অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: কথায় বলে, ‘ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে’। নদীয়া জেলায় এসআইআর নিয়ে বিজেপির অবস্থা ঠিক এমনটাই! নিজেদের শক্ত ঘাঁটিতেই সম্ভবত থাবা বসাতে চলেছে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়া। সেই তালিকায় প্রথম সারিতে রয়েছে নদীয়া দক্ষিণ।
অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: কথায় বলে, ‘ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে’। নদীয়া জেলায় এসআইআর নিয়ে বিজেপির অবস্থা ঠিক এমনটাই! নিজেদের শক্ত ঘাঁটিতেই সম্ভবত থাবা বসাতে চলেছে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনী প্রক্রিয়া। সেই তালিকায় প্রথম সারিতে রয়েছে নদীয়া দক্ষিণ।
বাংলায় এসআইআর চালু হতেই বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী, রোহিঙ্গাদের ভোট বাতিল নিয়ে বেশ উৎফুল্ল ছিলেন গেরুয়া শিবিরের নেতারা। কিন্তু, সংশোধনীর প্রক্রিয়া যত গুটিয়ে আসছে, ততই দেখা যাচ্ছে, গেরুয়া-গড়েই ভোট বাতিলের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্য হারে বেশি! আর সেইসব গড়ে বিজেপির অক্সিজেন মূলত মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ বলে মত রাজনৈতিক মহলের। যার মধ্যে নদীয়া দক্ষিণের বিধানসভাকেন্দ্রগুলি অন্যতম। প্রকাশ্যে এ নিয়ে কিছু না বললেও বিজেপির অন্দরে বেশ আলোড়ন চলছে। সেই কারণেই পদ্ম নেতারা এখন ভরসা খুঁজছেন সিএএ’র উপর।
জেলায় শেষ হয়েছে এসআইআরের প্রথম ধাপের কাজ। বুধবার দুপুর পর্যন্ত ৪৪ লক্ষ ১৮ হাজার ভোটারের ১০০ শতাংশের ডিজিটাইজেশন সম্পন্ন হয়েছে। খসড়া তালিকাও খুব শীঘ্রই প্রকাশিত হবে। সেই তালিকায় মৃত, স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত, ডুপ্লিকেট ভোটার মিলিয়ে মোট ২ লক্ষ ১৬ হাজার ৪৫৫ জন ভোটারের নাম বাদ পড়তে চলেছে। তবে, ম্যাপিং না হওয়া ভোটারের সংখ্যা বেশ চমকপ্রদ। আড়াই লক্ষেরও বেশি ভোটারকে ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে ম্যাপিং করানো যায়নি। যার সিংহভাগটাই নদীয়া দক্ষিণের অন্তর্গত। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, আড়াই লক্ষ ভোটারের মধ্যে দু’লক্ষের বেশি ভোটার রয়েছে নদীয়া দক্ষিণের বিধানসভাগুলিতে। যেগুলি মতুয়া অধ্যুষিত বলে পরিচিত। অন্যদিকে, নদীয়া উত্তরের তৃণমূল প্রভাবিত এলাকার বিধানসভাগুলিতে সম্পুর্ণ বিপরীত ছবি। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ম্যাপিং না হওয়া উত্তরের ভোটার সংখ্যা মাত্র ৫০ হাজার।
এসআইআরের ফলে এহেন অস্বস্তিকর ছবি উঠে আসবে, তা সম্ভবত কল্পনাও করতে পারেননি গেরুয়া নেতারা। ফলে, তাঁরা এখন সিএএ’র দিকে তাকিয়ে। বিজেপির রানাঘাটের সাংসদ জগন্নাথ সরকার বলেছেন, ‘যাঁরা বাংলাদেশি মুসলিম তাঁরা হয়তো সংখ্যায় কম রয়েছেন। বাকি যাঁরা বাদ পড়বেন, তাঁরা সিএএ’র অধীনে আসবেন। নাগরিকত্ব পেতে আবেদন করবেন। সেটা পেয়ে গেলে ভোটে আর কোনও প্রভাব পড়বে না।’ জগন্নাথবাবুর এই বক্তব্যেই পদ্ম শিবিরের আশঙ্কা স্পষ্ট। রানাঘাট দক্ষিণে দু’লক্ষেরও বেশি ভোট বাদ পড়লে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে প্রভাব পড়বে বলে কার্যত মেনে নিয়েছেন তিনি। সুযোগ বুঝে সিএএ ইস্যুতে নতুন করে শান দিতে শুরু করেছে তৃণমূল। দলের চাপড়ার বিধায়ক রুকবানুর রহমান বলেছেন, ‘ভোট এলেই বিজেপি সিএএ নামক গাজর ঝুলিয়ে সামাজিক বিভাজন তৈরির চেষ্টা করে। এবারও তাই করছে। তবে, সফল হবে না।’
কমিশনের তথ্যানুযায়ী, নদীয়া দক্ষিণের অন্তর্গত হরিণঘাটা বিধানসভায় ১৭ হাজার ৬২৪, কল্যাণী বিধানসভায় ৩১ হাজার ৬০২, চাকদহ বিধানসভায় ২২ হাজার ৭৩৯, রানাঘাট দক্ষিণ বিধানসভায় ২৭ হাজার ২৫৬, রানাঘাট উত্তর-পূর্ব বিধানসভায় ৩০ হাজার ৫৩৮, কৃষ্ণগঞ্জ বিধানসভায় ২৯ হাজার ৩৮৯, রানাঘাট উত্তর-পশ্চিম বিধানসভায় ২৭ হাজার ৪৩১, নবদ্বীপ বিধানসভায় ৭ হাজার ৪০২ জন এবং শান্তিপুর বিধানসভায় ২১ হাজার ৯৯৩ জন এবং নবদ্বীপ বিধানসভায় ৭ হাজার ৬২৩ জন ভোটারকে ম্যাপিং করানো সম্ভব হয়নি। সবমিলিয়ে নদীয়া দক্ষিণে ম্যাপিংয়ের আওতায় না আসা ভোটারের সংখ্যা ২ লক্ষ ১০ হাজার ১৯৫ জন। রাজনৈতিক মহলের মতে, নদীয়া দক্ষিণ বিজেপির উত্থানভূমি। এর পিছনে মূল কারিগর মতুয়ারা। যাঁরা মূলত বাংলাদেশ থেকে ভারতে এসেছেন। ম্যাপিংয়ে না আসা তাঁদের সংখ্যাই বেশি বলে কপালে ভাঁজ পড়েছে বিজেপি নেতাদের। সিএএ’তে এমন বিশাল ধস সামলানো যাবে কি না, সেটা এখন লাখ টাকার প্রশ্ন।