Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ধর্ম ও শ্রীরামকৃষ্ণ

ধর্ম শব্দটি এত ব্যাপক যে কোনো সংকীর্ণরূপে বা সংক্ষেপে শব্দটির সম্পূর্ণ তাৎপর্য আমরা অনুভব করতে পারি না। ধর্ম এক এক জনের কাছে এক এক অর্থে প্রতীত হয়।

ধর্ম ও শ্রীরামকৃষ্ণ
  • ১৮ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ধর্ম শব্দটি এত ব্যাপক যে কোনো সংকীর্ণরূপে বা সংক্ষেপে শব্দটির সম্পূর্ণ তাৎপর্য আমরা অনুভব করতে পারি না। ধর্ম এক এক জনের কাছে এক এক অর্থে প্রতীত হয়। জড়বাদীরা তাঁদের তত্ত্বালোচনায় ধর্ম শব্দটি ব্যবহার করেন। অগ্নির ধর্ম দহন, বায়ুর ধর্ম শোষণ প্রভৃতি। এই ক্রিয়াগুলিকেও ধর্ম বলা হয়। ধর্ম মানে বস্তুর যে গুণ থাকলে বস্তুটি অন্য সব পদার্থ থেকে ভিন্নভাবে নিজস্ব বস্তুত্ব বিশিষ্ট হয়, আর যে গুণ না থাকলে বস্তুটির অস্তিত্বের লোপ হয়। সেই জন্য জড়বাদী বলে ‘ধর্ম’। যাঁরা চৈতন্যবাদী, ঈশ্বরে বিশ্বাসী তাঁরা ধর্ম শব্দটি তাঁদের নিজেদের অর্থে ব্যবহার করেন। সংস্কৃত ভাষায় ধর্ম শব্দটির অর্থ যা ধরে রাখে, অর্থাৎ যা আমাদের অস্তিত্বকে বিলুপ্ত হতে দেয় না। এটি খুব ব্যাপক অর্থ। সর্বত্র শব্দটির এই অর্থে প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। ধর্মের রূঢ় অর্থাৎ প্রচলিত অর্থ বিভিন্ন।

Advertisement

ধর্ম বলতে আমরা বুঝি জড়ের অতীত কোন বস্তু। দেহের অন্তে আমাদের অস্তিত্ব থাকে কোনো এক প্রকারে। সেই অস্তিত্বকে আমরা যদি বিশ্বাস না করি তাহলে আমাদের ধর্মের প্রয়োজন হয় না। কেন না, দেহের লয়ের সঙ্গে সঙ্গে যদি সব বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে আমাদের সততা-অসততা, ন্যায়-অন্যায় বোধ সব ভিন্ন অর্থে ব্যবহার হবে। যে অর্থে আমরা শব্দগুলিকে প্রয়োগ করি তা করা যাবে না। পাপপুণ্যবোধ তো দূরের কথা, সৎ-অসৎ বুদ্ধিও বিভ্রান্ত হয়ে যাবে যদি এই দেহটিকেই আমরা সর্বস্ব বলে মনে করি। জগতে এরকম লোক বিরল নন, যাঁরা এই দেহকে সর্বস্ব বলে মনে করেন। এঁরা যে শুধু সাধারণ বা অবিবেচক, তা নন, এঁদের ভিতরে দার্শনিকও আছেন। এঁদের দর্শনকে জড়বাদী দর্শন বলা হয়। আমরা ধর্মকে দুটি অর্থেই দেখতে পাই। আমাদের যে একটি লোকোত্তর সত্তা আছে, তার উল্লেখ সকল ধর্মমতে পাওয়া যায়। মৃত্যুর পরই আমাদের সব অস্তিত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রাচীনকালে এদেশে জড়বাদী দার্শনিক ছিলেন চার্বাক। 
চার্বাক সম্প্রদায়ের মতে শরীরটা যখন পুড়ে ছাই হয়ে যাবে আর ফিরে আসবে না, তখন শরীর সম্বন্ধে অত চিন্তা করার দরকার কি? শরীরকে আরামে রাখো, তার পুষ্টির জন্য যা প্রয়োজন কর। এই দর্শনেরই ব্যাপক রূপ দেবার জন্য বলা হয়েছে, শুধু তোমার নিজের শরীরকে যত্ন করলেই হবে না, তোমার আশে-পাশে যারা আছে তাদের সঙ্গে সমতলে চলতে হবে। অপরের দিকে দৃষ্টি না দিলে পরস্পরের বিরোধ বাড়বে, পরিণামে অশান্তি আসবে। ফলে তোমার শরীরটাও ভালভাবে রক্ষা করতে পারবে না। 
জড়বাদীর ভেতরে এই দার্শনিক বিচার আসে এবং এই দৃষ্টিতে দেখে তাঁরা সদসৎ বিচার করেন। সৎ বলতে স্থায়ী অর্থে নয়, জড়বাদীর মতে সৎ অর্থাৎ তোমার ব্যক্তিগত জীবনে অথবা সমষ্টিগত জীবনের পক্ষে ভোগ সংগ্রহের বা ভোগ রক্ষণের পক্ষে যেগুলি উপযোগী সেইগুলি ভাল, এর বিপরীত যা, তা অসৎ অর্থাৎ মন্দ— এই ভালমন্দের দৃষ্টি সেখানে।
স্বামী ভূতেশানন্দজীর ‘শ্রীরামকৃষ্ণ ও যুগধর্ম’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ