নিজস্ব প্রতিনিধি, বহরমপুর: মুর্শিদাবাদ জেলার প্রায় তিনহাজারের বেশি চাকরি বাতিল হয়েছে। জেলা শিক্ষা ভবনের কাছে কোনও পরিসংখ্যান না থাকলেও ৩২০০জনের চাকরি গিয়েছে বলে যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চ দাবি করেছে। ২০১৬সালের এসএসসি প্যানেলের প্রায় ২৬হাজার জনের চাকরি বৃহস্পতিবার বাতিল করে দিয়েছে সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খান্না ও বিচারপতি সঞ্জয় কুমারের বেঞ্চ। এই রায়ের পর চাকরিহারাদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়েছে। তাঁরা অনিশ্চয়তা ও হতাশায় বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।
আর পাঁচটা দিনের মতোই এদিন স্কুলে এসেছিলেন বহরমপুরের খাগড়া জিটিআইয়ের শিক্ষিকা ঝুমা সরকার। ক্লাস নিতে যাওয়ার আগে খবর পেলেন, তাঁর চাকরি বাতিল হয়েছে। হতাশায় ভেঙে পড়ে ঝুমাদেবী বলেন, দু’বছর প্রাথমিক শিক্ষিকা পদে চাকরি করেছি। আপার প্রাইমারিতে চাকরি পেয়েও যাইনি। কারণ আমি নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষিকা হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম। পিজি পোস্টের পরীক্ষাতেও পাশ করেছিলাম। ওয়েটিং লিস্টে ১৬নম্বরে নাম ছিল। এই রায়ে যোগ্যদের সঙ্গে চরম অন্যায় করা হয়েছে-এটুকুই বলতে পারি।
এদিন জেলার নানা প্রান্তের শতাধিক চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকা ব্যারাক স্কোয়ার ফিল্ডে জড়ো হন। বেশিরভাগই রায় শুনে স্কুল থেকে বেরিয়ে এসেছেন। যোগ্য শিক্ষক-শিক্ষিকা অধিকার মঞ্চের তরফে নওপাড়া জুনিয়র হাইস্কুলের শিক্ষক হাবিবুল্লা শেখ বলেন, আমি স্কুলের একমাত্র ইংরেজি শিক্ষক। আমি তো আর স্কুলে যাব না। এবার পঠনপঠন কীভাবে হবে। যারা দোষ করিনি, তাঁরাও শাস্তি পেলাম। যোগ্য হয়েও সব হারালাম। আদালতের অর্ডারের কপির অপেক্ষা করছি। রিভিউ পিটিশনের জন্য হয়তো ফের আদালতে যাব। সবাইকে মানসিকভাবে শক্ত থাকতে হবে। কেউ যাতে ভুল সিদ্ধান্ত না নেন, সেজন্য একে অপরের খোঁজখবর রাখছি।
লালনগর হাইস্কুলের চাকরি হারানো শিক্ষক রাজর্ষি মণ্ডল বলেন, আমরা কেউ কাউকে টাকা দিইনি। অথচ রাজনৈতিক কারণে বলির পাঁঠা হলাম। অপরাধীরা অধরাই থেকে গেল। অর্ডার কপি পড়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।
এঘটনায় রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী বলেন, বাংলায় অপরাধীরা জামিন পায়। আর নিরপরাধদের অপরাধী বানানোর চেষ্টা হয়। সবকিছুর মূলে দুর্নীতি। টাকা দিয়ে যে চাকরি নিয়েছে সে যেমন দুর্নীতির শিকার, যে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও চাকরি হারাল-সেও তাই। রাজ্য সরকার শুধু দুর্নীতি করেই চুপ থাকছে না। সেই দুর্নীতি ধামাচাপা দিতে মানুষের করের টাকা সুপ্রিমকোর্টে নষ্ট করছে।
বিজেপির বহরমপুর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি মলয় মহাজন বলেন, আমি একজন শিক্ষক। আমি জানি রাজ্যের বেশিরভাগ স্কুলে শিক্ষকসংখ্যা খুব কম। তার মধ্যে ২৬হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকার চাকরি চলে যাওয়া শিক্ষাব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দেবে। রাজ্য সরকার দুর্নীতি করেছে। সেজন্যই বহু যোগ্য প্রার্থীও চাকরি হারালেন।
প্রাক্তন মন্ত্রী তথা জঙ্গিপুরের তৃণমূল বিধায়ক জাকির হোসেন বলেন, আমরা বিচারব্যবস্থার উপরে নই। তবে মুখ্যমন্ত্রীর চেষ্টা সত্ত্বেও প্যানেল বাতিল হয়ে ২৬হাজার ছেলেমেয়ে চাকরি হারিয়েছেন। যোগ্যদের ইন্টারভিউ নিয়ে চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি। মানুষ চাকরি পাচ্ছে না, সেখানে চাকরি চলে যাওয়াটা মানতে পারছি না। যোগ্যদের চাকরি যেন বহাল থাকে, কেন্দ্রীয় সরকারকে সেই অনুরোধ করব।