঙ্গে আরো দুটি প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে। সেটি বস্তুত কৃষকদের জন্য জোড়া উপহার। একটি হল ভূমিহীন খেতমজুরদের জন্য ভাতা এবং সেচের খরচ মকুব। বার্ষিক চার হাজার টাকা হারে ভাতা পাবেন গরিব খেতমজুররা। ওই টাকা দেওয়া হবে মোট দুটি কিস্তিতে। অন্যদিকে, দু-হাজার টাকা পর্যন্ত সেচের খরচ মকুব করা হবে। সরকারি নলকূপ বা রিভার লিফট ইরিগেশন প্রকল্পে এই সহায়তা মিলবে।
মুখ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন, যুবসাথীর মতো এই দুটি প্রকল্পের সুবিধা প্রদানও শুরু হবে ১ এপ্রিল। এবারের রাজ্য বাজেটের সবচেয়ে আকর্ষক বিষয় নিঃসন্দেহে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের অনুদান বৃদ্ধি। এই পুরানো প্রকল্পের বর্ধিত পাঁচশো টাকা ফেব্রুয়ারি থেকেই দেওয়া শুরু হয়েছে। যুবসাথী এবং খেতমজুরদের ভাতা চালু হবে ১ এপ্রিল। সম্ভবত, নিন্দুকদের কটাক্ষের কথা মাথায় রেখেই মুখ্যমন্ত্রী মনে করিয়ে দিয়েছেন, পয়লা এপ্রিল দিনটা ‘এপ্রিল ফুল’ নামক মশকরা করা হয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট সকলকে আশ্বস্ত করে তিনি যোগ করেন, ‘আমরা কিন্তু এপ্রিল ফুল করছি না।’ অবশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনমুখী রাজনীতি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশাসন পরিচালনা সম্পর্কে যাঁদের ন্যূনতম ধারণা আছে, তাঁরা জানেন, তাঁর এই পাদটীকা বাহুল্য। তিনি আলাদাভাবে আশ্বস্ত না করলেও কেউ তাঁকে অবিশ্বাস করত না। কারণ তাঁর রাজনীতি এবং সরকারের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হল কথা দিয়ে কথা রাখা। অন্যদিকে, তাঁর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি এবং এনডিএর চলন বলন এর ঠিক উলটো পথে। তারা চমকের রাজনীতি করতেই অভ্যস্ত। ভোটপাখির মতোই উদয় হয় এই বেনিয়ারা আর ভোট মিটলেই তারা হাওয়া! কথার খেলাপে বিশ্ব রেকর্ডের অধিকারী স্বয়ং নরেন্দ্র মোদি। তাঁর শিষ্যকুলও কম যান না। তাই মহারাষ্ট্র থেকে বিহার প্রভৃতি ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে গুচ্ছ জনমোহিনী প্রকল্প ঢাক ঢোল পিটিয়ে চালু করেও পরে সেসব বহাল রাখা হয়নি বলে অভিযোগ। ব্যাপারটা ‘কার্যোদ্ধার শেষে কাঁচকলা’ গোছের দাঁড়িয়ে গিয়েছে। একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পের দশাও অনুরূপ বলে খবর পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে মোদিবাবু নয়া নয়া জুমলার কারিগর আখ্যা পেয়েছেন।
আর এখানেই, সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিয়ে নিজেকে আলাদা করে চিনিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে এপ্রিল থেকে প্রকল্প শুরু করার জন্য নবান্নের কাছে বৃহত্তম চ্যালেঞ্জ হল নির্বাচনি আবহে যোগ্য উপভোক্তা বাছাই। তবে তার পথ মুখ্যমন্ত্রীই বাতলে দিয়েছেন। আলোচ্যমান প্রকল্পগুলির সঙ্গে কৃষি, বিদ্যুৎ, যুব, ক্ষুদ্রসেচ প্রভৃতি দপ্তর যুক্ত। নবান্নে ওই দপ্তরগুলির পদস্থ কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রীর মত হল, কম সময়ে কাজটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করার উপায় হল অনলাইনে আবেদন গ্রহণ। এই উপলক্ষ্যে ১৫-২৬ ফেব্রুয়ারি (ছুটির দিন বাদে) সমস্ত বিধানসভা কেন্দ্রে ক্যাম্প করা হবে। সেই আবেদনপত্র যাচাই করেই তৈরি হবে চূড়ান্ত উপভোক্তা তালিকা। মমতার এই পদক্ষেপকে ভোটের চমক বলে ছোটো করার কোনো সুযোগ নেই। এই জনমুখী পদক্ষেপে দীর্ঘমেয়াদে রাজ্যের অর্থনীতিই পুষ্ট হবে। কারণ বাংলার যুব শ্রেণি, মহিলা এবং কৃষিজীবী মানুষজন আর্থিক দিক থেকে যথেষ্ট লাভবান হবেন। তাঁদের হাতে নগদ জোগান বৃদ্ধির আশীর্বাদ নেমে আসবে বাজারে। সাধারণের ব্যবহার্য পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা বৃদ্ধির প্রভাব পড়বে উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানে। অন্তর্ভুক্তির রাজনীতি হাতিয়ার হলেই সার্বিক ক্ষেত্রে প্রকৃত উন্নয়ন করা সম্ভব। প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতিবিদ না-হয়েও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে বাংলাতেই পুনর্লিখিত হল প্রকৃত উন্নয়নের সংজ্ঞা।