সৌগত গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতা: মালদার তনিমা কর দশম শ্রেণির ছাত্রী। নিজের পায়ে দাঁড়ানোই তার জীবনের লক্ষ্য। হঠাত্ একদিন পাড়াতুতো এক কাকিমা বাড়িতে এলেন তনিমার বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে। ছেলে রেলের চাকুরে। পাত্র ভালো। মেয়ের বাবা এককথায় বিয়ের জন্য রাজি। ফলে তনিমার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ভেঙে চুরমার। তবে পরিবারের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি সে। চাপে ভেঙে পড়েনি। উল্টে মনে সাহস এনে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। বাবাকে বলে, ‘১৮ বছরের আগে বিয়ে করা আইনত অপরাধ। তাছাড়া আমি স্বাবলম্বী হতে চাই। তাতে তোমারই নাম উজ্জ্বল হবে। সংসার চালাতে তোমায় সাহায্যও করতে পারব।’ মেয়ের যুক্তি মেনে নেন বাবা। মত পরিবর্তন করেন।
মালদার একটি স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী একজন মৌলানার কাছে পড়তে যেত। সেখানে জুটত শুধুই হেনস্তা। প্রতিবাদ জানাতে মৌলানার বাড়ি গিয়ে তাঁর স্ত্রীকে সমস্ত কিছু জানায় সে। তারপর একপ্রকার বাধ্য হয়ে গ্রাম ছাড়তে হয় ওই মৌলানাকে।
সমাজের অনুচিত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস এই দুই কিশোরী পেল কীভাবে? তনিমা বা অষ্টম শ্রেণির ওই ছাত্রীটির সাহসিকতার রহস্য কী? উত্তর হল, ভালো খেলে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছাই এই বাচ্চা মেয়েদু’টি সহ অনেককে সাহসী হতে দৃঢ়তা জুগিয়েছে। সম্প্রতি গ্রামের মেয়েদের স্বনির্ভর করতে খেলোধুলোকে অস্ত্র করেছে প্রাজক ও টেরে ডেস হোমস নামে দুই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। কবাডির মাধ্যমে মেয়েদের উজ্জীবিত করছে তারা। বৃহস্পতিবার শহরে ‘এমপাওয়ারপ্লে: বিল্ডিং সেফার ফিউচার ফর গার্লস থ্রু স্পোর্টস’ নামক এক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ শিশু অধিকার সুরক্ষা আয়োগের চেয়ারপার্সন তুলিকা দাস, স্কুল এডুকেশনের ডেপুটি ডিরেক্টর গৌরাঙ্গ মণ্ডল, প্রাজকের ডিরেক্টর দীপ পুরকায়স্থ প্রমুখ। এই অনুষ্ঠানে কবাডি চ্যাম্পিয়ন তনিমা কর (মালদা), অদিতি হালদার (মুর্শিদাবাদ), কোয়েল দাস (মুর্শিদাবাদ), পিয়ালি বর্মণ (শিলিগুড়ি), সুখমণি বর্মণকে (শিলিগুড়ি) পুরস্কৃত করা হয়।
অদিতি-কোয়েলরা বলেন, ‘কবাডি খেলার শুরুর দিকে অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। তা পেরতে হয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম সমস্যা ছিল ছোট আকারের জামাকাপড় পরে খেলা। প্রতিবেশীরা সমালোচনা করতেন। ফলে খেলতে যেতে দিতে চাইতেন না অভিভাবকরা।’ বহরমপুরের অদিতি হালদারের কথায়, ‘ছোট জামাকাপড় পরে কবাডি খেলায় একটা সময় আমাদের বডি শেম করতেন অনেকে। এখন আমাদের উন্নতি হওয়ায় তাঁরাই উল্টে প্রশংসা করছেন।’ বহরমপুরের কোয়েল দাস এই ছোট বয়সেই অনেক লড়াই করে ফেলেছে। কথা বলতে বলতে সে কেঁদেই ফেলল। সে বলে, ‘আমার মা পরিচারিকার কাজ করতেন। কিন্তু পুজোর আগে বোনাস দিতে হবে বলে ফি বছরই তাঁকে কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিতেন মালিক। মা আমাদের জামাকাপড় কিনে দিতে পারবেন না বলে কাঁদতেন। তাই মাকে কাজে যেতে বারণ করি। এরপর আমরা একটি খাবারের দোকান খুলি। এখন সংসার দিব্যি চলছে।’ রবীন্দ্রনাথ লিখে গিয়েছিলেন, ‘সঙ্কোচের বিহ্বলতা নিজেরে অপমান...’ সে লাইনগুলি মনে গেঁথে নিয়ে জীবনের লড়াই চালিয়ে চলেছে তনিমা, পারভিন, কোয়েলরা। এখন পিছনে টানতে সমাজকে অনেক অনেক পিছনে ফেলে দিয়ে এগিয়ে চলেছে তারা। খেলার জন্য পা দু’টো আরও শক্ত করে তৈরি করতে হবে। তবেই জিততে পারবে কবাডিতে। তবেই শক্ত হয়ে দাঁড়াতে পারবে নিজের পায়ে।