শম্পা দত্ত: মাস দুয়েক ধরেই পাপানের ব্যস্ততার শেষ নেই। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই দুড়দাড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামছে। মা রান্নাঘর থেকে চিৎকার করেন, ‘ওরে একটু আস্তে নাম, ঘুম চোখে কেউ ওভাবে দৌড়ায় নাকি!’ কিন্তু কে শোনে কার কথা! এই জন্যেই তো পাপানের ইচ্ছা ছিল ব্যালকনিতে রাখার। তাহলে ঘুম থেকে উঠে ব্যালকনির দরজাটা খুলেই দেখতে পেত। সিঁড়ি দিয়ে নামার দরকারই ছিল না। কিন্তু নানা কারণে তা সম্ভব হয়নি। অগত্যা এই সিঁড়ি নীচে। পাপান এসে দেখল টিয়া পাখিটা খাঁচার ভিতরের দোলনাটায় বসে আছে। পাপান গিয়ে দাঁড়াতেই ‘কে কে’ বলে চিৎকার করতে থাকল। পাপানের দু’মাসের চেষ্টার ফল এটা। পাপান আস্তে করে খাঁচার দরজাটা খুলে ছোলার বাটি আর জলের জায়গাটা বের করল। সাড়ে ছ’টা বাজে। বাড়ির সামনের কলটায় জল এসে গিয়েছে। বাটি দুটো সেই কলের জলে ভালো করে পরিষ্কার করে জলের জায়গাটায় খানিকটা জল ভরে নিয়ে এল। নীচে থেকে চিৎকার করে মাকে জিজ্ঞেস করল, ‘মা, ও মা, কাল রাতে ছোলা ভিজিয়েছিলে?’ মা উত্তর দিলেন, ‘ওই যা!, একদম ভুলে গেছি রে!’ পাপান কাঁদ কাঁদ গলায় বলল, ‘এখন কী খাবে পাখিটা?’ মা প্রথমটা একটু রাগ করে বললেন, ‘তুই নিজে কেন মনে করে ছোলা ভেজাস না? সব মাকে করতে হবে। তখনই বলেছিলাম, পাপান, কিনিস না। অনেক ঝামেলা। কিছুতেই শুনলি না আমার কথা। বাবাও তো বারণ করেছিল। দেখ তো কত সময় নষ্ট হচ্ছে।’
মাস দুয়েক আগেই গেছে রথ। রথের দিন মা-বাবার সঙ্গে একটু সকাল সকালই মেলায় গিয়েছিল পাপান। রথের ক’দিন আগেই ফার্স্ট ইউনিটের রেজাল্ট বেরিয়েছিল। বেশ ভালো নম্বর পেয়েছে পাপান। সেই কারণেই বাবা খুশি হয়ে বলেছিলেন মেলা থেকে পাপানের পছন্দমতো জিনিস কিনে দেবেন। তখন থেকেই পাপান মনে মনে ভেবে রেখেছিল এই পাখি কেনার কথা। কিছুদিন আগেই পাপানের বেস্টফ্রেন্ড তৃষিতের জন্মদিনে ওদের বাড়িতে গিয়ে পাপান দেখেছিল এইরকমই একটা টিয়াপাখি, গলায় লাল দাগ। কেউ খাঁচার কাছে গেলেই পাখিটা ‘কে কে’ বলে চেঁচাচ্ছিল। তৃষিত বলেছিল, পাখিটা আরও অনেকগুলো শব্দ বলতে পারে। গলায় লাল দাগ দেওয়া টিয়াপাখিরা নাকি শেখালে অনেক কথা বলে। সেই থেকেই পাপানের একটা টিয়াপাখি পোষার ইচ্ছে। তৃষিতদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরার পথে মাকে আস্তে করে বলেওছিল। কিন্তু মা প্রথমেই নাকচ করে দিয়েছিলেন। পাপান বলেছিল, ‘তুমিও তো সকালে ছাদে উঠে পায়রাদের গমের দানা দাও!’
‘আমি তো ওদের খাঁচার ভিতর বন্দি করে রাখিনি! ওরা ওদের খুশিমতো আসে, আবার উড়ে যায়। কোনও জীবজন্তুকে বন্দি করে রাখতে নেই।’ মায়ের এসব কথা শোনার পর আর তখন কথা বাড়ায়নি সে। তবে পাখি পোষার ইচ্ছেটা মনে ভেতর থেকেই গিয়েছিল। তাই বাবার কথাতেই বাবাকে জব্দ করে এই টিয়াপাখিটা কিনেছে। সেই থেকে এই টিয়াপাখিই তার ধ্যান-জ্ঞান। স্কুল আর পড়ার সময়টুকু বাদ দিয়ে সর্বক্ষণ এই খাঁচার সামনে।
পাপান আবার বলল, ‘কী খাবে তবে পাখিটা? না খেয়ে থাকবে নাকি!’ মা বললেন, ‘বাবা কাল অনেকগুলো পেয়ারা এনেছে। একটা পেয়ারা দেখছিলাম প্রায় পাকা। ওটা দে। টিয়াপাখি পেয়ারা খেতে ভালোবাসে। আমি এখুনি ছোলা ভিজিয়ে দিচ্ছি, দুপুরে দিয়ে দেব।’ পাপান মায়ের কথামতো পাকা পেয়ারাটা এনে দিল পাখিটাকে। সত্যি, সঙ্গে সঙ্গে টিয়াপাখিটা ঠোকরাতে শুরু করল। বাবা দুধ আনতে গিয়েছিলেন। গ্রিল-গেটটা খুলে পাপানকে নীচে দেখেই রেগে গেলেন। ‘তুই এখনও পড়তে বসিসনি! আটটা বাজে। দশটায় স্কুল-ভ্যান এসে যাবে। তার মাঝে স্নান-খাওয়া। কতক্ষণ আর পড়বি? এই পাখি পাখি করেই সেকেন্ড ইউনিটের রেজাল্টটা খারাপ হবে। আর আমি তো বলেইছি, রেজাল্ট খারাপ হলেই পাখিটাকে উড়িয়ে দেব।’ পাপান আর একটাও কথা না বলে দুড়দাড় করে উপরে উঠে কোনওরকমে ব্রাশ করেই পড়ার টেবিলে। ঘণ্টা দেড়েক পড়ল। পড়াশোনায় পাপান বরাবরই ভালো। এই ক’দিন পাখিটার জন্য একটু গাফিলতি হচ্ছে বটে, কিন্তু ঠিক মেকআপ করে নেবে। তারপর স্নান-স্কুলের পোশাক পরা-খাওয়া। এঁটো মুখ ধুতে না ধুতেই স্কুল ভ্যানের প্যাক প্যাক। বইয়ের ব্যাগটা পিঠে নিয়ে কোনওরকমে জুতোতে পা গলিয়েই দৌড়। তবে গ্রিল-গেট খুলে বেরবার আগে পাখির খাঁচাটার সামনে একবার দাঁড়াতে ভোলে না। চিৎকার করে মাকে বলে, ‘দুপুরে মনে করে ছোলাটা দিও কিন্তু মা...।’
বিকেলে বাড়ি ফিরে বারান্দার গ্রিল-গেট খুলে প্রথমেই দাঁড়ায় পাখির খাঁচাটার সামনে। পাখিটা যথারীতি চেঁচিয়ে ওঠে, ‘কে কে?’ তারপর জুতোটা খুলতে গিয়ে একজোড়া অচেনা স্যান্ডেল দেখে অবাক হয়। কে আসতে পারে ভাবতে ভাবতে ওপরে উঠেই ডাইনিংয়ে সোফার উপর দাদুকে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ছুট্টে গিয়ে জড়িয়ে ধরে। ‘দাদুভাই, তুমি কখন এলে?’ বলেই প্রণামটা সেরে নেয়। দাদু হাসতে হাসতে বলেন, ‘তোমাকে কেমন চমকে দিলাম বল তো! তা দাদুভাই, তোমার ফিরতে আজকে এত দেরি হল যে!’
‘আরে, কালকে ১৫ আগস্ট না! ছোট্ট করে একটা অনুষ্ঠান হয় স্কুলে প্রত্যেক বছর। সেইজন্যই স্যার গান প্র্যাকটিস করাচ্ছিলেন বলে দেরি হল।’ কথাগুলো বলেই পাপান দাদুর হাত ধরে টানল। ‘চল চল দাদুভাই, তোমাকে একটা জিনিস দেখাব।’ দাদু হাসতে হাসতে বললেন, ‘আগে স্কুলের ড্রেস ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে খাওয়া-দাওয়া কর, তারপর দেখিও।’ পাপান তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে নিল। মায়ের দেওয়া চাউমিন শেষ করে দাদুকে নিয়ে নীচে এল। খাঁচাটার সামনে গেলে পাখিটা আবার ‘কে কে’ বলে চিৎকার করে উঠল। দাদুর দিকে তাকিয়ে হাসল পাপান। দাদু একটু মৃদু হাসলেন। পাখির ব্যাপারে কোনও কথাই বললেন না। তারপর পাপানকে বললেন, ‘চল দাদুভাই, তোমার পড়ার ঘরে যাই।’ দাদু কোনও আগ্রহ দেখালেন না বলে পাপান একটু কষ্টই পেল। ওপরে এসে দাদুকে পড়ার ঘরে নিয়ে গেল। পাপানের সবে ক্লাস ফোর। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা, বিপ্লবীদের কথা সেভাবে কিছুই জানে না। দাদু বললেন, ‘আজ স্কুলের পড়া থাক, আজকে তোমাকে স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প শোনাই।’ পাপান খুব আগ্রহ ভরে দাদুর মুখ থেকে কবেকার সেই স্বাধীনতা যুদ্ধের গল্প শুনতে লাগল। দাদু বললেন নেতাজির কথা, মাস্টারদা সূর্য সেনের কথা, বিনয়-বাদল-দীনেশের কথা। শোনালেন আন্দামানের সেলুলার জেলে বন্দি বিপ্লবীদের কথা। সেলুলার জেলের সেই ছোট্ট কুঠুরিতে কীভাবে তাঁরা মরে বেঁচে থাকতেন, সেই গল্প। শুনতে শুনতে পাপানের চোখে জল এল। ‘বন্দিদশা বড় কষ্টের দাদুভাই। শুধু মানুষের ক্ষেত্রে নয়, যেকোনও প্রাণীর ক্ষেত্রেই।’
‘টিয়া পাখিটা পুষেছি বলে তুমি খুশি হওনি, তাই না দাদুভাই? কিন্তু আমি তো ওকে খুব যত্ন করেই রেখেছি!’ বলল পাপান।
‘তোমাকে যদি খুব ভালো ভালো খাবার দেওয়া হয়, পোশাক দেওয়া হয়, কিন্তু এই ঘরের বাইরে যেতে না দেওয়া হয়, তোমার কেমন লাগবে বল তো! পারবে তো এই একটা ঘরের মধ্যে থাকতে?’ জানতে চাইলেন দাদু। গল্প করতে করতে অনেকটা সময় কেটে গিয়েছে। এমন সময় মা খেতে ডাকলেন। আর একটাও কথা না বলে খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়ল পাপান। ঘুমের মধ্যে সারারাত কী সব স্বপ্ন দেখল। পাখিটা যেন বলছে, ‘আমাকে খাঁচার বাইরে যেতে দাও, আমি ওই নীল আকাশে উড়ে বেড়াব।’
সকালের আলো মুখে এসে পড়তেই ঘুম ভেঙে গেল পাপানের। বাইরে এসে দেখল মা রান্নাঘরে চায়ের জল চাপিয়েছেন। দাদুভাই কোথায় জানতে চাওয়ায় মা ছাদের দিকে দেখিয়ে দিলেন। পাপান জানত দাদুভাই রোজ সকালে ঘুম থেকে উঠে সূর্যপ্রণাম করেন। পাপান ছাদে না গিয়ে নীচে নেমে গেল, তবে দুড়দাড় করে নয়, ধীরেসুস্থে। টিয়াপাখির খাঁচাটা হাতে নিয়ে উপরে উঠে এল। তারপর সোজা সিঁড়ি দিয়ে ছাদে। দাদু তখন সূর্যপ্রণাম শেষ করেছেন। চোখাচোখি হতেই একগাল হেসে বললেন, ‘সুপ্রভাত দাদুভাই।’ পাপান হাসল। তারপর আস্তে আস্তে খাঁচার দরজাটা খুলে দিল। টিয়াপাখিটা খাঁচা থেকে বেরিয়ে উড়ে গিয়ে বসল প্রথমে ছাদের কার্নিশে। তারপর সোজা ওই নীল আকাশে। কিন্তু কী আশ্চর্য! একটুও কষ্ট হল না পাপানের। বরং পাখিটাকে ডানা মেলে উড়ে যেতে দেখে অদ্ভুত ভালোলাগায় ভরে গেল মনটা। দাদু এসে পাপানের কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘আজকে স্বাধীনতার দিনে কাউকে কি বন্দি করে রাখতে আছে দাদুভাই! এই বেশ হল। তোমার খাঁচার পাখি এখন মুক্ত বিহঙ্গ। ইচ্ছেমতো ডানা মেলে উড়ে বেড়াক। মুক্তিতেই তো আনন্দ দাদুভাই, মুক্তিই জীবন।’