Bartaman Logo
২৮ মে, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

নেতাজির শিক্ষক বেণীমাধব

কথায় বলে, একজন আদর্শ শিক্ষক গড়ে তুলতে পারে একটি আদর্শ সমাজ। এটা অনেকাংশে সত্যি। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও শরৎচন্দ্র বসুর শিক্ষক ছিলেন বেণীমাধব দাস।

নেতাজির শিক্ষক বেণীমাধব
  • ১৬ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০

শাশ্বত বন্দ্যোপাধ্যায়: কথায় বলে, একজন আদর্শ শিক্ষক গড়ে তুলতে পারে একটি আদর্শ সমাজ। এটা অনেকাংশে সত্যি। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও শরৎচন্দ্র বসুর শিক্ষক ছিলেন বেণীমাধব দাস। সুভাষ ও শরৎ বসুর মনে স্বদেশ চেতনার বীজ বপন করেন তিনি। বহু বিপ্লবী নেতা প্রথম জীবনে তাঁর ছাত্র ছিলেন।

Advertisement

বেণীমাধব দাস ১৮৮৬ সালের ২২ নভেম্বর চট্টগ্রামের শেওরাতলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন । দর্শন, অর্থনীতি ও ইতিহাসে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি চট্টগ্রাম কলেজ, কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুল ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেছেন। কটক র‍্যাভেনশ স্কুলে শিক্ষকতা করা কালীন সুভাষচন্দ্র বসুকে ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলেন।

১৯১১ সালের ১১ অগাস্ট সুভাষচন্দ্র বসুর পরিচালনায় কটকে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে অরন্ধন ও অনশন পালন করা হয়। তাঁর ছাত্রদের এই উদ্যোগে পেছন থেকে সাহায্য করেছিলেন বেণীমাধব। ব্রিটিশ সরকার বিষয়টা খুব একটা ভালো চোখে দেখেননি। এর ফলে তাঁকে বদলি হতে হয় কৃষ্ণনগরে। যদিও সুভাষের সঙ্গে তাঁর শিক্ষকের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি কখনও। ‘ভারত পথিক’ গ্রন্থে তার উল্লেখ আছে। দেশত্যাগের আগে তিনি তাঁর শিক্ষকের কাছ থেকে আশীর্বাদও চেয়েছিলেন।

প্রথম জীবনে তিনি কেশবচন্দ্র সেনের সান্নিধ্যে আসেন এবং ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে যুক্ত হন। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক মধুসূদন সেনের কন্যা সারদা দেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বেণীমাধব ব্রাহ্মসমাজ থেকে প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়ান মেসেঞ্জার’ ও ‘নববিধান’ পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯২৩ সালে অনুষ্ঠিত ইন্ডিয়া থেইস্টিক কনফারেন্সের সভাপতিত্ব করেন বেণীমাধব। ‘পিলগ্রিমেজ থ্রু প্রেয়ার্স’ নামে তাঁর প্রবন্ধ সংকলন প্রকাশিত হয়।

শুধু তাঁর ছাত্রদেরই নয়, বেণীমাধব তাঁর সন্তানদেরকেও দান করেছিলেন স্বদেশ প্রেমের মন্ত্র। তাঁরা পিতার আদর্শে প্রভাবিত হয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। বড় মেয়ে কল্যাণী দাসের যুগান্তর দলের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। তিনি প্রথমে আইন অমান্য আন্দোলন এবং পরবর্তীতে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগদান করার জন্য গ্রেপ্তার হন।

ছোট মেয়ে বীণা দাস ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবের নেত্রী ছিলেন। ১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বাংলার ব্রিটিশ গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনের উপর গুলি করে হত্যা করার চেষ্টা করেন। এই ঘটনার সঙ্গে আর কারা জড়িত সেটা জানার জন্য ব্রিটিশ সরকার বেণীমাধবকে দিয়ে বীণার ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চেষ্টা করে। বেণীমাধব তা অস্বীকার করেন এবং বীণার মনে সাহসের সঞ্চার করার জন্য পঁচিশ পৃষ্ঠার একটা প্রতিবেদন লেখেন, যা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বীণা দাস গভর্নরের উপর হামলার পরিকল্পনা যে তাঁর একার ছিল, তা আদালতে দাঁড়িয়ে স্বীকার করেন। সেই জন্য তাঁকে নয় বছর কারাবাস ভোগ করতে হয়।

বেণীমাধব দাস ভারতের স্বাধীনতা দেখেছিলেন। কিন্তু দাঙ্গা বিধ্বস্ত অবস্থায় দেশভাগ তাঁকে বড় বেদনা দিয়েছিল। এই মহান শিক্ষকের ১৯৫২ সালের ২ সেপ্টেম্বর কলকাতায় তাঁর প্রয়াণ ঘটে।

সম্পর্কিত সংবাদ