সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: অজয়, দামোদর নদের বালি রমরমিয়ে পাচার চলছে। তারপরও দুর্গাপুর শহরে এক ট্রাক্টর বালি(১০০ঘনমিটার) পাঁচ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে। ডাম্পারে করে বালি নিতে গেলে দাম পড়ছে টন প্রতি ১৩০০- ১৫০০ টাকা। জমির বিপুল দাম ছিলই, তারসঙ্গে বালিও নাগালের বাইরে যাওয়ায় শিল্পাঞ্চলে নিম্ন মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত অনেক মানুষের পাকা বাড়ি তৈরির স্বপ্ন কার্যত অধরাই থেকে যাচ্ছে। শুধু আসানসোল বা দুর্গাপুর নয়, নদী তীরবর্তী গ্রামগুলিতেও বালির দাম আগুন। যা নিয়ে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীরা।
জামুড়িয়া থানার চিচুড়িয়া হয়ে একটি রাস্তা গিয়েছে পাণ্ডবেশ্বরের শ্যামলা ছোড়া অভিমুখে। ওই এলাকাকে করিডর বলা যায়। অজয় নদের বিভিন্ন জায়গা থেকে বালি তোলা হয়। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতেই রাস্তার পাশে বালির ‘স্টক পয়েন্ট’ দেখা যায়। বালির বস্তা বোঝাই করছিলেন কয়েকজন। দাম জিজ্ঞাসা করতেই উত্তর এল, বস্তা প্রতি বালির দাম ৪০টাকা। নদীর কাছে প্রত্যন্ত এলাকায় এক বস্তা বালির দাম ৪০টাকা! জামুড়িয়া থানার দরবারডাঙা গেলে চোখ কপালে উঠবে। এত বিপুল বালি করবার চলছে এখানে। তার অদূরেই গ্রাম বাগডিহা। বালি নিয়ে কিছু জানতে চাইলেই শর্ত দেওয়া হচ্ছে, নাম প্রকাশ করা যাবে না। গ্রামের যুবকদের দাবি, প্রতি মুহূর্তে নদী থেকে বড় বড় মেশিনে করে বালি তোলা হচ্ছে। পিঁপড়ের সারির মতো দৈত্যাকার বালিবোঝাই গাড়িগুলি যাতায়াত করছে। অথচ আমরা বালি কিনতে গেলে হাতে ছ্যাঁকা লাগছে। নদীর তীরে আমাদের বাড়ি। তাও বালি কিনতে দাম পড়ছে ট্রলি পিছু দু’হাজার টাকা। একই অবস্থা চুরুলিয়াতেও। সেখানে এক ট্রাক্টর বালির দাম পড়ছে আড়াই হাজার টাকা। বালির দাম বাড়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বাংলার বাড়ি দিচ্ছেন। সেই বাড়ি নির্মাণ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। চুরুলিয়া পঞ্চায়েতের প্রধান প্রদীপ মুখোপাধ্যায় বলেন, গরিব মানুষ কী করে ৪০টাকা বস্তা দরে বালি কিনবে? এতে ক্ষুব্ধ মানুষ।
কেন এমন দাম? খোঁজ নিতেই উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ই-টেন্ডারের মাধ্যমে বালি ব্লকের বরাত নিয়ে বড় ব্যবসায়ীরা পুরো নদীকেই নিজের জমিদারি ভাবছে। তারা নিয়ম ভেঙে বালি লুট করলেও অন্য কেউ এক ট্রাক্টর বালি তুলতে গেলে প্রশাসনের নজরে আনছে। এরজেরে ট্রাক্টরে বালি কারবারিও সিন্ডিকেটে শামিল হয়েছে। ‘সিস্টেম’কে ম্যানেজ করতে গিয়ে ট্রাক্টর পিছু মোটা টাকা দিতে হচ্ছে। যারফলে বালির দাম বাড়ছে।
দুর্গাপুর শহরে বালির দাম আরও বেশি। জানা গিয়েছে, দুর্গাপুর শহরে ট্রাক্টরে করে বালি ঢোকে মূলত পাণ্ডবেশ্বর বিধানসভা এলাকা থেকে। ট্রাক্টর ফরিদপুর থানা এলাকায় অবাধে যাতায়াত করার জন্য প্রতি মাসে ট্রাক্টর পিছু এক হাজার টাকা ‘নজরানা’ দিতে হয়। দুর্গাপুর থানার অধীনে পাঁচটি পুলিশ ফাঁড়ি এলাকা রয়েছে। থানা এলাকায় অবাধে বালির কারবার করতে গেলে সেখানে ট্রাক্টর প্রতি মাসে দিতে হয় ছ’হাজার টাকা। ওভারলোডিং বা অন্য কোনও সমস্যা হলে বাড়তি টাকা লাগে।
আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের ডিসি ধ্রুব দাস বলেন, ধারাবাহিক অভিযান চালানো হয়। বৈধ চালান ছাড়া বালি তোলা হলে মামলা রুজু করা হয়। (চলবে)