ধুতি-পাঞ্জাবির সাবেকি সাজ। ফ্যাশন শ্যুটে চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী ধরা দিলেন অন্য মেজাজে। সত্তরোর্ধ্ব নায়ক জমিয়ে দিলেন আড্ডা।
ধুতি-পাঞ্জাবির সাবেকি সাজ। ফ্যাশন শ্যুটে চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী ধরা দিলেন অন্য মেজাজে। সত্তরোর্ধ্ব নায়ক জমিয়ে দিলেন আড্ডা।
শীতের সকাল। আড়মোড়া ভেঙে সচল হয়েছে শহর। ‘টিম চতুষ্পর্ণী’ হাজির দক্ষিণ কলকাতার একটি আবাসনের নীচে। লিফটে উঠে নির্দিষ্ট ফ্লোরে পৌঁছলাম। দরজা খুলে গেল। ‘তোমরা তিন মিনিট লেট’— যিনি অভ্যর্থনা জানালেন তাঁর বয়স সদ্য ৭০ পেরিয়েছে। শৃঙ্খলা যাঁর জীবনের মন্ত্র। সেই শৃঙ্খলার ডানায় ভর করেই ৭০ বসন্ত পেরিয়েও চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী যেন চিরতরুণ।
ফোটোশ্যুটের জন্য নির্দিষ্ট করা রয়েছে ধুতি ও পাঞ্জাবি। দেখেই পছন্দ হল অভিনেতার। মেকআপ করে রেডি হয়ে ড্রইংরুমে এলেন। মনে পড়ল সেই বিখ্যাত লাইন, ‘মেজাজটাই তো আসল রাজা’। শুরু হল আড্ডা। এই বয়সেও নিজেকে নবীন, তরতাজা রাখার রহস্য কী? হেসে বললেন, ‘আমাকে সেদিনও একজন বললেন, আপনাকে বড়জোর ৫৫ বলা যেতে পারে। আসলে আমি জীবনে শৃঙ্খলা মেনে চলি। কিছু নিয়ম মানলেই ভালো থাকা যায়। ১০টা গাড়ির তো দরকার নেই আমার। বিরাট ফ্ল্যাটেরও দরকার নেই। যেটুকু আছে, তা যেন গুছিয়ে রাখতে পারি। প্রতিদিন শরীরচর্চা করি। ট্রেডমিল করি। যোগাসন করি। শৃঙ্খলার অভ্যেস আমার ছোট থেকেই। অন্য লোকের বাড়ি গিয়ে দেওয়ালে ঝোলানো বেঁকে থাকা ছবি সোজা করে দিয়েছি। আমি পার্টিকুলার। আমার জীবনটাও তাই।’
আপনার নাকি প্রায় ৩৫০টি ছবিতে অভিনয় করা হয়ে গেল? সত্যি? অকপট চিরঞ্জিৎ, ‘অত হবে না। আমি গুনিও না। তবে ২৫০ পেরিয়ে গিয়েছে। বুম্বা (প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়) আমার থেকে অনেক এগিয়ে। ওর তো সাড়ে তিনশোর উপর হবে!’
সদ্য মুক্তি পেয়েছে অর্ণব মিদ্যার ছবি ‘হাঁটি হাঁটি পা পা’। বাবা-মেয়ের সম্পর্কের গল্প তো? অভিনেতা বলেন, ‘গল্পে বাবা, মেয়ের কেমিস্ট্রি এমন, একে অপরকে দারুণ ভালোবাসে। ভালোবাসা ছাড়া বাঁচার কোনও অর্থ নেই। বাবা, মেয়ে একে অপরের নির্ভরতার জায়গা হয়ে উঠছে। ব্যক্তিজীবনে আমার তো বাবা-মেয়েরই সম্পর্ক। আমার একটিই কন্যা। বাবা হিসেবে ছেলের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হয়, তা আমি জানি না। তবে ছেলে হিসেবে বাবাকে দেখেছি। বিখ্যাত মানুষের ছেলে আমি। শৈল চক্রবর্তী আমার বাবা, সেটা একটা প্রিভিলেজ। তাঁর জিন আমার শরীরে। ফলে আমার পক্ষে ছবি আঁকা, লেখা, গান গাওয়া সহজ। ওগুলো সব ‘দীপক’ করে। আসল দীপক। সে চিরঞ্জিৎ নাম দিয়ে একজনকে বাজারে ছেড়ে দিয়েছে। যে সিনেমা করে অর্থ রোজগার করে দীপককে দেয়। ও তাতে খায়, পরে। কিন্তু চিরঞ্জিৎ বাইরের লোক। আমার সঙ্গে সর্বক্ষণ থাকে দীপক (হাসি)।’
৭০ পেরিয়ে যাওয়া চিরঞ্জিৎ কি
২৫-এর ‘দীপক’কে কিছু বলতে চান? ‘শৃঙ্খলা রাখো জীবনে। এটা ছাড়া কিছু নেই’, আত্মদর্শনের কথা বললেন অভিনেতা।
দীপক-এর কাছ থেকে কিছু ফেরত পেতে চান চিরঞ্জিৎ? সামান্য সময় নিলেন। তারপর বললেন, ‘ভাই আমার থেকে ছ’বছরের ছোট। ও মারা গিয়েছে। কিছু ফিরে পাওয়ার সুযোগ থাকলে ভাইকে ফিরে পেতে চাইব।’ পরিবেশ কিছুটা যেন ভারী হয়ে উঠল। খানিক আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন চিরঞ্জিৎ? ঠিক যেন সদ্য মুক্তি পাওয়া ছবির মতো? তাঁর উত্তর, ‘এই ছবিটা আমাকে ভীষণই ইমোশনাল করেছে। ছবিটা দেখতে দেখতে কেঁদে ফেলব। আমার মা যখন মারা গিয়েছেন তখন আমার ১২ বছর বয়স। বাংলা ইন্ডাস্ট্রিই আমাকে পালন করেছে। আমার মায়ের মতো। অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, এই ছবিটা সব বয়সের দর্শক দেখবেন।’
এবার ফোটোশ্যুটের পালা। আয়না দেখে নিজেই বদলে নিলেন চশমার ফ্রেম। ক্যামেরা অন হতেই যেন অন্য মুড। চিরঞ্জিতের কথায়, ‘আমি ধুতি পাঞ্জাবি পছন্দ করি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরি। পাজামা পাঞ্জাবিও পরি। তবে জিন্স, শার্ট সবথেকে বেশি পছন্দের।’ আর পছন্দের রং? তাঁর উত্তর, ‘আমি একজন চিত্রশিল্পী তো। আলাদা করে কোনও রঙের প্রতি দুর্বলতা নেই। কিন্তু রক্তলাল, কালো ভালো লাগে। আমার ছবিতেও তার প্রকাশ দেখতে পাবেন। পোশাকেও তাই।’
স্বরলিপি ভট্টাচার্য