শ্রীশ্রীঠাকুরের ‘কথামৃতে’ প্রায় অনেক জায়গায় শ্রীশ্রীঠাকুরের মুখে ‘নিত্য-লীলা’ সম্বন্ধে অনেক কথা চোখে পড়ে। সচ্চিদানন্দ ব্রহ্ম, আত্মারূপে সকলের হৃদয়ে এবং নিরাকার, নির্গুণ, ‘শান্তম্ শিবমদ্বৈতম্’ রূপে সবসময় সর্বকালে বিদ্যমান। এইটাকে শ্রীশ্রীঠাকুর ‘নিত্য’ বলে ব্যাখ্যা করতেন। নিত্য মানে ‘External’ আদি অন্তহীন, সর্বব্যাপী, অদ্বৈত ব্রহ্ম তত্ত্ব। এই তত্ত্ব যখন মায়ার আবরণের দ্বারা ঢাকা পড়ে আর জীব তার নিজ স্বরূপ এবং নিত্য, নিরঞ্জন, নির্গুণ, স্থির শান্ত সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মভাবকে ভুলে গিয়ে মায়ার আবরণ শক্তি ও বিক্ষেপ শক্তি দ্বারা সৃষ্ট এই সুখ-দুঃখময় জগৎকেই সত্য বলে ধরে এই সংসারচক্রে হাবুডুবু খেতে থাকে তখন তাকে ধর্মের গ্লানি বা পতন বা অধর্মের প্রকোপ বলা হয়। তখন এই সচ্চিদানন্দ ব্রহ্ম তাঁরই মায়াশক্তিকে নিজের বশে রেখে সেই মায়া শক্তি অবলম্বনেই পরম করুণায়, জীবের প্রতি অহেতুকী কৃপায় একটা সাধারণ রক্তমাংস বিশিষ্ট জীবধর্মাবলম্বী মানব দেহ ধারণ করে এই পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন। এইভাবে সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মের পৃথিবীতে অবতীর্ণ হওয়াকেই ‘লীলা’ বলা হয়। সংস্কৃতে লীলার অর্থ—খেলা, নাটক; নয় অথচ আছে বলে দেখানো, হ্যাঁকে না করা, নাকে হ্যাঁ করা, জন্ম-মৃত্যুরহিতকে জন্ম-মৃত্যু-যুক্ত বলে দেখানো, ইত্যাদি। এই লীলাকেই শ্রীকৃষ্ণ গীতায় এক শ্লোকে সুন্দর বর্ণনা করেছেন—
“অজোঽপি সন্ অব্যয়াত্মা ভূতানামীশ্বরোঽপি সন্।
প্রকৃতিং স্বাম্ অধিষ্ঠায় সম্ভবাম্যাত্মমায়য়া।।”
—আমি অজন্মা (জন্মরহিত) হয়েও, অব্যয়াত্মা (অখণ্ড) হয়েও ভূগণের মধ্যে তাদের নিয়ন্তা ঈশ্বর (অন্তর্যামিরূপ) হয়েও মায়াকে বশীভূত এবং মায়ার মধ্যে (সহায়তায়) যেন এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করি। এইটাই সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মের মানুষ রূপ ধারণ করার লীলা। এই ব্রহ্মের মায়াতে জন্মগ্রহণ করে ধর্মকে পুনঃ প্রতিষ্ঠা করে জীবকে চৈতন্য প্রদান করে তাকে ব্রহ্মানন্দের পথে তুলে ধরার জন্য যত কর্ম করেন সে সবটাকেই ‘লীলা’ বলা হয়। এইজন্য শ্রীকৃষ্ণ আবার তাঁর গীতায় বলেছেন—
“জন্ম কর্ম চ মে দিব্যমেবং যো বেত্তি তত্ত্বতঃ।
ত্যক্ত্বা দেহং পুনর্জন্ম নৈতি মামেতি সোঽর্জুন”।।
—হে অর্জুন, এই প্রকার (আমি জন্মরহিত অজন্মা, অব্যক্ত, ঈশ্বর) যে ব্যক্তি আমাকে জানে এ জগতে শরীর ত্যাগ করে, আর এই মায়ার সংসারে পুনর্জন্ম না নিয়ে আমাতে লীন হয়। এই নিত্য ও লীলা তত্ত্বটাই শ্রীশ্রীঠাকুর তাঁর ‘কথামৃতে’ বহু জায়গায়, বহুভাবে, বহু গল্পচ্ছলে, উপদেশ দিয়ে মানুষের মনে—‘লীলা ধরে ধরে নিত্যে পৌঁছানো যায়’ বলে দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল করতে চেষ্টা করেছেন।
প্রত্যেক সৃষ্ট বস্তুর বা লীলার আদি অন্ত অনিবার্য। লীলা যতই মধুর হোক, নাটক যতই সুন্দর আনন্দদায়ক হোক, এক সময়ে তার অন্ত বা শেষ হবেই। মায়ার মধ্যে আসলে স্বয়ং ঈশ্বরকেও এ নিয়ম মেনে চলতে হবে। এটাকে ঠাকুর ঠাট্টা করে ইংরেজীতে সব মায়ার ‘under’-এ বলতেন। যুগে যুগে যুগ প্রয়োজনে সচ্চিদানন্দ ব্রহ্ম জীবোদ্ধারের জন্য মানুষ রূপ ধারণ করে ‘জন্ম কর্ম চ মে দিব্যং’- রূপে লীলা করে গেছেন।
স্বামী সৎপ্রভানন্দের ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ও রঙের গামলা’ থেকে