বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: এসি ঘরে চা-বিস্কুট সহযোগে প্রতিদিন গড়ে ডজনখানেক মিটিং। বড়কর্তাদের ঘরে পদস্থ আধিকারিকদের নিয়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় অভ্যন্তরীণ বৈঠক ধরলে সংখ্যাটা বেড়ে যাবে কয়েকগুণ। দীর্ঘদিন প্রশাসনিক পদে থাকতে থাকতে কার্যত ‘ডাক্তারি’ ভুলতে বসেছেন অনেকে। এসি ঘরে মিটিং আর ইটিং-এর ঠেলায় রাস্তায় নেমে স্বাস্থ্যকর্তার কাজটাও ভুলতে বসেছেন কেউ কেউ।
আর সেই দিন থাকবে না! নামতে হবে রাস্তায়, মাঠে-ময়দানে। যেতে হবে জেলার প্রত্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। শহুরে বাবুর মতো গ্রামের হাসপাতালে ভিজিট করলেই হবে না, প্রত্যেক ভিজিটের বিস্তারিত বিবরণ নথিভুক্ত করতে হবে। সেজন্য আসছে পূর্তদপ্তরের ধাঁচে ‘ফিল্ড ইনসপেকশন অ্যাপ’। দায়িত্বপ্রাপ্তরা সত্যিই হাসপাতাল পরিদর্শনে যাচ্ছেন, নাকি ঘরে বসেই কাজ সারছেন, তা নজর রাখতে অ্যাপে থাকছে অফিসারদের ‘রিয়েল টাইম লোকেশন’ দেওয়ার ব্যবস্থা। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে রোগী ও বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে। তাঁদের ক্ষোভ-দুঃখ জানতে হবে। প্রয়োজনে তাঁদের পরামর্শ গ্রহণও করতে হবে। সম্প্রতি দপ্তরের সর্বস্তরের আধিকারিকদের এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে।
স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, জেলায় সিএমওএইচ থেকে শুরু করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসারকে সপ্তাহে দু’দিন করে বিভিন্ন হাসপাতালে মনিটরিং বা নজরদারি চালাতে হবে। স্বাস্থ্যভবনের ত্রিস্তরীয় অফিসারদের (যুগ্ম থেকে সহকারী স্বাস্থ্য অধিকর্তা) উপরও বর্তেছে গুরুদায়িত্ব। এক-একজনের উপর রয়েছে একাধিক জেলার দায়িত্ব। মাসে অন্তত একটি জেলায় তাঁদের ভিজিট করতেই হবে। স্বাস্থ্য অধিকর্তাকেও নামতে হবে পরিদর্শনে। ইতিমধ্যে জেলার সিএমওএইচরা তাঁদের অধস্তন অফিসারদের (ডেপুটি ১, ২, ৩) পরিদর্শনের জন্য বিভিন্ন ব্লক ও পুরসভা ভাগ করে দিয়েছেন।
স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে খবর, বর্তমানে ডিএইচএস বা স্বাস্থ্য অধিকর্তা থেকে ব্লকের বিএমওএইচ পর্যন্ত ৮১৯ জন চিকিৎসক-কর্তা আছেন। সরকারি পরিভাষায় তাঁদের পরিচয়, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের অফিসার। এই আধিকারিকদেরই রাস্তায় নেমে সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবা ক্ষেত্রে নিবিড় নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মনিটরিংয়ের কাজে নামানো হবে সরকারি হাসপাতাল-স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে কর্মরত প্রায় সাড়ে ৮ হাজার মেডিক্যাল অফিসারকেও। হাসপাতালে হাসপাতালে গিয়ে তাঁরা ‘প্রেসক্রিপশন অডিট’ করবেন। ওষুধ কোম্পানির দেওয়া নামের বদলে বিজ্ঞানসম্মত নামের জেনেরিক প্রেসক্রিপশন, রোগীর অসুখবিসুখের তথ্য লেখা আছে কি না, প্রেসক্রিপশন পাঠযোগ্য কতটা ইত্যাদি খতিয়ে দেখবেন। ওষুধের স্টোরেও নজর দিতে বলা হয়েছে। রোগী বা তাঁদের বাড়ির লোকজনের থেকে পাওয়া উত্তরগুলি ‘প্যারেটো চার্ট’-এ ফেলে জানা হবে, কোন বিষয়ে তাঁদের অসন্তোষ সবচেয়ে বেশি।
সিজার নাকি সাধারণ প্রসব, কোনটা কোন হাসপাতালে বেশি হচ্ছে, কোন হাসপাতাল থেকে অযৌক্তিক রোগী রেফার বেশি হচ্ছে ইত্যাদি তথ্যও জানবেন আধিকারিকরা। হাসপাতালের বর্জ্য নিষ্কাশনের অবস্থা, সংক্রমণ প্রতিরোধে কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, নথিভুক্ত করা হবে সেসব বিষয়ও।