প্রীতেশ বসু, কলকাতা: ছিল রুমাল, হল বেড়াল! জমির চরিত্রের ক্ষেত্রেও এমনটা হওয়া আকস্মিক কিছু নয়। মাঝে মধ্যেই দেখা যায় দীর্ঘদিন ধরে যে জমি পুকুর বলে চিহ্নিত, রাতারাতি তা বাস্তুতে বদলে গিয়েছে। শুধু পুকুর বুজিয়েয়েই থেমে থাকছে না জমি হাঙররা, ‘শংসাপত্র’ পেশ করেও তা প্রমাণ করতেও পিছপা হচ্ছে না এই অসাধু চক্রীরা। তবে এই শংসাপত্র কোনও ভাবেই রাজ্য সরকারের দেওয় নয়। জমি হাঙরদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রমরমিয়ে চলছে ভুয়ো ‘কনভার্সন সার্টিফিকেট’ বা জমির চরিত্র বদলের জাল বা ভুয়ো শংসাপত্র পাইয়ে দেওয়ার কারবার। তবে আর নয়। এই জালিয়াতি চালিয়ে যাওয়ার দিন এবার শেষ। কারণ, এবার রাজ্যের ইস্যু করা কনভার্সন সার্টিফিকেটে থাকছে ‘কিউআর কোড’। যা শংসাপত্রের সত্যতা যাচাইয়ের অন্যতম উপায়। এই কিউআর কোড স্ক্যান করলেই মিলবে জমি এবং তার চরিত্র বদল সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য।
তবে শুধু পুকুর বা জলাভূমিকে বুজিয়ে বাড়ি বা অন্য কোনও পরিকাঠামো তৈরির জন্য এই ভুয়ো ‘কনভার্সন সার্টিফিকেটের’ আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে, এমনটা নয় বলেই জানিয়েছে প্রশাসনিক মহল। রাজ্যের এক কর্তার কথায়, জমির চরিত্র বদলের দীর্ঘ নিয়ম রয়েছে। অনলাইনে আবেদনের পেয়ে ফিল্ড ভেরিফিকেশন থেকে শুরু করে একাধিক স্তরের যাচাইয়ের পর তবেই দেওয়া হয় কনভার্সন সার্টিফিকেট। পুকুরের ক্ষেত্রে যদি কেউ প্রমাণ করতে পারে, তা ১৯৮৬ সালের ২৪ মার্চের আগে বোজানো, তবেই মেলে কনভার্সন সার্টিফিকেট। এছাড়া বর্তমানে কোনও জলাভূমির চরিত্র বদল করতে গেলে সেই মৌজাতেই বা তার আশপাশের মৌজায় সমান আয়তনের পুকুর বা জলাভূমি কাটার পাশাপাশি আরও একগুচ্ছ নিয়ম মানলে তবেই মেলে ছাড়পত্র। ‘ভুয়ো শংসাপত্রের জোরে মানুষকে যদি বোকা বানিয়ে কোটি কোটি টাকার ফয়দা হয়, তাহলে ক্ষতি কী,’ ব্যাঙ্গার্থে এই উক্তি করেছেন রাজ্যের এক আধিকারিক। কিন্তু কী ভাবে ভুয়ো শংসাপত্রের সাহায্যে বোকা বানাচ্ছে এই অসাধু চক্র? রাজ্যের কাছে আসা কয়েকটি অভিযোগের উল্লেখ করে, এক আধিকারিক জানান, ‘ধরুন বাড়ি তৈরির জন্য ঋণ প্রয়োজন। তবে যে জমির উপর বাড়ি তৈরি হবে, তা রাজ্যের তথ্য ভাণ্ডারে পুকুর বলে চিহ্নিত। পুকুর বোজানো হোক বা না হোক, সেই জমি ‘বাস্তু’ হিসেবে প্রমাণ করতে পারলেই ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ পাওয়া অনেক সহজ হয়ে যাবে। একই ভাবে কৃষি বা শালি জমির ভুয়ো কনভার্সন সার্টিফিকেট দেখিয়ে শিল্প স্থাপনের জন্য সহজেই কোটি কোটি টাকা হাতে পাওয়া যাবে। আর এখানেই প্রয়োজন পড়ে ভুয়ো কনভার্সন সার্টিফিকেটের।
জানা গিয়েছে. এমন কারসাজিতে ভুয়ো এই শংসাপত্র ছাপানো হয়, তা ভূমি বিশেষজ্ঞ ছাড়া কারও পক্ষে ধরা কার্যত অসম্ভব। আর সেই কারণেই শংসাপত্রে কিউআর কোডের ব্যবহার চালু করা হল। কারণ, এটি নকল করা অসম্ভব। যা স্ক্যান করলে দেখিয়ে দিচ্ছে জেলা, ব্লক, মৌজা, খতিয়ান, প্লট অনুযায়ী যে জমির চরিত্র বদল হল, তার পরিমাণ এবং বদলের তারিখ। ফলে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যাঙ্ক আধিকারিক, কারও পক্ষেই আর আসল আর নকল কনভার্সন সার্টিফিকেটের তফাৎ বুঝতে সমস্যা হবে না। কয়েক সপ্তাহ আগেই কনভার্সন সার্টিফিকেট ‘কিউআর কোড’ দেওয়া চালু করেছে রাজ্য ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তর। শীঘ্রই মিউটেশন এবং ওয়ারিশন সংক্রান্ত অর্ডার শিটেও ‘কিউআর কোড’ চালু হবে বলেও সূত্রের খবর।