পালস অক্সিমিটার
  • ৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হাসপাতালে জটিল রোগীর অক্সিজেন মাপার জন্য একটা বড় মেশিন ব্যবহৃত হয়। সেখানে অক্সিজেন লেভেল দেখে চিকিৎসকরা ব্যবস্থা নেন। সেই মেশিনের ছোট ভার্সন পালস অক্সিমিটার। আঙুলের ডগায় লাগাতে হয় যন্ত্রটি। তাহলেই শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা বলে দেয় সহজে। নাম পালস অক্সিমিটার। করোনাকালে এই যন্ত্রটিকে দেখা যেত প্রতিটি ঘরে ঘরে। 

Advertisement

এক সময় রোগীর শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা জানার একমাত্র উপায় ছিল রক্ত সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করা। প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ। রোগীর জন্যও ঝুঁকির। তখন বিজ্ঞানীরা এমন একটি যন্ত্রের কথা চিন্তা করতে শুরু করলেন, যেটি তৎক্ষণাৎ বলে দিতে পারে অক্সিজেনের মাত্রা। ১৮৭৬ সালে জার্মান বিজ্ঞানী কার্ল ভন ভয়ট লক্ষ করেন রক্তের রং ও অক্সিজেনের পরিমাণের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। প্রমাণ সহ দেখালেন, অক্সিজেনযুক্ত রক্ত উজ্জ্বল লাল। আর অক্সিজেনহীন রক্ত অপেক্ষাকৃত কম উজ্জ্বল। 
এরপর ১৯৩০-এর দশকে ভয়টের তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী গ্লেন মিলিকান ‘ইয়ার অক্সিমিটার’ নামের একটি যন্ত্র তৈরি করেন। কানের লতিতে লাগিয়ে রক্তের অক্সিজেন মাপা যেত সেটির সাহায্যে। তবে এই যন্ত্রটি আকারে বেশ বড় ছিল। ব্যবহার করার পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত জটিল আর ফলাফল নির্ভুল নয়। ফলে সেই যন্ত্র জনপ্রিয়তা পায়নি। 
পালস অক্সিমিটারের ভিত্তি গড়ে উঠেছিল আলো শোষণের বৈজ্ঞানিক নীতির উপর। অক্সিজেনযুক্ত হিমোগ্লোবিন লাল আলো বেশি শোষণ করে না। কিন্তু ইনফ্রারেড আলো তুলনামূলক বেশি শোষণ করে। অন্যদিকে, অক্সিজেনবিহীন হিমোগ্লোবিন লাল আলো বেশি শোষণ করে। এই পার্থক্য বিশ্লেষণ করেই রক্তে অক্সিজেনের শতাংশ নির্ণয় সম্ভব হয়। এই নীতিই কাজে লাগালেন জাপানি বিজ্ঞানী তাকুও আওয়াগি। মানুষের শরীরে আলো ফেললে চামড়া, হাড়, মাংস সবই আলো শোষণ করে। তাই ঠিক কতটা আলো রক্ত শোষণ করছে, তা বের করাই হয়ে উঠল প্রধান চ্যালেঞ্জ। এই সময়ই আওয়াগি একটি সাধারণ জিনিসের উপর নজর দেন। পালস বা স্পন্দন। তিনি দেখেন, যখন হৃৎস্পন্দন হচ্ছে তখন ধমনীর ভিতর দিয়ে প্রবাহিত রক্তের পরিমাণ বাড়ছে আবার কমছে। এই ওঠানামার ফলে আলো শোষণের ছন্দও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু চামড়া, হাড় বা মাংসের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ স্থির। এই বিষয়টি দেখেই আওয়াগি সিদ্ধান্ত নেন, কেবল পরিবর্তিত অংশের হিসেবই তিনি গ্রহণ করবেন। এরপর কাজে লাগালেন দু’ধরনের আলো। এক লাল রঙের, আরেকটি ইনফ্রারেড। এই দুই আলো শোষণের পার্থক্য তুলনা করে তিনি হিসেব করলেন রক্তে কত শতাংশ অক্সিজেন রয়েছে। তাঁর এই আবিষ্কারই আধুনিক অক্সিমিটার তৈরির পথ প্রশস্ত করে। ধীরে ধীরে যন্ত্রটির আকার ছোট হয়, আরও নির্ভুল হয়। ব্যবহার করাও হয়ে ওঠে সহজ। করোনাকালে যাঁদের উপসর্গ ছাড়াই আচমকা অক্সিজেনের মাত্রা কমছিল (সাইলেন্ট হাইপক্সিয়া), তাঁদের জন্য পালস অক্সিমিটার হয়ে উঠেছিল ত্রাতা।
লিখেছেন শান্তনু দত্ত