আমাদের এই পৃথিবী সত্যিই এক বিচিত্র জায়গা। এখানে এমন অনেক কিছুই রয়েছে যার ব্যাখ্যা মেলা কঠিন। তেমনই কিছু জায়গার সঙ্গে তোমাদের পরিচয় করাচ্ছেন কমলিনী চক্রবর্তী।
আমাদের এই পৃথিবী সত্যিই এক বিচিত্র জায়গা। এখানে এমন অনেক কিছুই রয়েছে যার ব্যাখ্যা মেলা কঠিন। তেমনই কিছু জায়গার সঙ্গে তোমাদের পরিচয় করাচ্ছেন কমলিনী চক্রবর্তী।
কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ায় রয়েছে এক আশ্চর্য হ্রদ। নাম তার স্পটেড লেক। গোটা হ্রদের জলেই ছোট ছোট গোলাকার দাগ। ঠিক যেন মাটির উপর নকশা! প্রকৃতির মাঝেও এমনই এক নকশা এঁকে রেখেছেন অন্তর্যামী। তুঁতে, হলুদ, লাল, বেগুনি এই ছোট বড় বিন্দুগুলো মুগ্ধ হয়ে দেখা ছাড়া আর উপায়ই বা কী?
অনেকটাই গল্পের মতো শোনাচ্ছে হয়তো, কিন্তু এমন হ্রদ এই পৃথিবীর বুকেই বিরাজমান। আবার সারা বছরই যে তার একই রূপ তাও নয়। বর্ষা থেকে বসন্তকালে হ্রদে একেবারেই টলটলে জল দেখা যায়। শীতে তার খানিকাংশ জমে গেলেও বাকিটা থাকে নীল জলের মনোমুগ্ধকর শোভায় পরিপূর্ণ। সেই নীল জলরাশি দেখে বোঝারই উপায় নেই যে তারই নীচে এমন ছোট বড় বিন্দুর খেলা! এই বিশেষ দৃশ্যের খেলা শুরু হয় গ্রীষ্মকালে। সূর্যের দুরন্ত তাপে তখন হ্রদের জল ক্রমশ শুকিয়ে যেতে থাকে। ফলে থেকে যায় হ্রদের বুকে রং বেরঙের জলবিন্দু। কোনওটায় নীল রঙের জল, কোনওটায় বা লাল, কোথাও হয়তো জলে হলুদ আভা, কোথাও বা তা-ই বেগুনি।
কানাডাবাসীর কাছে এ যেন দেবতার সৃষ্টি করা ম্যাজিক। হ্রদ এই আছে আবার এই নেই! আসলে জলের নীচে রয়েছে নানারকম খনিজ পদার্থের আস্তরণ। মাটির বুকে বড় গর্ত করে জমা হয়েছে সেগুলো। কোথাও আয়রন, কোথাও ক্যালশিয়াম, কোথাও বা ম্যাগনেশিয়াম অথবা সোডিয়াম সালফেট। জলের সঙ্গে মিলেমিশে তাকে রঙিন করে তুলেছে এইসব খনিজ। কিন্তু কোথা থেকে এল এগুলি? ভূতাত্ত্বিকদের বিশ্বাস, কানাডার পাহাড় বেয়ে গড়িয়ে পরা ঝর্ণার জল বয়ে এনেছে এইসব খনিজ। তারপর পাহাড়ের পাদদেশে পড়ে যখন হ্রদ হয়ে আপন স্রোতে বয়ে গিয়েছে সেই ঝর্ণার জল, তখনই এই খনিজগুলো এদিক সেদিক গেঁথে গিয়েছে মাটির উপর। খুঁজে নিয়েছে নিজের ঠিকানা। বর্ষায় যখন জলের আধিক্য, তখন তেমন বোঝা যায় না এদের অস্তিত্ব। কিন্তু গ্রীষ্মে যখন হ্রদের জল শুকিয়ে যায়, তখনই তা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে সকলের সামনে। লোকের মনে হয় অন্তর্যামীর অপার লীলা।
আর সেই কারণেই এই হ্রদটিকে পবিত্র বলে মনে করেন এই অঞ্চলের লোকজন। তাই পর্যটকদের গোটা অঞ্চল ঘুরে দেখা নিষেধ। একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব পর্যন্তই যেতে পারেন তাঁরা। বাকিটা ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের অধীন। নইলে নাকি এখানকার পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে শুধুই যে প্রাকৃতিক শোভাবর্ধনের জন্য এই হ্রদের উপস্থিতি তা ভাবলে কিন্তু ভুল করবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এই হ্রদের তলায় জমা খনিজ ব্যবহার করা হয়েছিল বারুদ বানানোর কাজেও। গ্রীষ্মে হ্রদের জল শুকিয়ে যখন নকশা ফুটে ওঠে তখনই ঈশ্বরের অপার লীলাকে ধন্যবাদ জানিয়ে গ্রামবাসীরা এখানে প্রার্থনার আয়োজন করে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাকে দূরে সরিয়ে রেখে ঈশ্বরের জাদুকে আশীর্বাদ হিসেবে গ্রহণ করেছেন ব্রিটিশ কলম্বিয়ার ওকানাগান উপত্যকার মানুষজন।