নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: রাজ্যে মাতৃমৃত্যুর হার নিয়ে উদ্বেগের শেষ নেই স্বাস্থ্যকর্তাদের। বৈঠকের পর বৈঠক হয়েছে। তলবের পর তলব। হয়েছে অনেক শো-কজও। এই অবস্থায় রাজ্যের অন্যতম বড়ো ও এশিয়ার প্রাচীনতম, কলকাতা মেডিকেল কলেজের পরিসংখ্যান থেকে উঠে এল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। জানা গিয়েছে, দুশ্চিন্তার মাতৃমৃত্যুর হার (মেটারনাল মরটালিটি রেট বা এমএমআর)-এর প্রধান কারণই হল রেফার। বিশেষত দেরিতে, অবস্থা খুব খারাপ হওয়ার পর রেফার।
স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রের খবর, ২০২৫-এ কলকাতা মেডিকেল কলেজে জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাস সাড়ে ৯ হাজারের বেশি প্রসব হয়েছে। তার মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৪৫ জন প্রসূতির। ডিসেম্বর মাসে মারা গিয়েছেন আরও ১ জন প্রসূতি। উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, এই ৪৫ জনের মধ্যে ২৭ জনই ‘রেফার্ড কেস’। ২১ জনকে অন্যান্য সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ থেকে কলকাতা মেডিকেল কলেজে পাঠানো হয়েছে। ৬ জন বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল থেকে ‘রেফার্ড’ হয়ে এসেছেন। তার মধ্যে আবার ২ জন প্রসূতির ক্ষেত্রে ছোটোখাটো নার্সিংহোমে গর্ভপাত করানোর পর বিপদ ঘনিয়েছে। মরণাপন্ন অবস্থায় পাঠানো হয় মেডিকেলে। প্রসবের আগেই বা অ্যান্টিনেটাল পর্যায়ে মারা গিয়েছেন এক প্রসূতি। তাঁকেও প্রাইভেট থেকে রেফার করা হয়েছিল। মেডিকেল কলেজে চিকিৎসা হওয়া প্রসূতিদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের।
এছাড়াও আরও অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে মেডিকেলের ‘মেটারনেল ডেথ রিলেটেড ডেটা ফর্ম’-এ। দেখা যাচ্ছে, মারা যাওয়া ৪৫ জন মায়ের মধ্যে ২৭ জনের সিজার হয়েছিল। প্রায় অর্ধেক, ১৪ জনের হয়েছিল সাধারণ প্রসব বা নর্মাল ডেলিভারি। সেপটিসেমিয়া বা রক্তের ভয়াবহ সংক্রমণে (কিছু ক্ষেত্রে তা থেকে হওয়া ভয়াবহ কোয়াগুলোপ্যাথি বা রক্ত জমাট না বাঁধা) মারা গিয়েছেন সবচেয়ে বেশি সংখ্যক—১৪ জন। প্রসূতিদের ক্ষেত্রে আর এক মারাত্মক বিপদ হল ‘প্রেগনেন্সি ইনডিউজড হাইপারটেনশন’ বা পিপিএইচ। (প্রসবের আগে বা পরে রক্তক্ষরণ) সেই সমস্যায় মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের।
কেন এত মায়ের মৃত্যু হচ্ছে? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক জানালেন, কারণ হল রেফার। আশঙ্কাজনক প্রসূতির প্রাণ বাঁচানোর জন্য রেফার করা যেতেই পারে। ছোটো বা মাঝারি হাসপাতাল থেকে বড়ো ও শীর্ষস্তরের টার্শিয়ারি হাসপাতালে রেফার হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সিংহভাগ ক্ষেত্রে হয় যুক্তিহীন রেফার হচ্ছে, নয়তো দেরিতে রেফার হচ্ছে। যদিও চিকিৎসকদের একাংশ মানতে চাইছে না যে সপ্তাহের বেশ কয়েকদিন সন্ধ্যায় ন্যূনতম সহকারী অধ্যাপক পদমর্যাদারও কেউ থাকেন না। তাঁদের যুক্তি হল, মেডিকেলের স্ত্রীরোগ বিভাগে থাকার কথা ৮ জন সহকারী অধ্যাপকের। আছেন ২ জন! সহযোগী অধ্যাপক থাকার কথা ৭ জনের। আছেন ৪ জন। অধ্যাপক থাকার কথা ৬ জনের। আছেন বিভাগীয় প্রধান সহ ৪ জন। এছাড়া ২ জন আরএমও এবং কয়েকজন সিনিয়র রেসিডেন্ট আছেন। রাতে যেদিন সহকারী অধ্যাপকরা থাকেন না, লোকবলের অভাবে সেই দিনগুলিতে ডিউটি দেওয়া হয় আরএমওদের।