ব্লক প্রিন্টের শাড়িতে কীভাবে ফ্যাশনেবল হবেন? জানালেন ডিজাইনার পরমা গঙ্গোপাধ্যায়।
ব্লক প্রিন্টের শাড়িতে কীভাবে ফ্যাশনেবল হবেন? জানালেন ডিজাইনার পরমা গঙ্গোপাধ্যায়।
বাড়ির লাগোয়া একচিলতে উঠোনে রোদ্দুর। দড়িতে মেলা ছাপা শাড়ি। বর্ষার দিনে বারান্দায় ঠাঁই হয় তার। হালকা মাড় দিলে নতুনের মতো কড়কড়ে হয়ে যায়। বছরভর সেই শাড়িতেই কেটে যায় তরুণী থেকে গৃহিণীবেলা। কলকাতার রাজপথ হোক বা মফস্সলের গলি— এই সাজেই কয়েক বছর আগে অভ্যস্ত ছিল বাঙালি। সেই ছাপা বিশ্বায়নের বাজারে খানিক কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। তবে আভিজাত্য যার গঠনে সে ঠিক জায়গা করে নিতে পারে। ছাপাও ব্যতিক্রম নয়। আধুনিকাদের পছন্দের তালিকায় ফের জায়গা পেয়েছে ছাপা শাড়ি। সুতি, সিল্ক বা তসর— হাতে বোনা শাড়িতে সাবেকি নকশার ছাপার বুনন ফ্যাশন সচেতন মানুষ আপন করে নিচ্ছে। ছাপোষা ছাপার আদর ভাগ করে নিচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর।
দশ বছরের বেশি সময় ধরে ফ্যাশন দুনিয়ায় কাজ করছেন ডিজাইনার পরমা গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘ছাপা শাড়ি কথাটার মধ্যেই একটা তাচ্ছিল্য ভাব আছে বোধহয়। একটু নিচু করে দেখা! একটা সময় পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল ছাপা শাড়ি মানে কম দামের শাড়ি। যে শাড়ির কোনও কৌলিন্য নেই। পুজোর সময় বাড়ির পরিচারিকাদের দেওয়ার জন্য যেন ছাপা শাড়ি। এই ধারণা থেকে আমরা বেরিয়েছি। সেটা খুব ভালো দিক। যেটা আমাদের চিরকালীন, সেটা সংরক্ষণ করতে না পারলে নতুন জিনিস তৈরি করে একটা পুরো সম্প্রদায়কে টিকিয়ে রাখা যায় না।’ বুননের ঐতিহ্যের খোঁজে ছোটবেলার গল্পে ফিরে গেলেন পরমা। বললেন, ‘আমার মা, দিদাকে স্কুলে পড়াতে যেতে দেখেছি ছাপা শাড়ি পরে। তখনও জয়পুরের ব্লক প্রিন্ট অত দেখা যেত না। বাংলার শ্রীরামপুর থেকে যেগুলো প্রিন্ট হয়ে আসত, সেগুলো তাঁত বা সিল্কের ওপর তৈরি হতো। সিল্কে ব্লক শীতে পরা হতো। আর সুতিতে ব্লক গরমে পরতেন সকলে। একটা বিষয় বুঝতে হবে, ছাপা মানেই সুতির শাড়ি নয় কিন্তু। ছাপা মানে ব্লক। সেটা বিভিন্ন ফ্যাব্রিকে করা হয়।’
বারো মাস গরম সামলে ঘরে বাইরে কাজ করতে অভ্যস্ত সকলে। আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে আরামের খোঁজ থাকেই। সেখানে ছাপা শাড়ি বাকি ফ্যাব্রিকের থেকে অনেক এগিয়ে। পরমা বললেন, ‘আগে বছরের পর বছর বাসের পিছনে ছাপা শাড়ির বিজ্ঞাপন দেখতাম। সেই শাড়ি আর আজকের ছাপা শাড়ি এক নয়। ওই বিজ্ঞাপনে দেখা শাড়িগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হ্যান্ড ব্লক প্রিন্ট হতো না। এখন হাতে ছাপার চল বেশি। সেই মানের কাপড় না দিলে রং ধেবড়ে যাবে। রাজস্থানেও দেখেছি খুব পরিশ্রম করে হাতে ছাপা তৈরি হয়। যাতে কাপড় ধুলে রং না ওঠে। এখন ভারতের নানা রাজ্য থেকে ছাপা শাড়ি কলকাতায় আসছে। বাগরু, বাগ— এগুলো সবই ছাপা। সব মিলিয়ে ছাপা শাড়ির চাহিদা তৈরি হয়েছে।’
ডিজিটাল প্রিন্টের যুগে হাতে ছাপার অন্য সৌন্দর্য রয়েছে। সে শাড়ির কোথাও রং বেশি পড়েছে। কোথাও বা রং পড়েনি। সেটাই সৌন্দর্য। ‘আমাদের মায়ের আঁচলে হলুদ লেগে থাকার মতো। সেটা তো কখনও সাদা থাকে না। ওটাই সবথেকে সুন্দর লাগে। হ্যান্ডমেড শাড়িও তেমন, তাতে গন্ডগোল থাকবেই। সেটাই সুন্দর’, মত পরমার। তাঁর নিজস্ব ব্র্যান্ডে প্রথম থেকেই ব্লকের উপর কাজ করিয়েছেন তিনি। সেখানে রং নিয়ে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা করেন। ‘আমরা গরদের ওপর, সিল্কের ওপর ব্লক প্রিন্ট করি। সেখানে সাদা লাল ভেঙে ব্রাইট পিঙ্ক, কালো, হলুদ— পপআপ কালারে ব্লক করি। সেটাই আমাদের বিশেষত্ব। হলুদের উপর ব্রাইট অরেঞ্জ বা রানি পিঙ্ক দিয়ে গাঁদা ফুলের ব্লক খুব চলে। আর সুতিতে প্যাস্টেল শেড বেশি চলে। তার একটা কারণও আছে। সিল্ক লোকে রাতে বা শীতকালে বেশি পরতে চায়। তখন পপআপ কালার বেশি ভালো লাগে। আর সুতির ছাপা সকালে পরতে ভালোবাসেন। হালকা গোলাপি, লাল, হলুদের উপর ছাপা বেশি চলে’, বলেন তিনি।
হাতে বোনা ছাপা শাড়ি সচেতনভাবেই এখন অনেকে পরতে চান। খাঁটি জিনিস পরার আগ্রহ যেমন রয়েছে, তেমনই এই প্রয়াসে বেঁচে থাকে তাঁতির সংসার। অভিজ্ঞতায় পরমা দেখেছেন, ‘অনেকেই এখন ন্যাচরাল ডাই ছাড়া পরব না বলেন। ত্বকে যাতে সমস্যা না হয়, তেমন ফ্যাব্রিকেই কাজ করেন ডিজাইনাররা। এখন মানুষ অনেক সচেতন। আগেকার দিনে সচেতনতা না থাকলেও জিনিসপত্রে ভেজাল কম ছিল। এমনিই ভালো জিনিস লোকে পরত। এখন বাজারচলতি এত জিনিস যে সচেতন হতেই হয়।’
মায়ের আলমারি ভর্তি শাড়ি উত্তরাধিকার সূত্রে মেয়ের পরনে ওঠে। সাজতে শেখার প্রথম পাঠ বাড়িতেই পাওয়া যায়। ছাপার শাড়িকে যত্নে রাখার ইচ্ছের অভ্যেসও শুরু হয় গৃহকোণে। তবে ইদানীং সোশ্যাল মিডিয়ার গুরুত্ব স্বীকার করে নিয়ে পরমা বললেন, ‘একসময় কমবয়সিদের খুব জর্জেট, শিফন পরে কলেজের অনুষ্ঠান বা সরস্বতী পুজোয় যেতে দেখতাম। এখন সুতি ফিরেছে, সেটা কিছুটা সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য। সেখানে এত মানুষ সুতির শাড়ি পরছেন, সেটা দেখে অনুপ্রাণিত হচ্ছে নবীন প্রজন্ম। হ্যান্ডমেড নিয়ে এখন খুব কথা হচ্ছে। ছাপা শাড়ির দামও কম। আসল জামদানি পরা তো কলেজপড়ুয়ার পক্ষে সম্ভব নয়। অন্তত মেশিনে তৈরি নকল জামদানির বদলে সুতির ছাপা পরা ভালো।’
স্বরলিপি ভট্টাচার্য