Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এসআইআর: অশান্তি হলে দায় কমিশনেরও

মুনি ও মুষিকের সেই গল্পটা মনে আছে? মৃত্যুভয়ে কম্পিত মুষিককে মুনি অভয় দিলেন। তার প্রাণ বাঁচাতে প্রথমে বিড়াল, তারপর কুকুর করে দিলেন।

এসআইআর: অশান্তি হলে দায় কমিশনেরও
  • ২৯ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: মুনি ও মুষিকের সেই গল্পটা মনে আছে? মৃত্যুভয়ে কম্পিত মুষিককে মুনি অভয় দিলেন। তার প্রাণ বাঁচাতে প্রথমে বিড়াল, তারপর কুকুর করে দিলেন। শেষপর্যন্ত তাকে বাঘও বানিয়ে ছিলেন মুনি। তাতে বন্যপশুরা বাঘরূপী মুষিককে ভয় পেলেও গ্রামের লোকজন পেত না। কারণ তারা জানত, বাঘ আসলে ইঁদুর। বাঘের চালচলন দেখে লোকজন বিদ্রুপ করত। মুষিক দেখল, মুনি বেঁচে থাকলে তাকে হাসির খোরাক হয়েই থাকতে হবে। তাই সে একদিন মুনির ঘাড় মটকাতে উদ্যত হল। ধ্যানমগ্ন মুনি মুষিকের অভিপ্রায় বুঝতে পেরে বললেন, ‘পুনঃ মুষিকঃ ভবঃ।’ বাঘ ফের ইঁদুর হয়ে গেল।

Advertisement

গল্পটা কমবেশি প্রায় সকলেরই জানা। এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, এসআইআর নিয়ে যখন তুলকালাম চলছে তখন এমন একটা গল্প শোনানো কেন? অনেকে বলছেন, এসআইআরকে সামনে রেখে বঙ্গ বিজেপি ‘বাঘ’ হতে চাইছে। কিন্তু, তাদের অবস্থাও শেষপর্যন্ত মুষিকের মতো না হয়! কারণ ছিন্নমূল মানুষের সমর্থনেই এরাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে লাগাতার ভালো ফল করেছে বিজেপি। বাংলাদেশ থেকে উৎখাত হয়ে এদেশে আসা হিন্দুদের বেশিরভাগ এতদিন বিজেপিকেই সমর্থন জানিয়েছেন। কিন্তু, এসআইআর শুরু হতেই তাঁরা বুঝতে পারছেন, এতদিন তাঁরা যে দলটিকে বাংলায় ‘বাঘ’ বানিয়েছেন, এখন সে তাঁদের ঘাড় মটকাতে চাইছে। 
এসআইআর শুরু হওয়ার আগে থেকেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ বিজেপি বিরোধী সমস্ত দল একযোগে বলে আসছে, এসআইআরকে সামনে রেখে এনআরসি করতে চাইছে বিজেপি। ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন নতুন কিছু নয়। ২০ বছর অন্তর এসআইআর হয়ে থাকে। কিন্তু, এসআইআর-এর সঙ্গে নাগরিকত্বের বিষয়টি জুড়ে যাওয়ায় ব্যাপক জলঘোলা হচ্ছে। এসআইআর সময়সাপেক্ষ বিষয়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সেটা খুব দ্রুত সম্পন্ন করতে চাইছে। আর সেটা করা হচ্ছে বাংলার নির্বাচনের মুখে। উদ্দেশ্য যে একটি রাজনৈতিক দলকে খুশি করা, তা বলাই বাহুল্য। তবে, সেটা করতে গিয়ে সর্বস্তরের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বিএলওর কাজে যুক্ত হয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষিকারা। একই সঙ্গে তাঁদের স্কুলের ও এসআইআরের কাজ করতে হচ্ছে। এই সময় স্কুলে ফাইনাল পরীক্ষা হয়। ফলে প্রশ্ন করা, খাতা দেখার চাপ থাকে। তাছাড়া কম্পিউটারে নাম এবং তথ্য আপলোডিংয়ের ব্যাপারে সকলে দক্ষ নন। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকার বিএলওরা। নেটওয়ার্ক এবং সার্ভার সমস্যা তো আছেই। এ তো গেল এসআইআরের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষক ও সরকারি কর্মীদের সমস্যা। এছাড়াও সাধারণ মানুষও চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের চাষি, খেতমজুর ও আদিবাসীরা।
গ্রামের ভোটারদের একটা বড়ো অংশ এই সময় চাষের কাজে ব্যস্ত থাকেন। বাংলায় সবচেয়ে বেশি হয় আমন চাষ। বহু এলাকায় সারা বছরে একটিই চাষ হয়। সেই ফসল বাড়িতে না তোলা পর্যন্ত চাষিরা রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না। ধান উঠতে না উঠতেই শুরু হয়ে যায় আলু বসানোর প্রস্তুতি। ফলে চলে খেতমজুর নিয়ে টানাটানি। বহু খেতমজুর দু’টো শিফটে কাজ করে বাড়তি উপায় করেন। কিন্তু, এসআইআরের চক্করে পড়ে সব চৌপাট হয়ে 
যাচ্ছে। অনেকেই কমিশনের দাবিমতো কাগজপত্র জোগাড় করতে পারছেন না। তাঁরা ভুগছেন খসড়া তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার আশঙ্কায়। তবে, শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে তাঁরা এতটা ছটফট করতেন না। ঘুম ছুটেছে ‘বে-নাগরিক’ হওয়ার আশঙ্কায়।
এর আগে বহু মানুষ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখেছে, ভোটার তালিকায় নাম নেই। অনেকে আবার বুথে ঢুকে আঙুলে কালি লাগিয়েও ভোট দিতে পারেননি। কারণ তাঁর ভোট আগেই কেউ দিয়ে দিয়েছে। 
ফলে রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ি ফিরেছেন। তারজন্য তাঁরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন, চিৎকারও করেছেন। কিন্তু আতঙ্কিত হননি। কারণ তাঁরা জানতেন, 
পৌষ মাস বারবার ঘুরে আসে। পরেরবার ঝাল মিটিয়ে নেবেন। কিন্তু, এবার যা হচ্ছে তাতে সেই সুযোগ তাঁরা পাবেন না।
মানুষ যখন ‘বে-নাগরিক’ হওয়ার ভয়ে ছটফট করছে তখন বঙ্গ বিজেপি মনে করছে, এসআইআর তাদের জন্য হবে ‘পৌষ মাস’। তবে, যাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ যাবে তাঁদের যে সর্বনাশ হবে, তা নিয়ে দ্বিমত নেই। তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া মানেই নাগরিকত্ব খোয়ানো। সমস্ত রকম সরকারি সুযোগ সুবিধে থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কাও 
প্রবল। সেই আশঙ্কা তীব্র হয়েছে বিজেপি নেতাদের হুংকারে। তাঁরা বলছেন, ‘সরকারি টাকায় ‘বিদেশি’দের পেট ভরানো চলবে না।’ ভয়ের আরও একটা কারণ নাম বাদ গেলে তাঁদের জায়গা ‘ডিটেনশন ক্যাম্পে’ নাকি কাঁটাতারের বাইরে হবে, সেটা ঠিক করবে কেন্দ্রীয় সরকার।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষ তাকিয়ে আছে ৯ ডিসেম্বরের দিকে। ওই দিনই খসড়া তালিকা প্রকাশ হওয়ার কথা। সেই তালিকায় যে এরাজ্যে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ মানুষের নাম থাকবে না, সেটা ডিজিটাইজেশনের পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। এখনও পর্যন্ত যা জানা গিয়েছে, তাতে ৯ লক্ষ মৃত সহ প্রায় ২৮ লক্ষ নাম বাদ যাচ্ছে। ফলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। 
বছর পাঁচেক আগে এনআরসি ইশ্যুতে উত্তাল হয়েছিল মুর্শিদাবাদ, মালদহ সহ রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকা। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েছিল কিছু মৌলবাদী সংগঠন। ট্রেন লাইন উপড়ে ফেলা, স্টেশনে আগুন লাগানো, নির্বিচারে লুটপাট চালানো, গুলি করে 
মানুষ খুন, কিছুই বাদ যায়নি। রাজ্যজুড়ে নৈরাজ্য 
সৃষ্টি ও দাঙ্গা বাঁধানোর ষড়যন্ত্র হয়েছিল। অনেকের আশঙ্কা, তালিকা থেকে বাদ যাওয়া ভোটারদের ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ফের রাজ্যে অশান্তি পাকানোর চেষ্টা হতে পারে। মৃত ও অনুপ্রবেশকারীদের নাম বাদ দেওয়াই উচিত। তাতে সমস্যা নেই। 
কিন্তু প্রকৃত ভোটারদের নাম বাদ গেলে হুজ্জুতির আশঙ্কা প্রবল। তেমন কিছু ঘটলে কমিশন দায় 
এড়াতে পারবে না।
রাজ্যে বিশৃঙ্খলা পাকালে লাভ কাদের? অবশ্যই বিরোধীদের। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় রাজ্য সরকার ব্যর্থ বলে হইচই করবে। রাষ্ট্রপতি শাসনে ভোট করার দাবি জানাবে। পাশাপাশি বিভাজনের রাজনীতির ভিত কিছুটা পোক্ত করার মওকাও পেয়ে যাবে। মৌলবাদীরাও এর সুযোগ নেবে। এখনও পর্যন্ত এরাজ্যের সংখ্যালঘুরা বরাবর রাজনীতির মূল স্রোতের সঙ্গেই থেকেছেন। তাঁরা নির্বাচনে বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে সমর্থন করেননি। কিন্তু এসআইআরকে সামনে রেখে বিজেপি যেভাবে বিভাজনের রাজনীতিতে ঘি ঢালছে, তাতে মৌলবাদীরাও হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। তারাও জমি তৈরির মরিয়া চেষ্টা চালাবে। তবে একটা 
কথা মনে রাখা দরকার, বিহারে খসড়া তালিকা প্রকাশের পর কমিশন ২১ লক্ষ ৫৩ হাজার নাম অন্তর্ভুক্ত করতে বাধ্য হয়েছিল। তাই খসড়া তালিকা থেকে বাদ যাওয়া ভোটারদের প্রতিবাদ সংযত এবং গণতান্ত্রিক হওয়াই বাঞ্ছনীয়। 
একুশের নির্বাচনের আগে বিজেপি এরাজ্যে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল। তৃণমূলে ভাঙন ধরায় অনেকেই মনে করেছিলেন, বিজেপি ক্ষমতায় আসতে চলেছে। নরেন্দ্র মোদি এবং অমিত শাহের বাংলায় ডেলি প্যাসেঞ্জারি সেই প্রত্যাশাকে উস্কে দিয়েছিল। দিল্লির নেতাদের ঘনঘন বাংলায় আসার বিষয়টি বিজেপি কৌশলে কাজে লাগিয়ে ছিল। তারা প্রচার করেছিল, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের কাছে সরকার পরিবর্তনের রিপোর্ট আছে বলেই প্রধানমন্ত্রী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মতো হেভিওয়েট নেতারা বাংলায় ঝাঁপিয়েছেন। পরিবর্তনের সম্ভাবনা না থাকলে তাঁরা এত গুরুত্ব দিতেন না। বিজেপির ভাঁওতা অনেকে বিশ্বাসও করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর মানুষ বুঝতে পেরেছিল, সবটাই গিমিক।
তৃণমূল কংগ্রেস বিরোধীদের হাতে একের পর এক ইশ্যু তুলে দিয়েছে। কিন্তু, একটিও তারা কাজে লাগাতে পারেনি। বিজেপি এরাজ্যে লড়াইয়ে আছে, এমনটা মাস চারেক আগেও তেমন কেউ মনে করত না। উল্টে অনেকেই মনে করছিলেন, বিজেপি মুখ থুবড়ে পড়ায় বামেদের মাটি শক্ত হবে। কিন্তু এসআইআর এর সঙ্গে নাগরিকত্বের বিষয়টি জুড়ে দিয়ে বিজেপি রাতারাতি ‘বাঘ’ সাজতে চাইছে। বিহারের নির্বাচনের পর তর্জন-গর্জন কিঞ্চিৎ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলার নির্বাচন পর্যন্ত সেই গর্জন শোনা যাবে। কিন্তু তারপর? বিজেপির অবস্থা গল্পের মুষিকের মতো হবে না তো? 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ