সমৃদ্ধ দত্ত: তিনজন মানুষ আছেন পৃথিবীতে। তাঁরা তিনজনই চান, এমন একটি বিশ্ব তৈরি করতে যেখানে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থাকবে না। স্বৈরতন্ত্রের জন্য একটি মুক্ত আবহাওয়া থাকবে। অর্থাৎ কেউ বিরুদ্ধাচারণ করবে না। এমন একটি জগৎ হবে, যেখানে তাঁদের ব্যক্তিগত দুর্নীতি, স্বার্থ, চক্রান্ত, দমনপীড়ন এবং বিশ্বসম্রাট হওয়ার পক্ষে খুবই সুরক্ষিত একটি পরিবেশ থাকবে। এই তিনজনের স্বপ্ন ও উচ্চাশা, অতীতের রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনা। সাম্রাজ্যবাদকে প্রতিষ্ঠা দেওয়া। তাঁরা চান, পৃথিবীতে দু’রকম রাষ্ট্র থাকবে। একটি শাসক রাষ্ট্র। অন্যরা শাসিত। এই তিনজনই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে। আইনের শাসনের বিরুদ্ধে।
এই তিনজনের নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প, জি জিনপিং এবং ভ্লাদিমির পুতিন। যথাক্রমে আমেরিকা, চীন এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট। বিশ্বে সবথেকে বেশি পরমাণু অস্ত্র কাদের কাছে আছে? এই তিনজনের কাছে। কত? রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা সর্বোচ্চ, ৫৪৪৯। আমেরিকার কাছে আছে ৫২৭৭। চীন অনেক পিছিয়ে। ৬০০। কিন্তু প্রভাবে তারা পিছিয়ে নয়। শুধুই মুখে মারিতং জগৎ নয়, সত্যিই এই তিনজন এই গোটা বিশ্বের নিয়ন্তা। তাঁদের ঘিরে যে কোনও সংঘাত তৈরি হয়। সহযোগী দেশগুলি পেশিশক্তি প্রদর্শন করে। এই তিন রাষ্ট্রই চায় প্রতিবেশীকে সরাসরি দখল করে নিতে। আজ এই ২০২৫ সালেও। ট্রাম্পের মনোবাসনা, কানাডা-গ্রিনল্যান্ড নিজেদের অস্তিত্ব মুছে ফেলে অবিলম্বে আমেরিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাক। জি জিনপিং চাইছেন যে কোনও সময় তাইওয়ান দখল করে নিতে। পুতিন অপেক্ষা করছেন, ইউক্রেনকে কখন রাশিয়ার ম্যাপে ঢুকিয়ে নেওয়া যাবে।
এই স্বপ্নগুলি পূরণ হবে কি না, সেটা এই তিনজনের কেউই জানেন না। তবু তাঁরা এটা করেন। কেন? গোটা বিশ্বকে ভয় দেখাতে। বিগত কিছু বছর ধরে সাধারণ শান্তিপ্রিয় নির্ঝঞ্ঝাট রাষ্ট্রগুলি কিছুটা যেন স্তম্ভিত। থমকে গিয়েছে। রাষ্ট্রসঙ্ঘ নামক একটি আন্তর্জাতিক নিছক আলোচনা করার ক্লাব কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শুধুই কী ঘটছে দেখে যাচ্ছে। গাজায় শিশুদের হত্যা করার জন্য লাগাতার বোমা বর্ষণ করে ইজরায়েল। রাশিয়া মিসাইল নিক্ষেপ করে ইউক্রেনের হাসপাতালে। কিন্তু রাষ্ট্রসঙ্ঘ শুধুই বহুজাতিক সংস্থার তৈরি মিনারেল ওয়াটারের বোতল সামনে রেখে গম্ভীর মুখে মিটিং করে। এই ক্লাবটির আসলে কোনও প্রয়োজনই নেই বিশ্বে।
এই যে পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতি থামছেই না... একের পর এক নতুন সংঘাত তৈরি হয়েই চলেছে, এই আবহে কে কোথায় দাঁড়িয়ে? রাশিয়াকে প্রচুর ড্রোন দিয়ে সাহায্য করছে ইরান। মূলত ইউক্রেনে হামলা করার জন্যই। আবার ইরানের সবথেকে বেশি তেল ক্রয় করে চীন। তার জন্য বিপুল অর্থও দেয়। সেই অর্থের একাংশ আবার হামাস, হিজবুল্লা এবং সিরিয়ার সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীকে নিয়মিত সাপ্লাই করে তেহরান। অর্থাৎ রাশিয়া, চীন, ইরান একটি অক্ষ তৈরি হয়েছে।
১৯৭৯ সালে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল। ইরানের ইসলামিক বিপ্লব, যা শাহ শাসকবংশকে গদিচ্যুত করে। ইজরায়েল এবং মিশরের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয় ক্যাম্প ডেভিড শান্তি চুক্তি। আর দুবাইতে চালু হয়েছিল একটি নতুন বন্দর। জেবেল আলি পোর্ট। বিশ্বের সর্ববৃহৎ বন্দরগুলির অন্যতম। এই একটিমাত্র বন্দর আরব দুনিয়ার সঙ্গে পশ্চিমি সভ্যতার সর্বপ্রকার বাণিজ্য সম্পর্ক খুলে দিল।
ঠিক সময় থেকেই পশ্চিম এশিয়ায় দু’টি পৃথক মনোভাবসম্পন্ন রাষ্ট্রসমূহের উদ্ভব। একদিকে রইল এমন কিছু রাষ্ট্র, যারা ইজরায়েলকে স্বীকৃতি দিতে রাজি। অবশ্য দু’টি শর্তে, যদি তারা প্যালেস্তাইনের সঙ্গে আধিপত্যকামী মনোভাব না দেখায় এবং উন্নয়নের পথে অগ্রসর হয়। এই রাষ্ট্রগোষ্ঠী পশ্চিমি দুনিয়াকে স্বাগত জানাল। ঠিক বিপরীতে রইল অন্য কিছু দেশ, যারা এই মনোভাবের বিরোধী। তাদের বাসনা, আমেরিকার নেতৃত্বাধীন পশ্চিমি দুনিয়াকে কোনওভাবেই পশ্চিম এশিয়ায় প্রবেশ করতে না দেওয়া। সৌদি আরব, মিশর, জর্ডন ইত্যাদি আমেরিকাপন্থী সরকারের পতন ঘটানো এবং ইজরায়েল নামক কোনও দেশের অস্তিত্বই যেন না থাকে। এই দ্বিতীয় রাষ্ট্রগোষ্ঠীর নেতা ইরান। আর কারা ছিল তাদের সঙ্গে? সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, ইয়েমেন, প্যালেস্তাইন। আর্থিকভাবে ইরানই ছিল সবথেকে ধনী। তাই তারা অঘোষিত নেতা হতে পেরেছিল। যদিও পরবর্তীকালে ইরান ও ইরাকের মধ্যে সংঘাতে এই সমীকরণ কিছুটা বদলে যায়।
এই রাষ্ট্রগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আমেরিকা এবং ইজরায়েল জোট বাঁধে। অস্ত্র দিয়ে, প্রযুক্তি দিয়ে, বাণিজ্য প্রসারিত করে লড়াই চালায় তারা। ইরানের আবার আমেরিকা ও ইজরায়েল বিরোধী যুদ্ধের প্রক্সি ছিল লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, প্যালেস্তাইন। এক-দু’দশকের মধ্যেই ইরানের এই একক নেতৃত্বে আঘাত হানতে মাথাচাড়া দেয় অন্য ধারার ইসলামিক গোষ্ঠী। অতি অবশ্যই আমেরিকার পরোক্ষ মদতে। সেই গোষ্ঠীদের কারও নাম আল কায়েদা, কারও নাম তালিবান, কারও নাম আইএস। কিন্তু এরা ছিল আনগাইডেড মিসাইল। হঠাৎ করে আমেরিকা একদিন আবিষ্কার করল, এরা ইরানকে যতটা শত্রু ভাবছে, তার থেকে বেশি প্রতিপক্ষ খোদ ওয়াশিংটন। অতএব দু’দিকেই লড়াই শুরু হল মার্কিন সরকারের। একদিকে এশিয়ার সন্ত্রাসবাদীরা, অন্যদিকে ইরানের নেতৃত্বাধীন এই দেশগুলি। সেই শুরু।
কীভাবে তৈরি হল আজকের পরিস্থিতি? ২০২২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল ইউক্রেন। ইউরোপ তথা গোটা পশ্চিমি শক্তিগুলির কাছে তা ছিল বড় সুখবর। কারণ, ইউক্রেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার অর্থ হল, ইউরোপ ও আমেরিকার শক্তির সম্প্রসারণ আরও মজবুত হবে। তা রাশিয়াকে প্রবলভাবে চাপে ফেলবে, কোণঠাসা করে দেবে। ঠিক সেই সময় সৌদি আরবের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদনের পথে অগ্রসর হচ্ছিল আমেরিকা। ওই চুক্তি অনুযায়ী, ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে সৌদি। বিনিময়ে প্যালেস্তাইনের সঙ্গে তেল আভিভ একটি সম্ভাব্য চিরস্থায়ী চুক্তিতে আবদ্ধ হবে। গাজা, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক, জেরুজালেম... সবকিছুর সমাধান হবে সেই চুক্তিতে। এই উদ্যোগ ছিল জো বাইডেনের। মার্কিন ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টের। সোজা কথায়, ইউক্রেন পশ্চিমের সঙ্গে আর ইজরায়েল পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে চলেছিল। এতে কাদের সবথেকে বড় সঙ্কট? রাশিয়া এবং ইরানের। রাশিয়া কখনও চায় না যে, ইউক্রেন সরাসরি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অঙ্গীভূত হয়ে বিরাট শক্তির অংশ হয়ে যাক। আবার ইরান কখনও চাইবে না যে, প্যালেস্তাইন, মিশর, ইরাক, সৌদির সঙ্গেই ইজরায়েলের দীর্ঘকালীন বন্ধুত্ব তৈরি হোক। সুতরাং দুই সম্ভাবনাই প্রতিরোধ করতে হবে। কিন্তু কীভাবে?
ঠিক এই কারণেই রাশিয়া আক্রমণ করল ইউক্রেনকে। ইরানের ইশারায় হামাস, হিজবুল্লা আচমকা নিশানা বানাল ইজরায়েলকে। ইউক্রেনের উপর এই হামলা ইউরোপ এবং আমেরিকা মানবে কেন? তাই তারা প্রাণপণে ইউক্রেনের পাশে দাঁড়াল। আর ইজরায়েল সেদিন থেকেই স্থির করল, আর প্যালেস্তাইনের সঙ্গে কোনওরকম আপস নয়। অতএব যুদ্ধ শুরু।
আমেরিকার প্ল্যান কী ছিল? ঠিক যে রাষ্ট্রগুলির সরকার ইরানের নেতৃত্বে চলছে, তাদের সরকার বদলে দেওয়া। সেটা অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে হোক কিংবা বিপ্লব। সেই পরিকল্পনা থেকেই ইরাক, লেবানন, সিরিয়ায় হামলা। কিন্তু ইরাকে আমেরিকার এক্সপেরিমেন্ট ব্যর্থ। সাদ্দাম হোসেনকে ধ্বংস করে, ইরাককে ধ্বংস করেও পূর্ণ গণতন্ত্র তৈরি করা যাচ্ছে না। তবে সিরিয়া ও লেবাননে নতুন নেতৃত্বের সরকার ধীরে হলেও ইরানের অঙ্গুলিহেলনের পরিবর্তে একটি মুক্ত অর্থনীতি ও মানসিকতার প্রতি আগ্রহী। এটাই চেয়েছে আমেরিকা। সেই কারণেই তারা প্রযুক্তি, সোশ্যাল মিডিয়া, ট্রেড এবং আইটি ইন্ডাস্ট্রিকে আগামী বিশ্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছে, যা অনেকাংশে সফল। অর্থাৎ এগুলির স্বাদ না পেলে নিজেদের অনগ্রসর মনে করবে আধুনিক দুনিয়ার নতুন প্রজন্ম। আর সেটাই হচ্ছে পশ্চিম এশিয়ায়। তা ইরানকে শঙ্কিত করে তুলছে। ইউক্রেন যদি পশ্চিমি শক্তির হাতে চলে যায়, তাহলে রাশিয়ায় পুতিনের ইমেজ ধাক্কা খাবে। সিরিয়া, লেবাননরা যদি বহুত্ববাদী কালচারের স্বাদে আকৃষ্ট হয়, তাহলে ইরানের আধিপত্য কমবে।
সবকিছু থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট। শান্ত, নির্লিপ্ত, উদাসীন একটি স্মিতহাস্য মুখ শুধু ভবিষ্যতের পুঁজির স্বার্থ সুরক্ষিত করতে সচেষ্ট। কী সেই পুঁজি? জিনপিং রাশিয়া ও ইরানের পক্ষে। কিন্তু আসলে তাঁর লক্ষ্য, ‘কনফ্লিক্ট মিনারেলস’! ঠিক যেখানে যেখানে বছরের পর বছর ধরে যুদ্ধ, অরাজকতা চলে, সেইসব রাষ্ট্রে যে মূল্যবান খনিজ পাওয়া যায়, তাদের বলা হয় ‘কনফ্লিক্ট মিনারেলস’। পাশাপাশি ‘রেয়ার আর্থ মিনারেলস’ এবং ‘ক্রিটিকাল মিনারেলস’ আজ বিশ্বের প্রতিটি শক্তিশালী দেশের প্রধান লক্ষ্য। ইউক্রেনের খনিজ এলাকার দখল চায় রাশিয়া, আমেরিকা, চীন। কেন? ইউক্রেনে ৫ লক্ষ টন লিথিয়াম আছে। কী কাজে লাগে? ব্যাটারিতে। মোবাইল, ইলেকট্রিক কার এবং সোলার সিস্টেম। বর্তমান ও আগামী বিশ্বের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ আরও দুই খনিজ হল গ্যালিয়াম ও নিওন। ইউক্রেন বিশ্বে এগুলির পঞ্চম বৃহত্তম উৎপাদক। এসব খনিজের প্রয়োজন কী? সেমিকন্ডাকটার, চিপ ইন্ডাস্ট্রির প্রধান উপকরণ, যা বিশ্ব প্রযুক্তির চালিকাশক্তি!
ইরান, কাতার, সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত— সারাক্ষণ অশান্ত এই রাষ্ট্রগুলিতে সবথেকে বেশি কী পাওয়া যায়? পেট্রলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাস। সুতরাং এই যুদ্ধ কখনও কমবে, কখনও বাড়বে। কিন্তু বন্ধ হবে না। যেমন ইউক্রেন নিয়েও সংঘাত কমছে না। কমবেও না। কেন? কারণ বিশ্বের যত ইউরেনিয়াম খনিজ সংরক্ষণ আছে, তার ২ শতাংশই ইউক্রেনে। ইউরেনিয়াম কী কাজে লাগে? পরমাণু অস্ত্র তৈরি করতে।
সাম্রাজ্যবাদ, খনিজ এবং সাংস্কৃতিক সংঘাত। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আজ নয় কাল হবেই। যার প্রধান হাতিয়ার পরমাণু বোমা! আটলান্টিক কাউন্সিল সার্ভের অভিমত হল, সেই নতুন প্রযুক্তির তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাম হবে ‘হাইব্রিড ওয়ার!’ আমেরিকা আর সুপার পাওয়ার থাকবে না। জন্ম হবে এক নতুন পৃথিবীর! নতুন পাওয়ার সেন্টার! সমীক্ষা অনুযায়ী, ভবিষ্যতের সেই ক্ষমতার সমীকরণে একটি দেশের ভূমিকা হবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ!
ইন্ডিয়া!
গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
সহযোগিতায় : সত্যেন্দ্র পাত্র