Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

অনলাইন প্রতারণার ফাঁদে এসআইআর ও চাকরি

অলনাইনে অন্যের টাকা জালিয়াতি করে নিয়ে নেওয়ার প্রতারণা এদেশে নতুন নয়। কিন্তু কয়েক মাস অন্তর অন্তর বদলে যায় জালিয়াতির ধরন।

অনলাইন প্রতারণার ফাঁদে এসআইআর ও চাকরি
  • ২৯ নভেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অলনাইনে অন্যের টাকা জালিয়াতি করে নিয়ে নেওয়ার প্রতারণা এদেশে নতুন নয়। কিন্তু কয়েক মাস অন্তর অন্তর বদলে যায় জালিয়াতির ধরন। মানুষের বিশ্বাস ও সামাজিক অবস্থাকে হাতিয়ার করে নতুন করে চুরি-জোচ্চুরির ধরন খুঁজতে থাকে প্রতারকরা। সেখানেই বোকা বনে যান সাধারণ মানুষ। এই যেমন উপরের দুই ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে এসআইআর ও এসএসসি চাকরির প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা নিরন্তর চলছে। জালিয়াতরাও তাই হাতিয়ার করেছে এগুলি।
নানা ধরনের অনলাইন স্ক্যাম নিয়ে জনগণকে সারা বছরই সচেতন করে কলকাতা পুলিশ ও রাজ্য পুলিশ। রয়েছে প্রতিটা পুলিশ কমিশনারেটের পৃথক সাইবার সেল। তাতে সচেতনতা বেড়েছে অবশ্যই। তবে এখনও ক্ষণিকের ভুলে অনেকেরই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা গায়েব হচ্ছে। এই প্রসঙ্গে বেশ কিছু সচেতনতার কথা জানালেন চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের আধিকারিকরা। 

Advertisement

ঝুঁকি এড়াতে কী করণীয়
প্রথমেই জেনে রাখুন, চাকরির ক্ষেত্রে বা এসআইআর সংক্রান্ত বিষয়ে এমন কোনও ওটিপি প্রয়োজন পড়ে না। চাকরির নিয়োগপত্রের জন্য কোনও ওটিপি লাগে না। আর ফর্ম ফিলআপের ক্ষেত্রে টাকা জমা দেওয়ার সময়, কোথাও ওটিপি প্রয়োজন হলেও সেটি সংশ্লিষ্ট মোবাইলেই আসে। বিএলও কখনওই ভোটার লিস্টে নাম তোলার জন্য কোনও ওটিপি প্রদান করেন না। তাঁর কাজের ধরনে কোনও ওটিপি-র ব্যবহার নেই। তাই এই ধরনের ফোন এলেই তা কেটে দিন। কোনও লিঙ্ক বা ওটিপিতে ক্লিক করবেন না। 

ভুল হয়ে গেলে
এতকিছু জানার পরেও ভুল হতে পারে। সেক্ষেত্রে যদি দেখেন মিনিটে মিনিটে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা কাটছে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে নিজের ইন্টারনেট বা ওয়াই-ফাই কানেকশন অফ করুন। অনেকে মোবাইল বন্ধ করে দেন। জালিয়াতরা মোবাইল ক্লোন করে ফেললে ফোন সুইচ অফ করে কোনও লাভ নেই। আপনি ফোন বন্ধ করে দিলেও জালিয়াতরা ঠিকই টাকা কাটতে থাকবে। তাই, আগে ইন্টারনেট, ওয়াই-ফাই ডিসকানেক্ট করে দিন। এমনিতেও প্রয়োজন না থাকলে, শুধু শুধু ইন্টারনেট ওয়াই-ফাই চালিয়ে রাখবেন না। তাতে টাকা চুরির ঝুঁকি কমে।  

হয়রানি ১

বহুজাতিক সংস্থায় চাকরি করে সুদর্শনা। বেশ উঁচু পদ। সতর্ক মেয়ে। একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে ফোনটা পেল সুদর্শনা। এক তরুণীর ফোন। কী ভীষণ যে কাঁদছে! কান্নামাখা ভাঙা গলায় বলা কথা থেকে সারবত্তা যেটুকু উদ্ধার করা গেল, তাতে সুদর্শনা বুঝল বিপদটা বেশ গুরুতর। মেয়েটি সদ্য একটি সরকারি চাকরির পরীক্ষায় পাশ করেছে। কিন্তু তার জয়েনিং প্রসেস করতে একটি ওটিপি প্রয়োজন, যেটা ভুলবশত সুদর্শনার ফোনে চলে গিয়েছে। কিন্তু গেল কী করে? মেয়েটি জানায়, তার ও সুদর্শনার ফোন নম্বরে একটিমাত্র ডিজিটের সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। সুদর্শনার ফোন নম্বরের পরপর দু’টি সংখ্যা ৩৬, মেয়েটির সেখানে ৬৩। এটুকু ফারাকের জেরে সেই ওটিপি ঢুকে পড়েছে সুদর্শনার মোবাইলে। মেয়েটি এখন এই ওটিপি না পেলে জয়েনিং লেটারের সফট কপি পাবে না। ফলে চাকরি জয়েন করতে পারবে না। গরিবের মেয়ে, ওর একার ঘাড়েই সব দায়িত্ব তাই কেঁদে ফেলেছে ভয়ে! দপ্তরে ছোটাছুটি করে জানতে পেরেছে, দপ্তরের ভুলে মেয়েটির বদলে ওটিপি এসেছে সুদর্শনার ফোনে! মেয়েটিকে আশ্বস্ত করে নিজের এসএমএস খতিয়ে দেখল সুদর্শনা। সত্যিই সরকারি দপ্তরের একটি এসএমএস। তাতে একটি ওটিপি-ও আছে। দ্রুত মেয়েটিকে ওটিপি বলে চাকরি জয়েন করতে বলল সুদর্শনা। শুভেচ্ছাও জানাল। মেয়েটিও জানাল একদিন দেখা করে একসঙ্গে কফি খাইয়ে এই উপকারের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাবে। ফোনটা রাখার মিনিট খানেক পরেই পরপর এসএমএস সুদর্শনার ফোনে। স্যালারি অ্যাকাউন্টের প্রায় সব টাকা চার লপ্তে তুলে নেওয়া হয়েছে। সুদর্শনা বুঝল, বড্ড বাজে ঠকা ঠকে গিয়েছে।

হয়রানি ২

সদ্য এসআইআর ফর্ম জমা দিয়েছেন মিত্রবাবু। সেদিন বাজার থেকে ফিরে সবে আয়েশ করে বসে চায়ে চুমুক দিয়েছেন কি দেননি, অমনি ফোন। বিএলও ফোন করেছেন। মিত্রবাবুদের বাড়ির সকলের ফর্ম জমা পড়লেও কোনও এক প্রযুক্তিগত ত্রুটির জন্য মিত্রবাবুর স্ত্রীর ফর্মটি সাইটে ওঠেনি। ফলে নাম ভোটার লিস্ট থেকে বাদ যাবে। তবে সেটির জন্য আলাদা করে কিছু করতে হবে না তাঁদের। উদ্বিগ্ন হওয়ারও কিছু নেই। শুধু নাম, ঠিকানা, আধার নম্বর এসব আর একবার ফোনে মেলাতে হবে। সেসব পর্ব মিটলে মিত্রবাবুকে বলা হল, একটি ওটিপি গিয়েছে। এসএমএস দেখে ওটিপি দিতে গিয়েই সতর্ক হলেন মিত্রবাবু। বিএলও-ই যে ফোন করছে তার প্রমাণ কী? চেপে ধরে দু’-একটি জেরা করতেই ফোন কেটে গেল। মিত্রবাবু বুঝলেন, আরে! একটু হলেই প্রতারিত হতেন। খানিক পরে বিএলও-র সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, পুরোটাই ভুয়ো ফোন কল ও অলনাইন স্ক্যাম।

টাকা কাটার পর কী করবেন?
যদি কখনও আপনার ফোনের মাধ্যমে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা কাটে তাহলে, সঙ্গে সঙ্গে সাইবার সেলের টোল ফ্রি নম্বর ১৯৩০-তে যত দ্রুত সম্ভব অভিযোগ জানাতে হবে। এই কাজটিই সকলের আগে করতে হবে। আগে এনসিআরবি-র সাইটে অভিযোগ করতে বলা হতো। বর্তমানে এই টোল ফ্রি নম্বরে অভিযোগ জানানোয় বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। তারপর অভিযোগ ব্যাঙ্কের টোল ফ্রি নম্বরে করতে হবে। এরপর ব্যবহৃত ডেবিট কার্ড বাতিল করার জন্য ব্যাঙ্কে আবেদন করতে হবে। অ্যাকাউন্টে কোনও টাকা পড়ে থাকলে সেটা দ্রুত অন্য কোনও অ্যাকাউন্টে সরিয়ে সেই অ্যাকাউন্টটি লক করে দিতে হবে। কারণ আপনি ওটিপি দিয়ে দেওয়ার কারণে, অ্যাকাউন্ট ও ডেবিট কার্ডে থাকা যাবতীয় তথ্য অপরাধীদের কাছে চলে গিয়েছে। 

এরপর স্থানীয় থানায় আপনাকে একটি এফআইআর করতে হবে। অফিসার একটি ফর্ম দেবেন। সেটি ফিল আপ করে জমা দিন। তাঁরা এই অভিযোগ আপনার এলাকার সাইবার ক্রাইম দপ্তরে পাঠিয়ে দেবে। চাইলে সাইবার দপ্তরে সরাসরিও অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। আজকাল, প্রায় সব কমিশনারেট এলাকাতেই ‘সাইবার ক্রাইম সেল’ থাকে। কলকাতার বাসিন্দা হলে, লালবাজারে সাইবার থানায় অভিযোগ জানাতে পারেন। অন্য জেলার বাসিন্দা হলে, ভবানী ভবনের নিজস্ব কমিশনারেটের অধীনে থাকা সাইবার ক্রাইম সেল বা ভবানী ভবন-এর ‘সাইবার ক্রাইম সেল’-এ অভিযোগ জানিয়ে রাখুন।

যেই মুহূর্তে টোল ফ্রি নম্বরে ফোন করলেন, সঙ্গে সঙ্গেই আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে অবৈধভাবে নিয়ে নেওয়া টাকা আটকানোর চেষ্টা করে সাইবার দপ্তর। টাকা আটকানো যাবে কি না, তা নির্ভর করে অপরাধীদের চুরি-পরবর্তী কার্যকলাপের উপর।

মনীষা মুখোপাধ্যায় 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ