নিজস্ব প্রতিনিধি, তমলুক: বিয়ের পরই পরকীয়ায় আসক্তি বাড়ছে। তাতে অনুঘটকের কাজ করছে সোশ্যাল মিডিয়া। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে দাম্পত্য জীবনে। তমলুকের ফ্যামিলি কোর্টে হু-হু করে ডিভোর্সের পিটিশন জমা পড়ছে। এই মুহূর্তে তমলুক ফ্যামিলি কোর্টে ডিভোর্সের বকেয়া মামলার সংখ্যা তিন হাজার। মার্চ মাসেই এই কোর্টে ৫৬টি ডিভোর্সের জন্য মামলা দায়ের হয়েছে। এক মাসে ওই আদালতে ডিভোর্স হয়েছে ১২০জোড়া দম্পতির। সকাল সাড়ে ১০টা থেকেই ওই কোর্টে মামলাকারী, আইনজীবীদের ভিড় লেগেই থাকছে। ২০২৩ সালে ডিসেম্বর মাসে শুধুমাত্র পারিবারিক বিবাদ মেটানোর জন্য এই কোর্ট শুরু হয়। তমলুক মহকুমা এলাকার বাসিন্দারা এখানে ডিভোর্স, খোরপোশ এবং সন্তানের অভিভাবক হওয়ার আইনি লড়াইয়ের জন্য এই কোর্টে মামলা করেন। যদিও মোট মামলার ৯০শতাংশই ডিভোর্স সংক্রান্ত।
শুরু থেকেই এই কোর্টের বিচারক হিসেবে রয়েছেন ঈশানী চক্রবর্তী বন্দ্যোপাধ্যায়। মিউচ্যুয়াল ডিভোর্সের মামলা ফাইল হওয়ার পরই বিচারক শুরুতেই দাম্পত্যের ফাটল বোজানোর চেষ্টা করেন। কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করেন। জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের(ডিএলএসএ) অফিসে পাঠিয়েও কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। যে কারণে ডিভোর্স চূড়ান্ত পরিণতি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সোমবারই ওই কোর্টে পাঁচটি ডিভোর্স হয়ে গেল। তারমধ্যে এক দম্পতির এক শিশুপুত্র রয়েছে। মা কোর্টে দাঁড়িয়ে সাফ জানান, তিনি ওই সন্তানকে চান না। স্বামী এবং সন্তানকে ছাড়াই তিনি বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবেন। সন্তানের প্রতি মায়ের এহেন মন্তব্য শুনে গোটা কোর্ট থ। আশ্চর্য হন স্বয়ং বিচারকও।
সোমবারই নন্দকুমার থানার খঞ্চি থেকে এক গৃহবধূ তাঁর বয়স্ক ঠাকুরদাকে নিয়ে তমলুক ফ্যামিলি কোর্টে এসে ডিভোর্স মামলা ফাইল করেন। আট বছর আগে এমএ পড়ার সময় বাড়ি থেকে পালিয়ে ওই থানার সাওড়াবেড়িয়া-জালপাই গ্রামের এক যুবককে বিয়ে করেন। দম্পতির এক কন্যা সন্তানও আছে। কিন্তু, মদ্যপ অবস্থায় স্বামী রোজ অত্যাচার করছে বলে অভিযোগ। পরকীয়ায় আসক্ত যুবক। নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে ডিভোর্স মামলা ফাইল করেন।
সোমবার কোলাঘাট থানার শান্তিপুর থেকে এক প্রৌঢ় মেয়েকে নিয়ে ফ্যামিলি কোর্টে উপস্থিত ছিলেন। ওই প্রৌঢ় পেশায় মোটর মেকানিক। ছ’বছর আগে মেয়ে ১৮বছর বয়স পেরনোর পরই টিউশনি পড়তে যাওয়ার নাম করে মেচেদার এক যুবকের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেন। সেই যুবক মাদক এবং পরকীয়া আসক্ত হওয়ায় ২০২২সালে ১৩জুলাই ডিভোর্স মামলা দায়ের করেন ওই যুবতী। এদিন ফ্যামিলি কোর্টে মামলার দিন ছিল। বিচারক ওই দম্পতিকে নিয়ে মুখোমুখি বসে তাঁদের মতামত নেন। যেকোনও উপায়ে ডিভোর্স চান ওই যুবতী।
শুধুমাত্র সাধরণ নাগরিক নন, ডিভোর্স মামলা দায়ের হয়েছে বিচারক থেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং শিক্ষক পরিবারেও। প্রতিদিন গড়ে পাঁচ-ছ’টি মামলা দায়ের হচ্ছে। তার অধিকাংশ ডিভোর্স সংক্রান্ত। বিয়ের এক বছরের মধ্যেই অনেক দম্পতির মধ্যে ডিভোর্সের ঘটনা ঘটছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলস বানানোর জন্যও সম্প্রতি এক দম্পতির মধ্যে ডিভোর্স হয়েছে এই কোর্টে। তবে, ডিভোর্সের বেশিরভাগ কারণ হিসেবে পরকীয়া উঠে এসেছে। সেই পরকীয়া সম্পর্কে আসল ভিলেন হল মোবাইল। বিয়ের পর স্বামী ও সংসার ছেড়ে অনেক বধূ প্রেমিকের সঙ্গে চলে যাচ্ছে। অসহায় বাবা সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে কোর্টে এসে ডিভোর্স চাইছেন। ফ্যামিলি কোর্টের ভিতর যখন ডিভোর্স মামলায় সওয়াল ও পাল্টা সওয়াল চলছে তখন আদালতের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকছে বধূর প্রেমিক। এমন ঘটনাও হামেশাই ঘটছে।