নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: সকাল সাড়ে ১০টাতেই ফোন এসেছিল হুগলিতে রিষড়ার সাউ বাড়িতে। প্রথমে নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারেননি রজনী। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করেন বিএসএফ কর্তাদের। ফোন রেখেই চিৎকার করেন, ‘বাবুজি, মা’জি, ও লট আয়ে হ্যায়!’
নিজস্ব প্রতিনিধি, চুঁচুড়া: সকাল সাড়ে ১০টাতেই ফোন এসেছিল হুগলিতে রিষড়ার সাউ বাড়িতে। প্রথমে নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারেননি রজনী। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞাসা করেন বিএসএফ কর্তাদের। ফোন রেখেই চিৎকার করেন, ‘বাবুজি, মা’জি, ও লট আয়ে হ্যায়!’
সকাল সাড়ে ১০টাতেই উল্লাসের আবহে ঢুকে পড়ে বিএসএফ জওয়ান পূর্ণম সাউয়ের রিষড়ার বাড়ি। তারপরে লাগাতার বেজে গিয়েছে ফোন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে বিএসএফের শীর্ষকর্তাদের ফোন এসেছে। এসেছেন প্রতিবেশীরা। দুপুরের পরে মিষ্টিমুখ আর মিষ্টি বিলির ঢল নেমেছিল। কখনও কাঁদছিলেন, কখনও হাসছিলেন পূর্ণমের স্ত্রী রজনী সাউ। সবাইকে সুসংবাদ দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন বৃদ্ধ ভোলানাথ সাউ। ২৩ দিন বিদেশি রাষ্ট্রে বন্দি ছেলের মুক্তির আনন্দ প্রকাশ করতে গিয়ে বারবার কথার খেই হারিয়ে ফেলছিলেন ভোলানাথ।
প্রসঙ্গত, ২৩ এপ্রিল পাঠানকোটের ফিরোজপুর সেক্টর থেকে সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগে পূর্ণম সাউকে পাকিস্তানি সেনা বন্দি করেছিল। তারপর থেকে হুগলির রিষড়ার সাউ ভিলায় ছড়িয়ে পড়েছিল আতঙ্ক।
বুধবার দুপুর ১২টায় ফিরোজপুরের ক্যাম্প থেকে স্ত্রীকে ভিডিও কল করেছিলেন পূর্ণম। স্বামীকে দেখে কেঁদে ফেলেন স্ত্রী। অঝোরে কাঁদছিলেন পূর্ণমও। রজনী বলেন, ‘উনি বললেন, ভালো আছি, চিন্তা করো না। দ্রুত রিষড়ায় ফিরব। আর জানতে চাইলেন, ছেলে কেমন আছে? আমি রাস্তায় ছিলাম। তাই বিশেষ কথা হয়নি। ২৩ দিন পরে ওঁকে সুস্থ অবস্থায় দেখতে পেয়েছি, সেটাই আমার কাছে বিরাট বড় পাওয়া।’
এদিন মুখ থেকে হাসি সরছিল না রজনীদেবীর। অন্তঃসত্ত্বা অবস্থাতেই তাঁর জীবনে বিরাট বিপর্যয় নেমে এসেছিল। এদিন তিনি বারবার ধন্যবাদ দিয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী আর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে। রজনী বলেন, ‘দিদির (মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। উনিই প্রথম ভরসা দিয়েছিলেন। এদিনও ফোন করেছিলেন। বললেন, আমাদের দেশের গর্ব আমার ভাই ফিরে এসেছে। এভাবে কেউ কখনও আমার সঙ্গে কথা বলেনি। মুখ্যমন্ত্রী কথা দিয়েছিলেন, সাতদিনের মধ্যেই আমার স্বামী ফিরবে। তাই হয়েছে। মঙ্গলবারও আমি দিল্লি যাব বলে ওঁর কাছে আবেদন করেছিলাম। তখনও উনি বলেছিলেন, যেতে হবে না। আমরা দ্রুত তোমার স্বামীকে ফেরাব। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছেও কৃতজ্ঞ। তিনি আমার সিঁদুর ফিরিয়ে দিয়েছেন।’
পূর্ণমের আট বছরের ছেলে তখন বারবার মায়ের কাছে জানতে চাইছে, কখন বাবার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হবে। সাউ ভিলা ততক্ষণে লোকারণ্য। তারই মধ্যে চলছে মিষ্টিমুখ। বৃদ্ধ ভোলানাথ বলেন, ‘আজ একটু শান্তিতে ঘুম হবে। বুকটা বড় হাহাকার করছিল।’ পাশে বসে ভরসা জোগাচ্ছিলেন রিষড়া পুরসভার চেয়ারম্যান বিজয় মিশ্র। প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে সাউ ভিলাতেই দিনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে তাঁর। তিনি বলেন, ‘আমাদের মুখ্যমন্ত্রী যখন আশ্বাস দিয়েছিলেন তখনই মন বলেছিল, পূর্ণম দ্রুত ফিরবেন।’
পরিবার এবং বিএসএফ সূত্রে জানা গিয়েছে, এদিন ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে পূর্ণমকে হস্তান্তর করে পাকিস্তানের সীমান্তরক্ষী বাহিনী। তারপরেই তাঁর মেডিক্যাল চেকআপ করা হয়। দ্রুত তাঁকে পৌঁছে দেওয়া হয় পাঠানকোটের ফিরোজপুর সেক্টরে। একমুখ দাঁড়ি নিয়ে এদিন সেলুন থেকে সহকর্মীর ফোন নিয়ে স্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। সেই একটা ফোনই রিষড়ার একটি বাড়িতে উৎসবের আবহ এনে দেয়। অথচ কিছুক্ষণ আগে পর্যন্তও বাড়িটি দাঁড়িয়ে ছিল বিষণ্ণতার সীমান্তে!