বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: রামপুরহাটে এখন মাদকের ‘সেলসম্যান’ নাবালকরা। পুলিসের চোখকে ফাঁকি দিতে তাদেরকে হাতিয়ার করেছে মাদক চক্রের চাঁইরা। খুচরো বিক্রেতারা দিচ্ছেন হোম সার্ভিস অফার। ফোন করলেই বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে হেরোইন, কোরেক্স ও নাইট্রোজেন টেন-এর মতো মাদক। বোলপুর ও সাঁইথিয়ায় বসে ফোনের মাধ্যমে নাবালকদের অপারেট করছে কারবারের মাথারা।
জানা গিয়েছে, সমান্য টাকার বিমিময়ে মাদক সরবরাহের কাজ করছে নাবালকরা। তাদের গড় বয়স ১০ থেকে ১৫ বছর। সকলের বাড়ি রামপুরহাট শহরের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে। প্রায় সকলেই স্কুলছুট। সবার হাতেই দামি অ্যানড্রয়েড ফোন। গত রবিবার এক যুবককে নাইট্রোজেন টেন সরবরাহ করতে গিয়ে এলাকাবাসীর হাতে ধরা পড়ে পাঁচ নাবালক। বাসিন্দারা তাদের চড় থাপ্পড় মেরে দু’টি নাইট্রোজেন টেন কেড় নেন। রাজু শেখ নামে এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘ওই নাবালকরা জেরায় জানায়, বর্ধমান, বোলপুর ও সাঁইথিয়া থেকে দাদারা এসে তাদের হেরোইন, কোরেক্স নাইট্রোজেন টেন সহ নানা মাদক দিয়ে যায়। পরে তারাই ফোন করে নির্দেশ দেয় কোথায় মাদক পৌঁছে দিতে হবে। সেই মতো তারা ডেলিভারি করে। নাবালকদের কাছ থেকে বর্ধমানের এক কারবারির ফোন নম্বর মিলেছে। কিন্তু, কল করা হলেও যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। নাবালকদের বলেছি, ওরা যখন মাদক দিতে আসবে তখন জানাতে। সেদিন মূল কারবারিদের ধরে পুলিসের হাতে তুলে দেব।’
কিন্তু প্রশ্ন হল, কারবারিদের সঙ্গে নাবালকদের যোগাযোগ কীভাবে। জেরায় নাবালকরা জানিয়েছে, রামপুরহাটের ছফুঁকো বাসস্টপেজ এলাকায় তারা খেলাধুলো করে। একদিন তারা ঠান্ডা পানীয় খাচ্ছিল। তখন এক যুবক এসে গলা শুকিয়ে গেছে বলে ঠান্ডা পানীয় খেতে চায়। এরপরই আলাপ জমিয়ে নাবালকদের টোপ দেয় কারবারিবা। বলা হয়, মাসে ত্রিশ হাজার টাকা করে বেতন ও বোলপুরে বাড়ি বানিয়ে দেওয়া হবে। এমন লোভনীয় অফার পেয়ে মাদক কারবারে ঢোকে তারা।
মূলত পুলিসের চোখ ফাঁকি দিতেই নাবালকদের কাজে নামিয়েছে কারবারিরা। তাদের কথা মতোই স্যুট, বুট পরে, পীঠে ব্যাগ নিয়ে ডেলিভারি করতে যায়। যাতে কারও সন্দেহ না হয়। তাদের দেখে মনে হয় স্কুল পড়ুয়া। এভাবেই নেটওয়ার্ক তৈরি করে শহরের বুকে চলছে মাদকের রমরমা কারবার। পরবর্তীতে এদের কেউ কেউ প্রভাব খাটাতে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব জাহির করছে। দিন কয়েক আগে এক নাবালক তার ইনস্ট্রাগ্রামে বোমা তৈরি করে ফাটানোর ভিডিও আপলোড করে। এলাকার তৃণমূল নেতা আরশাদ হোসেন বলেন, ‘কিছুদিন আগে একটি ছেলে বোমা বেঁধে ফাটিয়েছিল। আওয়াজ পেয়েছিলাম, কিন্তু অসুস্থতার জন্য রাতে যেতে পারিনি। পরের দিন ওই ছেলেকে ধরেছিলাম। সে জানায়, পটকা থেকে মশলা বের করে বোমা বেঁধেছিল। তবে মাদকের বিষয়টি আমার জানা নেই।’ পুলিসও জানিয়েছে, বিষয়টি তাঁদের জানা নেই। এলাকাবাসী যোগাযোগ করলে ওই কারবারিদের ধরতে পদক্ষেপ করা হবে।
রামপুরহাট কলেজর অধ্যাপক জয়ন্ত দাস বলেন, ‘মাদকের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাবে সমাজে এখন অবৈধ, অনৈতিক, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। সন্তানদের প্রতি অভিভাবকদের নজরদারি বাড়াতে হবে। নাবালকদের যে কেরিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তার অন্যতম কারণ ওদের দারিদ্রতা। ওদের ভীষণভাবে কাউন্সেলিংয়ের প্রয়োজন। সেই সঙ্গে প্রশাসনকে সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে এবং সেচ্ছাসেবী সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে।’