শ্যামশ্রী বিশ্বাস সেনগুপ্ত: পুজো আসে। পুজোর গন্ধ আসে না। পুজো এখন বড্ড কর্পোরেট। এআই শিউলি, জেমিনাইয়ের কাশফুল আর শপিং মলে রেকর্ডেড ঢাকের বাজনায় পুজো আসে। চলেও যায়। অতৃপ্ত বাসনা নিয়ে পড়ে থাকে শরৎ। অথচ একসময় পুজোর প্যান্ডেল মাতিয়ে রাখত ‘এইচএমভি’ সহ বিভিন্ন গ্রামোফোন কোম্পানি। পুজোর সুমন, অঞ্জন, নচিকেতারা কী গান গাইবেন, বিকেলের আড্ডায় তা নিয়ে চলত জোর আলোচনা। ‘...রেললাইনে বডি দেব, মাথা দেব না/ আমার বউ বলেছে মরতে আমায় জীবন রাখতে পারব না’—এই গান নন স্টপ তিনদিন ধরে চলেছিল চেনা মণ্ডপে। বন্ধ করলেই জরিমানা! এখন হিন্দি বা হিন্দিলালিত-পালিত বাংলা গানেরই পাল্লা ভারী। তবে বছরদু’য়েক আগে পুজোর গানের একটা মিউজিক ভিডিও দেখে বেশ লেগেছিল। নায়ক-গায়ক কম্বো। ‘চল প্যান্ডেলে রাতভর জেগে আড্ডাটা হবে চল।/ আবার কবে দেখা হবে সেই ভেবে ভেবে মুখে হাসি চোখে জল’।
পুজোর গান এখন নস্টালজিয়া। সেই স্মৃতি এখন টিকে আছে পুরনো দিনের মানুষের স্মৃতি, সংবাদপত্র আর বইয়ের পাতায়। জেন-ওয়াইদের কাছে পুজোর হাজারও উপকরণ। পুজোর নতুন গান নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলাদা কোনও উন্মাদনা নেই। কিন্তু একসময় চারদিনের এই উৎসবকে সামনে রেখেই পুজোর গানের প্রস্তুতি চলত বছরভর। গান লেখা, সুর দেওয়া, নতুন গান নিয়ে গবেষণা কত কিছু! রেকর্ড কোম্পানির কর্তাব্যক্তিরা পুজোর বহুদিন আগে থেকেই শিল্পীদের সঙ্গে পরিকল্পনায় বসতেন। শুধু ব্যবসা নয়, শ্রোতার মনে নান্দনিক আনন্দ দেওয়াও ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য।
ইতিহাস বলছে, ১৯১৪ সালে পুজোর গানের রেকর্ডিং শুরু করে দ্য গ্রামোফোন কোম্পানি। তাদেরই তত্ত্বাবধানে সে বছর দু’টি রবীন্দ্র সংগীতের রেকর্ডিং হয়। গেয়েছিলেন অমলা দাশ। অমলা ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের বোন। ধীরে ধীরে ঢাকের শব্দ ও পুজোবার্ষিকীর সঙ্গে বঙ্গ জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠল পুজোর বাংলা গান। শুরুতে পুজোর গান ছিল শুধুই মাতৃবন্দনা ও আগমনি। পরে পুজোর গানে সেই ধারা আস্তে আস্তে পালটে যায়। রবীন্দ্রনাথ পূজা পর্যায়ের গান লিখলেও বাঙালির পুজোর গান কিন্তু ভিন্ন ধরনের। এই গান মন মাতিয়ে স্মৃতির স্মরণীতে বয়ে যাওয়া মুক্তধারা। নতুন জামা, নতুন জুতো, নতুন পুজো সংখ্যার সঙ্গে বাঙালি জীবনে একসময় অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
১৯৫২ সালে দ্য গ্রামোফোন কোম্পানি ও কলম্বিয়া এক হয়ে তৈরি হয় সংগীত সৃষ্টির স্মরণীয় প্রতিষ্ঠান ‘হিজ মাস্টার্স ভয়েস’। সকলের কাছে যা ‘এইচএমভি’ নামে পরিচিত। পুজোর গানের পাশাপাশি গানের তালিকা সম্বলিত বইও প্রকাশ করত তারা। সেই সুবাদে ‘পূজার গান’, ‘পূজার ডালি’, ‘শারদ অর্ঘ্য’র মতো বই আজও বিখ্যাত। গান যখন রেকর্ড ছেড়ে ক্যাসেটবন্দি হল, তখন থেকেই বন্ধ হয়ে যায় শারদ অর্ঘ্যের প্রকাশনা।
পুজোর গানের জনপ্রিয়তা এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছয় আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে সম্প্রচারিত ‘অনুরোধের আসর’-এর সুবাদে। আকাশবাণীর ‘গল্পদাদুর আসর’ ও ‘সংগীত শিক্ষার আসর’-এর পাশাপাশি ‘অনুরোধের আসর’ শুরু হয়েছিল ১৯৪০ সালে। তারই রেশ ধরে পুজো উপলক্ষ্যে আধুনিক বাংলা গানের বেসিক রেকর্ড প্রকাশ করতে থাকে ‘এইচএমভি’। সেই সময়ে পুজো মানেই নতুন বাংলা গান। পাশাপাশি কাগজে দেওয়া ‘এইচএমভি’ -এর বিজ্ঞাপন ‘শারদ অর্ঘ্য’ রীতিমতো শিহরন জাগাত।
আকাশবাণীর অনুরোধের আসরে পরিবেশিত পুজোর গানের স্বর্ণযুগ হিসেবে ধরা যেতে পারে চারের দশক থেকে আটের দশকের সময়কে। এই পর্বে অনেক গানই হয়তো পুজো উপলক্ষ্যে প্রকাশিত হয়নি, কিন্তু সেগুলিও ‘পুজোর গান’-এর সঙ্গেই জুড়ে গিয়েছে। শুরুর সময়ে বাঙালির হৃদয়ে সুরে সুরে মায়াজাল ছড়িয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য ও জগন্ময় মিত্র। তবে হারিয়ে যাওয়া পুজোর বাংলা গানের শিল্পীদের তালিকাটাও বেশ দীর্ঘ। শচীন দেববর্মন, কিশোর কুমার, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সুবীর সেন, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়... এমন কত নাম।
প্রতি মহালয়ার ভোরে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’র হাত ধরে বাংলার আকাশ-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে মায়ের আগমনি বার্তা। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের স্তোত্রপাঠ ও শিল্পীদের গাওয়া গান শুনলে মনে হয়, কী ভালই না ছিল পুরনো দিনগুলি। যেন ‘এ শুধু গানের দিন/ এ লগন গান শোনাবার...’। শচীনদেব বর্মনের গাওয়া ‘তুমি আর নেই সে তুমি’ (১৯৫৬) আজও হয়ে রয়েছে পুরনো গন্ধমাখা চিরনতুন গান। মহালয়া এসে গেল, কিন্তু সেই অনুভব আজ উধাও। আর তাই গঙ্গা দিয়ে বহু জল গড়ালেও পুজোর দিনগুলিতে আজও মান্না দে’র গানগুলি বাজতে থাকে বাংলাজুড়ে। পুজোর গানে এক মাইলস্টোন শ্যামল মিত্র। সুধীরলাল চক্রবর্তীর সুরে ‘স্মৃতি তুমি বেদনা’ গানে অমর হয়ে আছেন তিনি।
পুরুষ কণ্ঠের পাশাপাশি নারী কণ্ঠও পুজোর গানে মাতিয়ে রেখেছিল বাঙালিদের। লতা মঙ্গেশকর, গীতা দত্ত, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, সবিতা চৌধুরী, নির্মলা মিশ্র, হৈমন্তী শুক্লা, বনশ্রী সেনগুপ্ত, আরতি মুখোপাধ্যায় প্রমুখের গানগুলি শুনলে অনুমান করা যায় কেমন ছিল ‘সেদিনের সোনাঝরা সন্ধ্যা’। কমল দাশগুপ্তের সুরে ‘সাঁঝের তারকা আমি’ গেয়েছিলেন যূথিকা রায়। আজও পুজো প্যান্ডেলে এই গান স্মৃতি ফেলে আসা দিনগুলির কথা ভাবতে ভাবতে চোখের কোণ ভিজে যায় অনেকের। একবার মনে করুন ‘ওগো মোর গীতিময়’ গানটির কথা। ১৯৫০ সাল থেকে আজও প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে বেজে চলে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কালজয়ী গানটি।
‘পুজোর গান’ পর্বটি লতা মঙ্গেশকরকে বাদ দিয়ে ভাবা কঠিন। তাঁর গাওয়া সমস্ত গানই তুমুল জনপ্রিয়। তবে পুজোর গানে আলাদা একটা মজা তো আছেই। ১৯৫৭ সালে ভূপেন হাজরিকার সুরে তাঁর গাওয়া ‘রঙ্গিলা বাঁশিতে কে ডাকে’ এবং ‘না যেও না রজনী এখনও বাকি’ গানদু’টি আজও তুমুল জনপ্রিয়।
অনেকেই প্রশ্ন করেন, পুজোর গানের মধুরতা কোথায় লুকিয়ে? কথায়, সুরে নাকি শিল্পীর কণ্ঠে? সঠিক উত্তর—মেলোডি ও রোমান্টিকতায়। মনে করুন, ‘কিনে দে রেশমি চুড়ি’ গানটির কথা। আশা ভোঁসলের গাওয়া এই গানটি পুজো প্যান্ডেলে আজও সুপারহিট। তাঁর ‘সন্ধ্যাবেলায় তুমি আমি বসে আছি...।’ শুনলেই মনে হয় পুজো এসে গিয়েছে।
ছোটবেলায় পুজো প্যান্ডেলে শুনেছিলাম রাহুল দেববর্মনের গাওয়া ‘অ-এ অজগর আসছে তেড়ে’। সেই গানের সঙ্গে আজও জড়িয়ে আছে সুখস্মৃতি। রাহুল-আশা জুটি পুজোর গানে প্রতিবছর সাড়া ফেলে দিত। ১৯৬৭ সাল নাগাদ কিশোর কুমারকে দিয়ে প্রথমবার পুজো উপলক্ষ্যে বাংলা গান গাওয়ালেন রাহুল দেববর্মন। গীতিকার মুকুল দত্তের কথায় তিনি গাইলেন ‘একদিন পাখি উড়ে যাবে যে আকাশে’। গীতিকারদের ক্ষেত্রে প্রথমেই আসে শ্যামল গুপ্ত, সলিল চৌধুরী, সুধীন দাশগুপ্ত, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম। পুজোর আধুনিক বাংলা গান সৃষ্টিতে হেমন্ত-সলিল জুটির কোনও তুলনা নেই। ১৯৪৯ সালে পুজোর গান হিসেবে ‘গাঁয়ের বঁধূ’ দিয়ে হেমন্ত-সলিল জুটির জয়যাত্রা শুরু। তারপর একে একে এসেছে ‘রানার’, ‘পাল্কির গান’, ‘অবাক পৃথিবী’।
সোনালি সেইসব দিনের ঠাঁই হয়েছে স্মৃতিকোঠায়। এখনও পুজোর গান হয়। কিন্তু সেই নস্টালজিয়া যেন উধাও। কবীর সুমন, অঞ্জন, নচিকেতা, শিলাজিৎ, শ্রীকান্ত, শুভমিতা, রূপঙ্কর, অনুপম, লগ্নজিতা, সোমলতারা রয়েছেন। রয়েছে একাধিক ব্যান্ডও। পুজো উপলক্ষ্যে এখনও অনেক গান প্রকাশিত হয়। তবে অধিকাংশই সোশ্যাল মিডিয়ায়। কিন্তু সেই সব গানে পুজোর আনন্দ ও বাঙালিয়ানা নেই। পুজোর সময় বিভিন্ন কোম্পানি পুরনো গানগুলিকে ‘ওল্ড ইজ গোল্ড’ নামে বাজারে ছাড়ছে। এখনও সেগুলিই বাজছে।
আশার কথা, আজ সন্ধ্যায় মহাজাতি সদনে দীর্ঘ ১৯ বছরের খরা কাটিয়ে ‘জাগো দুর্গা’ অনুষ্ঠানে গাইবেন চির-অষ্টাদশী আরতি মুখোপাধ্যায়। বাঙালির হারিয়ে যাওয়া পুজোর গানের দিনে এই বা কম কী!
লেখক: কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : বিশ্বজিৎ চক্রবর্তী