আমাদের চারপাশে কত না জিনিস! তার এক একটির গন্ধ এক একরকম। এসব গন্ধের উপরেও নির্ভর করে আমাদের আবেগ, মেজাজ। কোন গন্ধের প্রভাব কী?
আমাদের চারপাশে কত না জিনিস! তার এক একটির গন্ধ এক একরকম। এসব গন্ধের উপরেও নির্ভর করে আমাদের আবেগ, মেজাজ। কোন গন্ধের প্রভাব কী?
আমাদের আবেগ ও মেজাজের ওপর ঘ্রাণের দারুণ প্রভাব আছে। ঘ্রাণ ফিরিয়ে দিতে পারে কোনও প্রিয় স্মৃতি, প্রশান্ত করতে পারে স্নাযু, এমনকী আগামীর দিনগুলোর জন্য করতে পারে উজ্জীবিত। লেবুপাতা থেকে সবুজ ঘাস— এমন বেশ কিছু গন্ধ আমাদের মন ও মস্তিষ্কের ওপর বিভিন্নভাবে প্রভাব ফেলে।
ঘ্রাণ ও আবেগের মধ্যে সম্পর্কের পিছনে ভূমিকা পালন করে মানুষের জৈবিক গঠন। আমাদের ঘ্রাণশক্তি সরাসরি লিম্বিক সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত। লিম্বিক সিস্টেম হল মস্তিষ্কের আবেগকেন্দ্র, যা আমাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঘ্রাণশক্তির সঙ্গে লিম্বিক সিস্টেমের এই সংযোগের কারণেই কিছু ঘ্রাণ জাগাতে পারে স্মৃতি, উদ্দীপিত করতে পারে আবেগ, প্রভাবিত করতে পারে আমাদের আচরণকেও।
ঘ্রাণ কীভাবে আমাদের মনমেজাজকে প্রভাবিত করে তা বুঝতে পারলে আমরা নিজেদের প্রয়োজনমতো বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ধরনের ঘ্রাণ নিয়ে শরীর ও মন ভালো রাখতে পারি।
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
আবেগ, মেজাজ ও শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াগুলোর উপর ঘ্রাণের প্রভাব বোঝার জন্য এর নেপথ্যের বৈজ্ঞানিক কারণও বোঝা প্রয়োজন। ঘ্রাণের সঙ্গে মন ও মস্তিষ্কের সম্পর্ক বুঝতে চাইলে আমাদের অলফ্যাক্টরি সিস্টেম, লিম্বিক সিস্টেম ও নিউরোট্রান্সমিটারের ভূমিকা জানতে হবে।
অলফ্যাক্টরি সিস্টেম
অলফ্যাক্টরি সিস্টেম আমাদের ঘ্রাণশক্তির জন্য দায়ী। আমাদের নাকে রয়েছে প্রচুর অলফ্যাক্টরি রিসেপ্টর। আমরা যখন কোনও কিছুর ঘ্রাণ নিই বা গন্ধ শুঁকি, তখন ওই ঘ্রাণ বা গন্ধ সৃষ্টিকারী বস্তুর অণুগুলো আমাদের নাকের অলফ্যাক্টরি রিসেপ্টরগুলোর সঙ্গে বিক্রিয়া করে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। পুরো প্রক্রিয়াটির কারণে আমরা বিভিন্ন ধরনের গন্ধ শনাক্ত করতে ও একটি গন্ধের সঙ্গে অন্য একটি গন্ধের তফাত করতে পারি। অতীত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্ন গন্ধের সঙ্গে আমরা নিজেদের আবেগ ও জীবনের নানা স্মৃতির যোগ খুঁজে পাই।
লিম্বিক সিস্টেম
লিম্বিক সিস্টেম হল আমাদের মস্তিষ্কের এমন একটি অংশ, যা সব আবেগের কেন্দ্রস্থল। আমাদের আবেগ, স্মৃতি ও মেজাজ কখন কেমন থাকবে, তা নির্ভর করে আমাদের লিম্বিক সিস্টেমের ওপর। অলফ্যাক্টরি সিস্টেম যখন কোনও গন্ধ শনাক্ত করে, তখন লিম্বিক সিস্টেমে সংকেত পাঠায়। লিম্বিক সিস্টেম তখন আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা ও সেই নির্দিষ্ট গন্ধের সঙ্গে সংযোগের ওপর ভিত্তি করে একটি মানসিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ঘ্রাণ ও আবেগের মধ্যে গভীর সম্পর্ক আছে। তাই তা আমাদের মেজাজকে প্রভাবিত করে।
নিউরোট্রান্সমিটার
নিউরোট্রান্সমিটার হল মস্তিষ্কের রাসায়নিক বার্তাবাহক। এটি আমাদের মানসিক অবস্থা, স্মৃতিশক্তি, ক্ষুধা, উত্তেজনাসহ বিভিন্ন অনুভূতি নিয়ন্ত্রণ করে। কিছু ঘ্রাণ সেরোটোনিন, ডোপামিন ও এন্ডোর্ফিনের মতো নিউরোট্রান্সমিটারের নিঃসরণকে উদ্দীপিত করে।
কিছু ঘ্রাণ ও তার প্রভাব
লেবু: সাইট্রাস জাতীয় ফল, যেমন লেবু, কমলা ইত্যাদি ফলের ঘ্রাণ মন ভালো করে। সতর্কতা বাড়ায় ও দুর্বলতা দূর করে। দিনের শুরুটা উৎসাহ ও উদ্দীপনার সঙ্গে শুরু করতে চাইলে সাইট্রাস জাতীয় ফলের ঘ্রাণ শুঁকে শুরু করতে পারেন। দুপুরবেলার ক্লান্তি দূর করতেও এসব ফলের ঘ্রাণ কার্যকর।
গোলাপ: গোলাপের ঘ্রাণ মন শান্ত রাখে, মানসিক চাপ কমায় এবং প্রশান্তির অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। তাই প্রেমময় অনুভূতি বা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরিতে গোলাপ অনেকেরই প্রথম পছন্দ। গোলাপের পাপড়ি থেকে যে এসেনশিয়াল অয়েল তৈরি করা হয়, সেটি ত্বক থেকে বয়সের ছাপ দূর করে।
পুদিনা: পুদিনাপাতার সুবাস তাজা ও প্রাণবন্ত। এই ঘ্রাণ মনোযোগ বাড়ায়, চিন্তাশক্তির উন্নতি ঘটায়। ক্লান্তি দূর করতে ও সতর্কতা বৃদ্ধিতেও এই পাতার ঘ্রাণ খুব কার্যকর। যাঁরা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ও পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াতে চান, তাঁদের জন্য পুদিনাপাতার ঘ্রাণ খুব উপকারী।
বেল ফুল: বেল ফুলের ঘ্রাণেরও অনেক গুণ। মানসিক চাপ কমায়, শরীর ও মন প্রশান্ত করে। উদ্বেগ দূর করতে ও সুস্থতার অনুভূতি আনতে সাহায্য করে।
দারচিনি: রান্নায় এই মশলার ব্যবহার বহুল! দারচিনির ঘ্রাণ সতর্কতা ও মনোযোগ বৃদ্ধি করে।
নারকেল তেল: অপরিশোধিত নারকেল তেলের ঘ্রাণে কিছু উপকারী প্রভাব আছে। এই ঘ্রাণ শরীর ও মন প্রশান্ত করে। ফলে উচ্চ রক্তচাপের রোগীর মাথায় নারকেল তেল মালিশ করে দিলে আরাম বোধ করেন।
কফি: ধূমায়িত কফির ঘ্রাণ মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ায়, বোধশক্তির উন্নতি ঘটায়, কোনও কাজে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে সহায়তা করে। কফির ঘ্রাণ সতর্কতাবোধ ও স্মৃতিশক্তি বাড়ায়, ঘুম দূর করে। এ কারণে রাত জেগে পড়াশোনা কিংবা ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্টের কাজ করার সময় কফি অনেকেরই পছন্দ।
লবঙ্গ: লবঙ্গ ও তা থেকে তৈরি ক্লোভ এসেনশিয়াল অয়েলের ঘ্রাণ খুবই উপকারী। এটি মাথাব্যথা কমায়, ব্যথা উপশম করে, হজমের প্রক্রিয়ার উন্নতি ঘটায় ও মানসিক সুস্থতা বৃদ্ধি করে।
তাজা ঘাস: সদ্য কাটা তাজা ঘাসের ঘ্রাণ মনে প্রশান্তি আনে, মেজাজ ঠান্ডা করে ও মানসিক চাপ কমায়। এ কারণে অ্যারোমাথেরাপির ক্ষেত্রে ঘাস বেশ জনপ্রিয়। লিখেছেন সুরজিত্ মুখোপাধ্যায়