সংবাদদাতা, রামপুরহাট: ধরপাকড়ের ভয়ে রাতারাতি বন্ধ হয়ে গেল নলহাটির বেআইনি পাথর খাদান। গাড়ির লম্বা লাইন, পাথর ভাঙা কলের আওয়াজে সরগরম থাকত গোটা এলাকা। সেখানে এখন শুনশান চারদিক। অনেকেই বলছেন, বেআইনিভাবে খাদান চালানো হচ্ছিল। পুলিশ, প্রশাসন সব জেনেও নীরব দর্শক সেজে বসেছিল। দুর্ঘটনা না ঘটলে অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রাকৃতিক সম্পদ লুট করা চালিয়েই যেত।
গত শুক্রবার দুপুরে নলহাটির বাহাদুরপুর লাগোয়া মদনা মৌজায় অবৈধ খাদানে ধসে ছ’জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। চারজন শ্রমিক জখম হন। বিএলএলআরওর অভিযোগের ভিত্তিতে শনিবার রাতে অবৈধ খাদানের মালিক ভুলু ঘোষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রবিবার আদালত তাকে পুলিশ হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে। এখনও অধরা এফআইআরে নাম থাকা ভুলু ঘোষের ছেলে সুদীপ। রবিবার জেলার পুলিশ সুপার আমনদীপ জানান, অভিযুক্তকে হেফাজতে নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। কার মদতে অবৈধ খাদান চালাচ্ছিল, তা জেরা করে জানা হবে। সেইসঙ্গে জেলায় কতগুলি অবৈধ খাদান চলছে তা চিহ্নিত করতে সার্ভে শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছিলেন তিনি।
পুলিসের কড়া মনোভাব টের পেয়েই রাতারাতি নলহাটির পাথর শিল্পাঞ্চল বন্ধ হয়ে গিয়েছে। শিল্পাঞ্চল যাওয়ার রাস্তায় পাথরবোঝাই গাড়ির দাপটে যেখানে দিনের অধিকাংশ সময় যানজট লেগে থাকত সেই রাস্তা এদিন ছিল ফাঁকা। গোটা শিল্পাঞ্চলজুড়ে খাদান ও ক্র্যাশার বন্ধ। পুজোর মুখে শিল্পাঞ্চল বন্ধ হওয়ায় শ্রমিকরা বিপাকে পড়েছেন। অনেকে বলছেন, মালিকারা যে লুকিয়ে খাদান, ক্র্যাশার চালাচ্ছিল তা শিল্পাঞ্চল বন্ধের ঘটনায় প্রমাণিত হয়ে গেল। জখম তপন মালের আত্মীয় তথা সিপিএমের কৃষকসভার রাজ্য কাউন্সিলের সদস্য চন্দ্রকান্ত মাল বলেন, খাদান বন্ধ করে মালিকরা বুঝিয়ে দিলেন, তাঁরা এতদিন চুরি করছিলেন। এতদিন প্রশাসন পাথরবোঝাই যানবাহন থেকে রয়্যালটি বাবদ টাকা নিয়ে এই অবৈধ কারবারকে মদত দিয়ে এসেছে। পাশাপাশি তিনি বলেন, তপন এযাত্রায় বেঁচে গেলেও দু’চোখে আর কোনওদিন দেখতে পাবে না। ওর দু’টি চোখ থেঁতলে গিয়েছে।
পাথর শিল্পাঞ্চলে অবৈধভাবে বিস্ফোরকের কারবারও চলে। যত্রতত্র খনন কার্য চালিয়ে হাতের নাগালে পাওয়া জিলেটিন স্টিক ও ডিটোনেটর দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাথর তুলে মুনাফা লুটছে কারবারিরা। বৈধ ব্যবসায়ীদের দাবি, জেলার মল্লারপুর, পাঁচামি ও নলহাটিতে বৈধভাবে অনেকে বিস্ফোরকের ব্যবসা করেন। কিন্তু রাতারাতি বড়লোক হওয়ার লোভে অনেকেই এই অবৈধ কারবারে নামছে। মূলত তাদের কাছ থেকে অবৈধ খাদানের মালিকরা বিস্ফোরক কেনে।
উল্লেখ্য, গত পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে মনোজ ঘোষ নামে বাহাদুরপুরগ্রামের বাসিন্দা স্থানীয় বানিওর পঞ্চায়েতের তৃণমূল প্রার্থী তথা পাথর ব্যবসায়ীর অফিস ও বাড়িতে এনআইএ অভিযান চালিয়ে বিস্ফোরক উদ্ধার করেছিল। পরে বিস্ফোরক পাচার যোগে মুরারই-২ ব্লকের তৃণমূলের কুশমোড়-২ অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত অঞ্চল সভাপতি ইসলাম চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। মুরারইয়ের বাসিন্দা আইটি ইঞ্জিনিয়ার মীর মহম্মদ নূরে জামান নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করা হয়। তারপরও পুলিস বিস্ফোরক সহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু অবৈধ বিস্ফোরকের কারবারে রাশ টানা যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, অবৈধ কারবার সম্পর্কে প্রশাসনও জানে। এই কারবারের রমরমার পিছনে ‘অদৃশ্য সেটিং’ রয়েছে। যদিও জেলাশাসক বিধান রায় সাফ জানিয়েছেন, অবৈধ খাদান চললেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।