চামড়ার ব্যবসা দিয়ে পথচলা শুরু হয়েছিল তাঁর। প্রচুর লড়াই করে এখন তিনি শহরের বিভিন্ন চীনে রেস্তরাঁর মালিক। জীবন
সংগ্রাম ও সাফল্যের কথা জানালেন মনিকা লিউ।
চামড়ার ব্যবসা দিয়ে পথচলা শুরু হয়েছিল তাঁর। প্রচুর লড়াই করে এখন তিনি শহরের বিভিন্ন চীনে রেস্তরাঁর মালিক। জীবন
সংগ্রাম ও সাফল্যের কথা জানালেন মনিকা লিউ।
আমি শিলংয়ের মেয়ে। খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে গেল। স্বামীর চামড়ার ব্যবসা কলকাতায়। নতুন শহর। সবই অচেনা। বিয়ের পর বাড়ি বসে ভাবতাম একটু কিছু কাজ করা দরকার। কিন্তু কী যে করব সেটাই ভেবে পেতাম না। অথচ ছোটবেলা থেকেই আমি নিজের উপার্জনে বিশ্বাসী। আমার স্বামী ব্যবসা করতেন ঠিকই, কিন্তু ব্যবসায়ী মনোভাব ছিল না তাঁর মধ্যে। লোকে কাজ করিয়ে নিত, মাল ডেলিভারি নিয়ে টাকা আটকে রাখত, কখনও বা টাকা চোটও যেত। কিন্তু উনি মুখে কারও বিরুদ্ধে রা কাড়তেন না। এদিকে আমাদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছিল, তখন স্বামীর পাশাপাশি আমিও নিজস্ব চামড়ার ব্যবসা শুরু করলাম। প্রচুর কষ্ট করতে হয়েছে। লোকে মহিলাদের সেই সময় সম্মানই দিত না। নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে নেহাত কম কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। চামড়া থেকে বিউটি স্যালোঁ এবং তার থেকে রেস্তরাঁ। বিরাট লম্বা এক যাত্রাপথ। কিন্তু আমি থেমে যাইনি। ভয় পাইনি। মাথা ঠান্ডা রেখে সাফল্যের দিকে এগিয়ে গিয়েছি ক্রমশ।’ প্রায় নাগাড়ে কথাগুলো বলছিলেন মনিকা লিউ। কলকাতার তপসিয়া অঞ্চলে যাঁর পরিচিতি ‘ট্যাংরার ডন’ হিসেবে।
স্বনির্ভরতার তাগিদ
সংসারের হাল ধরতেই কি ব্যবসা করার কথা প্রথম ভেবেছিলেন? প্রশ্ন শুনে প্রায় ষাট বছর পিছিয়ে গেলেন মনিকা। বললেন, পড়াশোনা তেমন একটা এগনোর আগেই ভালো পাত্র দেখে বাবা তাঁর বিয়ে দিয়ে দেন। কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়ানো বাসনা তাঁর বরাবরের। সংসার সামলে, বাচ্চা মানুষ করতে গিয়ে নিজের এই ইচ্ছেটা খানিক চাপা পড়ে গিয়েছিল বটেই, কিন্তু মরে যায়নি। তাই সংসারের হাল ধরার পাশাপাশি মনিকার ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার পিছনে স্বনির্ভরতার তাগিদটাও নেহাত কম ছিল না।
ব্যবসায় নতুনত্ব
চামড়ার ব্যবসা দিয়েই শুরু করেছিলেন মনিকা। তবু তার মধ্যেও নতুনত্ব কিছু তো চাই। সেই ভেবেই ক্রোকোডাইল প্রিন্টের ব্যাগ বানাতে শুরু করেন। ওই সময় প্লেন লেদারের ব্যাগ, কিটস ব্যাগ ইত্যাদি খুবই পাওয়া যেত, কিন্তু ক্রোকোডাইল প্রিন্ট অতটা কেউ জানত না। টিভিতে বিদেশি অনুষ্ঠান দেখে এই প্রিন্ট সম্বন্ধে জেনেছিলেন মনিকা। সেই মতো কারিগরদের বলে প্রিন্ট করিয়ে ব্যাগ, পার্স, জুতো বানাতেন। কিন্তু বিক্রি করাই এক সমস্যা হয়ে দাঁড়াল। বিক্রি হলে টাকা আসে, না হলে যে কে সেই। এইভাবে ফিক্সড ইনকাম ছাড়া দারিদ্র্য ঘিরে ধরছিল তাঁদের। স্বামীর ব্যবসাও সেভাবে চলছিল না, তখন অন্য কোনও রোজগারের উপায় খুঁজতে শুরু করেন মনিকা। বললেন, ‘সেই সময় এক বন্ধুর মারফত খবর পেলাম বিউটি পার্লার বিক্রি আছে। এদিকে সে বিষয়ে তো কিছুই জানি না। তবু সাহসে ভর করে কিনেই ফেললাম দোকানটা। খুব তাড়াতাড়ি কাজ শিখে নিয়েছিলাম। তাছাড়া ওটা তো চলতি ব্যবসাই ছিল ফলে রোজগারটাও মন্দ হচ্ছিল না।’ কিন্তু বাচ্চারা ক্রমশ বড় হতে লাগল। এদিকে বিউটি পার্লার থেকে বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হয়ে যেত মনিকার। বাড়িতে সময় দিতে পারছিলেন না একটুও। অশান্তি শুরু হল ক্রমশ।
রেস্তরাঁ শুরুর কথা
একদিন দুর্গাপুজোর সময় তপসিয়ার একটা পাড়াতুতো রেস্তরাঁয় খেতে গিয়ে দেখেন লোকের ভিড় জমেছে। সবাই মোমো, চাওমিন ইত্যাদি কিনে খাচ্ছে। সেই প্রথম রেস্তরাঁর ব্যবসা করার কথা মাথায় আসে মনিকার। নিজের মাসির কাছ থেকে বাড়ি সহ জমিটা পেয়েছিলেন তিনি। সেটাকেই সারিয়ে নিয়ে শুরু করলেন হোম কিচেন ‘কিমলিং’। ছোট্ট একটা বাড়ি, পিছনে বেশ খানিকটা জমি। বাড়ির নীচে রেস্তরাঁ আর পিছনে কিচেন। একেবারে ভিন্ন স্বাদের খাবার পরিবেশন করতে শুরু করলেন মনিকা। কলকাতার চীনে খাবারের একটা ঘরানা তৈরি করতে চেয়েছিলেন তিনি। বললেন, টেরিটি বাজারে গিয়ে চীনে খাবার খেয়ে মনে হয়েছিল এমন খাবারই পরিবেশন করব। চাইনিজ ফ্রায়েড রাইস, গ্রেভির পাশাপাশি হাক্কা চাওমিন, চিলি চিকেন, ক্যান্টনিজ, সেচুয়ান ইত্যাদি বিভিন্ন পদে সমৃদ্ধ হয়ে উঠল কিমলিংয়ের মেনু। আর সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেলাম আমি। সম্প্রতি ‘ক্যালকাটা চাইনিজ’ নামে যে বইটা আমার বেরিয়েছে তাতে এই চীনে খাবারের ধরন, কলকাতায় চায়না টাউন গড়ে ওঠা— সবই লিখেছি।’
আগামীর জন্য
মনিকা বললেন, ‘নারী আজ স্বনির্ভরতার জন্য লড়াই করে। আমি বলব, সৎ পথে থেকে যদি খেটে রোজগার করা যায় তাহলে সাফল্য আসবেই। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে ‘হোয়েন লাইফ গিভস ইউ লেমন মেক লেমোনেড’— অর্থাৎ জীবনে যেমন সুযোগ পাওয়া যাবে তার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হবে। পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মাথা ঠান্ডা রেখে খেটে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে কর্মের উপরেই আমাদের অধিকার আছে, ফলের উপর নয়।’
কমলিনী চক্রবর্তী