রূপক বর্ধন রায়: বাঙালির খাওয়াদাওয়া নিয়ে, মূলত আমাদের মাছ-মাংস খাওয়া নিয়ে দেশে এখন বিস্তর গণ্ডগোল। আমাদের আমিষ খাওয়াদাওয়া দেশের অনেকেরই বিশেষ সহ্য হচ্ছে না। তবে এ সমস্যা নতুন নয়। গদ্যরাজ রাজশেখর বসুর ১৯৫৭ সালের ‘আমিষ নিরামিষ’ নামক লেখাটি এই বিষয়ে পথ দেখাতে পারে। তিন বন্ধু—ফণী মল্লিক, মথুর ও অঘোরের পাড়াতুতো আড্ডার এক জায়গায় মথুর জানতে চাইছেন, ‘অঘোর তুমি কী বলো? মাংসাহার আসুরিক নয় কী?...’ সে কথার উত্তরে নিজে নিরামিষাশী হয়েও অঘোর জানান, ‘ঠিক বলতে পারি না। নিরামিষাশী গণ্ডার, মোষ আর ষাঁড়ের ক্রোধও নেহাত কম নয়।...এদেশের অনেক লোক গরুকে মাতৃজ্ঞান করে, বাঁদরকে ভ্রাতৃজ্ঞান করে...। নিরামিষ ভোজন বেশি হিতকর কি না, তার পরীক্ষা বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে এ পর্যন্ত হয়নি।’ ‘হক কথা!’ ফণী ফোড়ন কেটে জানিয়ে দেন, ‘...এদেশে নদীবহুল অঞ্চল আর সমুদ্রের উপকূলে বিস্তর মাছ পাওয়া যায়, সেই বিধিদত্ত খাদ্য না খাওয়া ঘোরতর বোকামি।’ পিরিয়ড! আমিও ঠারেঠোরে সে কথাই মানি। মাছ তো খেতেই হবে। তাছাড়া এখন দারুণ সময়। বর্ষা আগত। পাতে একহাত সাইজের রুই, কই, ভেটকি, ইলিশ না পড়লে এ জীবনটাই বৃথা! নয় নয় করে তেরোটা বছর বিভিন্ন দেশে ঘুরলাম, কিন্তু মাছ খাওয়া নিয়ে এমন ন্যাশনাল লেভেলের নষ্টামো জীবনে কোথাও দেখিনি। মাছের যাঁদের মনপসন্দ খাবার, তেমন সমস্ত জেন্টেলমেন এবং ওমেন থিংক এ্যালাইক করবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক! আরে বাবা, আমাদের গড়িয়া বাজারের রাজকুমারদার ভেটকির ফিলেতে কেজি দরে তিনশো টাকা বেশি চাওয়াই হোক, বা ইস্তানবুলের কাদিকয় মাছ-বাজারের জনৈক আবি-র চিনেকোপ বা চুপরা বিক্রির নামে পকেট কাটার ফন্দি—দুইয়ের ক্ষেত্রে আমার রাগটা কী আলাদা হবে? একেবারেই না। কারণ ভাষা, দেশ যাই হোক বা কারেন্সি নির্বিশেষে আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি। চাইলে ওই মাছ দিয়েই গোটা পৃথিবীর সঙ্গে একটা লবি ফেঁদে ফেলতে পারি। তাই, এই বাজারে ফ্রান্সের নিস শহরে বসে তাজা স্যামন আর ট্রাউট মুচমুচে করে ভেজে এই আড্ডা দিতে এলাম আপনাদের সঙ্গে (আহা, এসব দিনে কৃষ্ণসাগরের ছোট স্যামনের কথাও বড় মনে পড়ে)। এখন আমাদের কাজ নানান দিক থেকে বিচার করে এই বিশ্বজোড়া মেছো লবির একটা ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করে ফেলা। আর একবার সেটা নামিয়ে দিতে পারলে, যাঁরা আমাদের বাড়া মাছে জল ঢালতে আসবে, তাঁদের ল্যাজায় খেলানো হবে আমাদের কড়ে আঙুলের কাজ। তাহলে শুরু করা যাক?
শুরুতে এক-আধটা ঝগড়াঝাঁটির গল্প বলি। না না, ঘাবড়াবেন না! ঝগড়া বলতে এ তেমন তিতকুটে ব্যাপার নয়। এপার-ওপার বাংলার ‘এ ইলিশ তোমার না আমার?’ গোছের স্বামী-স্ত্রী মার্কা যে মাখো-মাখো কোঁদল আমি তার কথা বলছি। এমন ‘দত্ত ভার্সেস দত্ত’ লড়াইকে যতই আমরা আমাদের একচেটিয়া মনে করি না কেন, মাছ নিয়ে দুই দেশের অশান্তির নজির ভূরি ভূরি আছে। যেমন, ধরুন দুই দশক আগের ‘ফ্লাইং ফিশ ডিসপুট’। ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দুটো ছোট্ট দেশ, বার্বাডোজ আর ত্রিনিদাদ-টোবাগো। একহাত সাইজের দেশদুটোর মধ্যে এক প্রজাতির ‘উড়ুক্কু মাছ’ (ফ্লাইং ফিশ) নিয়ে সে কী অশান্তি! ব্যাপার হল, ফ্লাইং-ফিশ ঐতিহাসিকভাবে বার্বাডোজের জাতীয় পরিচয়ের অঙ্গ। তাদের মুদ্রায় যেমন এই মৎস্যমূর্তি খোদাই করা আছে, তেমনই বার্বাডোজের জাতীয় খাবার ‘কু-কু অ্যান্ড ফ্লাইং ফিশ’ এই বিশেষ মাছটিকে ঘিরেই। কিন্তু, সময়ের সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে মাছেদের থাকা-খাওয়ার অঞ্চল কিছুটা দক্ষিণে সরে আসতেই ঝামেলার সূত্রপাত। বার্বাডোজের জেলেরা তাদের পিছু নিতে নিতে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর ‘স্পেশাল ইকোনোমিক জোনে’ ঢুকে পড়েন। ব্যস, আর যায় কোথায়? টোবাগোর নৌসেনা এই মারে কি সেই মারে! এমনকী ঢুকে আসা জেলেদের আটকাতে ত্রিনিদাদের ‘অল টোবাগো ফিশারফোক অ্যাসোসিয়েশন’ অভিযোগ তোলে যে, অতিরিক্ত মাছ শিকারের ফলে পরিবেশ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শেষমেশ ২০০৬ সালে আন্তর্জাতিক আদালতের মধ্যস্থতায় বিরোধ থামানো গেলেও দু’-দলের কেউই খুশি হয়নি। আবার যে কোনওদিন ঝগড়া লাগল বলে! এ তো গেল হালের কথা। আরও একশো বছর পিছিয়ে যাওয়া যাক। সময়টা ১৯০৪। উত্তর সাগরে মাছ ধরতে আসা কয়েকটি ব্রিটিশ নৌকাকে জাপানের টর্পেডো-বোট ভেবে রাশিয়ার যুদ্ধজাহাজ ধাঁ করে বোমা মেরে দেওয়ায় তুলকালাম বাধে (Dogger Bank Incident)। সেই ঘটনায় বেশ কিছু মৎস্যজীবী আহত এবং নিহত হওয়ায় আর একটু হলেই দু’দেশের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যাচ্ছিল আর কী! কোনওক্রমে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় রাজি হয়ে ক্ষতিপূরণ দিয়ে, ক্ষমা চেয়ে সে যাত্রায় বেঁচে যায় রাশিয়া। এছাড়া, ১৯৫০-১৯৭০ অবধি ব্রিটেন ও আইসল্যান্ডের মধ্যে উত্তর-অতলান্তিক মহাসাগরে মাছ শিকার নিয়ে লড়াই, নয়ের দশকে কানাডা ও স্পেনের মধ্যে চলা গ্রিনল্যান্ড-টুরবট শিকার নিয়ে চুলোচুলি (যা যুদ্ধপরিস্থিতি তৈরি করতে পারত), অথবা একেবারে হালের ব্রিটিশ ও ফরাসিদের মধ্যে চলা ‘স্ক্যালোপ ওয়ারে’র মতো আরও একাধিক উদাহরণ দেওয়া যায়। কাজেই আমাদের মাছ খাওয়া নিয়ে দুটো কথা শোনাতে এলে বলে দেবেন শুধু খাওয়ার পাতে নয়, মেছো-ঝগড়ার কেসেও বাঙালি একা নয়, দলে আরও অনেক লোক আছে।
ঝগড়াঝাঁটি নিয়ে ঘাঁটাঘাটি তো হল, এবার সংস্কৃতিতে ফেরা যাক। যে মনুষ্যজাতির খাদ্য সংস্কৃতিতে এহেন মৎস্যপ্রাবল্য, সে জাতির সমাজসমষ্টিকে সাহিত্য, চিত্রকল্প ইত্যাদির প্রেক্ষিতে একই প্রসঙ্গে গাঁথা যাবে না, তা কি হয়? যেহেতু এই আলোচনার শব্দপরিসর সীমিত, তাই আপাতত সমস্ত সংস্কৃতির আদিরূপ যা, সেই লোকসংস্কৃতি ও পুরাণের আঙিনায় ঢুকি চলুন। আমাদের ঘরের অবতার বিষ্ণুর মৎস্য-রূপ সম্বন্ধে আমরা প্রায় সকলেই ওয়াকিবহাল। এমনকী মূল ধারার ধর্মগুলোর প্রায় সবক’টাতেই মৎস্য অবতারের কীর্তিকলাপের প্রতিরূপ দিব্যি খুঁজে পাওয়া যায়, তাও জানি। যেমন, নোয়ার নৌকা বা গ্রিক পুরাণের দিউকালিয়ন ও পিরার গপ্পো। ব্যাপার হল, সমস্ত পুরাণেই একটা না একটা মেগা বন্যার কাহিনি আছে। আর তাই বেশ বড়সড় একটা নৌকারও প্রয়োজন পড়েছে। আরও উদাহরণ মেসোপটেমিয়ার গিলগামেশ বা চীনাদের মুয়া। কিন্তু খোদ মাছের প্রতীকে মহাজাগতিক রক্ষাকর্তা বা রক্ষাকর্ত্রীর গল্প পেতে গেলে আরেকটু খোঁড়াখুঁড়ি প্রয়োজন। তবে আছে! যেমন, প্রাচীন পারস্যের পুরাণের মাছ ‘কারা’। যে হাওমা নামক জলজ উদ্ভিদদের বাঁচিয়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের পবিত্রতা বজায় রেখেছিল বা জাপানি পুরাণের বিশাল ‘ট্যাংরা’ নামাজু! এরইসঙ্গে পলিনেশিয়ার সমুদ্র দেবতা টাঙ্গারোয়া বা চীনা কার্প খুব গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উভয়ই আমাদের ইলিশ বা বিয়ের কাতলার মতোই সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যের প্রতীক। আবার, ‘কই মাছের প্রাণ’ নিয়ে যে গপ্পো বা প্রবাদ চালু আছে বাংলায়, তার সঙ্গে জাপানের ওই ‘কই’ নামেরই এক ধরনের কার্পের নিদারুণ মিল। দুই-ই রেজিলিয়েন্স বা স্থিতিস্থাপকতার প্রতীক। আর লোকজীবন? আমাদের দৈনন্দিন বেঁচে থাকা? তাকে বাদ দিয়ে কিছুই হয় না। ওপার বাংলার তিতাস অঞ্চল বা উভয় বাংলার গঙ্গা-পদ্মা বরাবর বেড়ে ওঠা নদীমাতৃক ও মৎস্যনির্ভর সভ্যতার সঙ্গে নর্ডিক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সমবর্তী অবাক করেনি, এমন ইতিহাসবিদ নেই বললেই চলে। লোকসংস্কৃতির দিকটা শেষ করার আগে মাছ নিয়ে আমাদের প্রবাদ-প্রবচন এবং তার সঙ্গে বিশ্বসংস্কৃতির নিবিড় সংযোগ না ছুঁয়ে গেলে অন্যায় হবে। বিগত ১৩ বছরের প্রবাস যাপনের অভিজ্ঞতা থেকেই এই আলোচনা শুরু করা যাক। যেমন, ‘মাছের মাথায় মাছি বসা’ এই প্রবচনটার সরাসরি জাতভাই আইরিশরা হামেশাই ব্যবহার করে। ওরা বলে ‘A fish rots from the head’। আমার ছ’বছরের ইস্তানবুল যাপনে সে দেশের তদানীন্তন (সে অবস্থা এখনও) রাজনৈতিক অবস্থা ও নেতাদের ব্যাপারে আমার পিএইচডি অ্যাডভাইসারকে হামেশাই বলতে শুনতাম, ‘Balık baştan kokar’, যার অর্থও মোটামুটি একই; মাছ মাথা থেকে পচে। বিগত বছর ছয়েকের ফরাসি যাপন ও তাদের সংস্কৃতির কথাও না বললেই নয়। ‘Le poisson pourrit par la tête’; কথাটির মানেও হরেগড়ে ওই একই। আবার ধরুন, আমাদের বাগধারায় ‘মাৎস্যন্যায়’ বা ‘বড় মাছের পেটে ছোট মাছের উদরস্থ হওয়ার’ যে কনসেপ্ট তার তুর্কি, ইংরেজি, জার্মান ও ফরাসি প্রতিরূপ পরপর দেশগুলোতে যেমন কুড়িয়ে বাড়িয়ে পেয়েছি, এখানে তুলে দিচ্ছি—
‘Büyük balık küçük balığı yutar’- তুর্কি
‘Big fish eat little fish’- ইংরেজি
‘Der große Fisch frisst den kleinen Fisch’- জার্মান
‘Le gros poisson mange le petit poisson’ - ফরাসি
কাজেই দেশ, ভাষা, ধর্ম নির্বিশেষে সেই একই বক্তব্যের নানান অভিব্যক্তি। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কথা বলায় তিনটে বা চারটে ভাষায় সীমিত রাখলাম, কিন্তু পৃথিবীর যাবতীয় ভাষায় যে এমনতর হাজারো উদাহরণ আছে, সে কথা বলে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। এবার থামতে হবে। নাহলে বিশ্ব ও বাংলার লোকসংস্কৃতিতে মাছের জায়গা নিয়ে কথা বলতে বসলে রাত কাবার হয়ে যাবে। তাছাড়া এখানে আমরা সে উদ্দেশ্য নিয়ে আড্ডা দিচ্ছি না। আমরা যেনতেনপ্রকারে বাঙালির মৎস্যপ্রীতি নিয়ে একটা পৃথিবীজোড়া লবি খাড়া করতে চাইছি, যাতে উল্টোদিকের সকলের মুখে একেবারে কুলুপ এঁটে দেওয়া যায়।
সেদিক থেকে ভাবতে গেলে গল্প, ছড়া, ঝগড়াঝাঁটি সবই তো হল, কিন্তু মাছ নিয়ে আড্ডার শেষপাতে খাওয়াদাওয়া আর রান্নাবান্নার গপ্পো হবে না, তা কী করে হয়! আগের সূত্রেই বলি, মনসামঙ্গল কাব্যে আছে লখিন্দর-বেহুলার বউভাতে অতিথিদের বেসন দিয়ে চিতল-কোল ভাজা, জিরে লবঙ্গ মাখিয়ে কই মাছ ভাজা, লঙ্কা দিয়ে মাগুর মাছের ঝোল, আম দিয়ে কাতলা মাছ, মহাশোলের অম্বল, রুই মাছের মাথা দিয়ে মাষকলাইয়ের ডাল- সব মিলিয়ে আঠারো রকমের মাছের পদ ছিল। সেই ঐতিহ্য মেনে আমি নিজে আমার কলেজের বন্ধুর আইবুড়োভাতে আট রকমের মাছের পদ দিয়ে লাঞ্চ সেরেছিলাম, কাটা ছাড়া পাতে কিচ্ছু পড়ে ছিল না! আমাদের, মানে বাঙালিদের বিশ্বজোড়া মেছো-কোলাবরেশন-সমূহকে সঠিকভাবে বোঝাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘দিবে আর নিবে, মেলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে...’ লাইনটা একেবারে মোক্ষম। যেমন ধরুন, আমাদের দই-মাছ। দইয়ের ঝোলে মাছ ফোটানো কোনওকালেই বাঙালির একচেটিয়া ছিল না। বরং, খুব ভুল না হলে, ‘ডাচ (ওলন্দাজ) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’র নাবিকদের হাত ধরে ক্রিম সসের ধারণাটি এ বঙ্গে প্রবেশ করে, যার উপর ভিত্তি করে বাংলার রন্ধনশিল্পীরা মাছ রান্নায় দই ব্যবহার শুরু করেন। ওলন্দাজদের হাত ধরে ১৮ শতকের শেষদিকে দই-মাছ বাংলার অভিজাত সমাজে নতুনত্ব ও জনপ্রিয়তা উভয়ই এনেছিল। তবে সর্ষের তেলে মাছ ভেজে তারপর ঝোলে নিজ-মশলার সংযোজনে ওলন্দাজদের কোনও হাত নেই, ওর সমস্ত ক্রেডিট আমাদের। আবার ক্রিম সসের সম্পূর্ণ কৃতিত্বও আমি ডাচদের দিতে রাজি নই। পিএইচডির বছরগুলোয় তুর্কি, ফার্সি, আরব ইত্যাদি জাতির বন্ধুবান্ধবদের দিব্যি নানান রান্নায় দই ব্যবহার করতে দেখেছি। পশ্চিম হল, মধ্যপ্রাচ্যও হল কিছুটা। এবার আসা যাক দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায়। আমাদের ‘মালাইকারি’ যে আদপে ‘মালয়কারি’ সেকথা আমরা অনেকেই জানি। কাজেই এই কারির সঙ্গে যে মালয় (বর্তমান মালয়েশিয়া) অঞ্চলের নিরবিচ্ছিন্ন যোগ আছে, তাও স্বতঃসিদ্ধ। চতুর্থ ও পঞ্চম শতাব্দীতেই মশলা ব্যবসার কেন্দ্রবিন্ধু হিসেবে মালয় অঞ্চলের উত্থান হলেও পনেরশো শতাব্দী নাগাদ ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের ব্যবসায়ীরা এলাচ, দারুচিনি ইত্যাদি মশলার সঙ্গে তাদের পরিচয় করান (ইতিহাসবিদরা দ্বিধাবিভক্ত) যা আসতে আসতে মালয় কারির অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ আমলে আমরা দায়িত্ব নিয়ে সে কারিকে প্রভাবিত করি, যার ফলে ‘কারি কাপিতান’-এর মতো সুস্বাদু সেই ডিশের জন্ম হয়। কাজেই সেই রান্না এবং আমাদের রোববারের চিংড়ির মালয়কারি যে নারকেল ও নারকেল-দুধের স্বাদে দেশ-কালের সীমা অতিক্রম করবে, সেই তো স্বাভাবিক। আজকাল মাছের রেডকারি বা গ্রিনকারি, প্রায় সবেতেই হয় লেবুপাতা নয়তো নারকেল-দুধ বা ক্রিমের গন্ধ ও স্বাদ সেই আদিম সমবর্তী হরদম মনে করিয়ে দেয় আমায়। অন্যদিকে, আমাদের মুড়ো বা মুড়িঘন্টের (আমাদের ক্ষেত্রে চাল, ওপার বাংলায় ডাল) সঙ্গে থাইল্যান্ডের ‘টম ইয়াম প্লা’র (মাছের মাথার স্যুপ) সাযুজ্যও যে সেই প্রাচীন বাংলার নাবিকদের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার হেঁশেলের সামাজিক লেনদেনের ফল সেও হক কথা! আপনাদের কাছে মন খুলেই বলি, আজকাল আইরিশ বা ফরাসি মাছের মাথার স্টু’র সঙ্গে আমার শ্বশুরবাড়ির ইলিশের মাথা দিয়ে মুসুরির ডালের বিস্তর মিল পাই, একটু মশলার এদিক-ওদিক, ব্যস! ঝোল-ডাল-চচ্চড়ি হয়ে এবার ভাজা, ফিশ কাটলেট! ব্রিটিশ বা ইউরোপীয়দের চালু করা ক্রোকেট আর আমাদের ফিশ কাটলেটে কণামাত্র পার্থক্য আছে বলুন তো? তাদেরই দৌলতে বিশ শতকের গোড়ার দিক থেকেই ফিশ কাটলেট সহযোগে টি-পার্টি বঙ্গদেশের স্বচ্ছল পরিবারগুলোতে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। আর এখনও ‘সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে, কোথাও তার পরিবর্তন ঘটেনি।’
খাওয়াদাওয়া তো হল, বেশ খানিকক্ষণ মেছো আড্ডাও হল, আপাতত আমার কথাও ফুরালো, প্রশ্ন হচ্ছে কী দাঁড়াল? দাঁড়াল এই যে, মাছ নিয়ে গল্পগাছা, ছড়া-কবিতা, রান্নাবান্না এমনকী ঝগড়াঝাঁটিতেও বাঙালি একা নেই, তার দলে আছে গোটা পৃথিবী। নেহাতই এই আড্ডায় সময় ও শব্দপরিসর—উভয়ই সীমিত, বিশ্বাস করুন, তা না হলে আরও গোটাপাঁচেক বিষয় টেনে একরত্তি থিসিস না নামিয়ে ছাড়তাম না! আমাদের মাছ খাওয়া নিয়ে খোঁটা? একবার দেখতাম, কোথাকার কে লাটের ব্যাটা! দেখুন, এরপর আশেপাশে কোনও ভদ্দরলোক বা মহিলাকে হঠাৎ যদি, ‘আরে বঙ্গালি তো মছলি খাতা হ্যায়!’ বলতে শোনেন, লালমোহন গাঙ্গুলির মতো সদর্পে উত্তর দেবেন, ‘কেবল বঙ্গালি নেহি, গোটা দুনিয়া খাতা হ্যায়, নেহি তো ইতনা মছলি পড়-পড়কে পচ যায়গা!’ আর সবশেষে, আসুন সকলে মিলে সেই দিনটার আশায় বুক বাঁধি, যেদিন সমস্ত বাঙালির পকেট এতই ফুলেফেঁপে উঠবে যে বারো মাসের তেরো পার্বনের প্রত্যেকটাতেই সকলের থালায় একহাত লম্বা ইলিশ, রুই, ভেটকির পিস ঝকঝক করবে। আর শুধু বাঙালি কেন, পৃথিবীর সমস্ত মৎস্যপ্রেমী জাতির জন্যও আমাদের সেই শুভকামনাই থাকুক না হয়! সকলের খাবার থালায় ধোঁয়া ওঠা ভাতের সঙ্গে মাছের সাম্যবাদ আনার এই স্বপ্নের সঙ্গে কবি ঈশ্বর গুপ্তের কথা দিয়ে এই আড্ডা শেষ করি—
‘ভাত-মাছ খেয়ে বাঁচে বাঙ্গালী সকল।
ধানে ভরা ভূমি তাই মাছ ভরা জল।।’



