Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গরিবের অন্নে থাবা

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাজীব গান্ধী ভারতবাসীর চোখ খুলে দিয়েছিলেন। তিনি সখেদে মন্তব্য করেছিলেন, ‘সরকারের দেওয়া প্রতিটি টাকার মাত্র ১৫ পয়সা প্রকৃত বেনিফিসিয়ারির কাছে পৌঁছয়।

গরিবের অন্নে থাবা
  • ২ জানুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাজীব গান্ধী ভারতবাসীর চোখ খুলে দিয়েছিলেন। তিনি সখেদে মন্তব্য করেছিলেন, ‘সরকারের দেওয়া প্রতিটি টাকার মাত্র ১৫ পয়সা প্রকৃত বেনিফিসিয়ারির কাছে পৌঁছয়। মাঝপথেই নয়ছয় হয়ে যায় বাকি অর্থ।’ সে ১৯৮৫ সালের ঘটনা। তিনি তখন দেশের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী। সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছিল। এহেন দেশনেতা দেশবাসীর দুঃখকষ্ট চর্মচক্ষে পরখ করতে চেয়ে পৌঁছেছিলেন ওড়িশার কালাহান্ডিতে। তখন সেখানে জারি কংগ্রেসের শাসন এবং গান্ধী পরিবারের ঘনিষ্ঠ প্রবীণ নেতা জানকীবল্লভ পট্টনায়ক মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে। কিন্তু সেই রাজ্যের মানুষের চরম দুর্দশা দেখে তিনি এমন বিমর্ষ ও ক্ষুব্ধ হলেন যে, তা প্রকাশ করে ফেললেন জনসমক্ষে। পরবর্তীকালে দেশের একাধিক আদালত, দুর্নীতি মামলার বিচারে রাজীবের ওই মন্তব্য উদ্ধৃত করে তাদের পর্যবেক্ষণ কিংবা রায় দিয়েছে। রাজীব গান্ধী সেদিন নতুন কিছু বলেননি। এদেশের একটি শিশুর কাছেও বিষয়টি পরিষ্কার। কিন্তু নতুন যেটা, তা হল একজন প্রধানমন্ত্রীর তরফে প্রকাশ্যে তা স্বীকার করে নেওয়া। রাজীবের খাঁটি জনদরদ এবং স্বচ্ছ মনের প্রকাশ ঘটেছিল ওই ঘটনায়। একথা বলা দরকার যে, তাঁর আগে এবং পরে কোনও দেশনেতাকে এমন ভূমিকায় আমরা পাইনি। তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজনীতির কারবারিদের বিষোদ্গার থেমে নেই। সঙ্গে চলছে ‘আমরা-ওরা’ কিংবা ‘সিঙ্গল ইঞ্জিন-ডবল ইঞ্জিন’ তত্ত্বের অনুশীলন। তার ফলে সরকারি পর্যায়ে রকমারি তদন্ত এবং আদালতে আদালতে বিচার চললেও প্রকৃত দোষীরা অধরাই থেকে যাচ্ছে। 

Advertisement

দুর্নীতি-বিরোধী যুদ্ধের নামে ভারতের এই আজগুবি কাণ্ড অবশ্য আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি এড়ায়নি। স্বচ্ছতার মাপকাঠিতে ভারতের স্থান এজন্য বরাবরই একেবারে নীচের দিকে থাকছে। ক্রমান্বয়ে দু-দশ ধাপ উত্তরণই প্রত্যাশা করে সুস্থ সমাজ। কিন্তু ভারতবাসী এমনই মন্দকপাল যে, অধিকাংশ বছর আমাদের অবনমনই ঘটছে দু-চার ধাপ করে। এই প্রসঙ্গেই চলে আসে ১০০ দিনের কাজের প্রকল্প (মনরেগা), দারিদ্রদূরীকরণের উপযোগী সামাজিক সুরক্ষামূলক বিভিন্ন কর্মসূচি এবং রেশনের মাধ্যমে খাদ্যশস্য গণবণ্টন ব্যবস্থার কথা। গালভরা কর্মসূচি/প্রকল্পের অভাব নেই এদেশে। স্বচ্ছতার সঙ্গে সেগুলির সুষ্ঠু রূপায়ণ হলে বৈষম্য যে অনেকখানি কমত তাতে সন্দেহ কী? কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্যই তো বৈষম্য ক্রমান্বয়ে হ্রাস এবং একমসময় তা দূর করে সমতা প্রতিষ্ঠা। আর এখানেই গলদ ভারতজুড়ে। আমাদের সব শুরুই অতিসুন্দর, কিন্তু অতঃপর চলতে থাকে ধ্যাষ্টামির রকমারি...সমাপ্তি চূড়ান্ত ব্যর্থতায়। কেননা, জমি জল জঙ্গল পাহাড়সহ কোথাও লুটের কারবার বাকি নেই। অতএব গরিবের, ভুখা মানুষের অন্নে হাত দিতেও হৃদয় কাঁপে না কিছু লোকের। এই ‘কিছু লোকের’ ভিতরে কে নেই! নেতা-মন্ত্রী থেকে সাধারণ সরকারি কর্মী, আমলাদের একাংশ অবশ্যই আছে। একটি বিরাট দুষ্টচক্র সক্রিয় না-হলে চুরি-দুর্নীতি অবাধে এবং দিনের পর দিন চলতে পারে না। 
যেমন গণবণ্টন ব্যবস্থায় সম্পন্ন লোকের থাবা দেখা যায় আকছার। অথচ সেখানে অধিকার শুধুমাত্র দারিদ্রসীমার নীচের এবং গরিব মানুষের। সরকারি তদন্তে প্রকাশ, এমন রেশন গ্রাহকদের মধ্যে রয়েছে এক বা একাধিক গাড়ির মালিক, এমনকী কোম্পানি ডিরেক্টর গোছের লোকজনও! পশ্চিমবঙ্গে এরকম লক্ষাধিক লোক বিনামূল্যের রেশন তুলছে! কেন্দ্রীয় খাদ্যমন্ত্রকের একটি রিপোর্ট বলছে, সারা দেশে এরকম সাড়ে ৮ কোটি অবৈধ রেশন গ্রাহকের সন্ধান মিলেছে। অর্থাৎ দেশে খাদ্যসুরক্ষা প্রকল্পের আওতাভুক্ত ৮০ কোটি মানুষের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশই সন্দেহভাজন। কেন্দ্রীয় রিপোর্টের ভিত্তিতে বাংলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার যথোচিত ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই নিতে শুরু করেছে। অবৈধ গ্রাহকদের রেশন বন্ধ করার তোড়জোড় চলছে এখানে। তবে এই সমস্যা কোনও একটিমাত্র রাজ্যের নয়, তামাম ভারতের। এই প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিতে হবে দলমত নির্বিশেষে সবগুলি রাজ্য সরকারকেই। তা না-হলে গরিবের প্রাপ্য কোনওদিনই গরিবের কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত কার যাবে না। দেশে সত্যিকার ‘আচ্ছে দিন’ বা ‘অমৃতকাল’ আনতে হলে গরিবের বঞ্চনা সবদিক থেকেই বন্ধ করতে হবে। সমাজের একটি শ্রেণিকে আবহমানকাল নীচে রেখে দেওয়ার নীতি নিয়ে আর যাই হোক জাতির উন্নয়ন, উত্থান কোনওকালেই সম্ভব হবে না। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ