নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: অপরাধ, তিনি বাঙালি! অপরাধ, তিনি বাংলায় কথা বলেন! শুধু সেই কারণেই বংশ পরম্পরায় কোচবিহারের দিনহাটার বাসিন্দা উত্তমকুমার ব্রজবাসীর হাতে ধরানো হয়েছে নোটিস? বলা হয়েছে, তিনি অনুপ্রবেশকারী! বাংলা ও বাঙালির বিরুদ্ধে ‘পুশব্যাক’ রাজনীতিতে নয়া সংযোজন হয়েছে এই ‘এনআরসি নোটিস’। প্রমাণ করতে বলা হয়েছে, উত্তমকুমার ভারতীয়। নির্দেশ এসেছে, বংশ পরম্পরায় তাঁরা এদেশের বাসিন্দা হলে ১৯৬৬ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ভোটার তালিকায় তাঁর বাবার নাম দেখাতে হবে। না হলে কি ডিটেনশন ক্যাম্প? বাংলার মানুষের বিরুদ্ধে এই ‘রাজনীতি’তেই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, এটা ‘বাংলা বিরোধী’ বিজেপির চক্রান্ত। এ রাজ্যের বাসিন্দাদের এনআরসির জালে জড়ানোর ছক।
উত্তমকুমারকে অসমের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের চিঠির বিষয়টা জানাজানি হতেই উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন মহলে। নবান্নের তরফেও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সমস্ত বিষয়টি জানতে চাওয়া হয়। খবর নেওয়ার পরই হিমন্ত বিশ্বশর্মার নেতৃত্বাধীন অসমের বিজেপি সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। মঙ্গলবার সকালে এই ঘটনায় তিনি ‘হতবাক ও অত্যন্ত বিচলিত’ বলে জানিয়ে এক্স হ্যান্ডলে তাঁর আক্রমণ, ‘এটি গণতন্ত্রের উপর পরিকল্পিত আক্রমণ ছাড়া কিছু নয়। এই ঘটনা প্রমাণ করে—অসমে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি চাপানোর চেষ্টা করছে। অথচ সেই ক্ষমতা বা অধিকার, কোনওটাই তাদের নেই।’ একই সুরে তোপ দেগেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। এক্স হ্যান্ডলে তিনি লিখেছেন, ‘এভাবে বাংলার মানুষের মনে ভয় ধরাতে চাইছে বিজেপি। টার্গেট করছে। যাতে বাংলাতেও ডিটেনশন ক্যাম্প মডেল চালু করা যায়।’
এর আগে ভোটার তালিকার ‘স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন’ নিয়ে নির্বাচন কমিশনকেও তুলোধোনা করেছিলেন মমতা। কমিশনের এই ‘কর্মসূচি’র আড়ালে আসলে বিজেপি সরকার এনআরসি চালু করতে চাইছে বলেই অভিযোগ করেছিলেন তিনি। তার কিছুদিনের মধ্যেই বাংলার বাসিন্দাকে অসমের এনআরসি নোটিস! তাও কাকে? যিনি কখনও অসমেই যাননি! এই প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার বিজেপির ‘জনবিরোধী কার্যকলাপ’ সর্বসমক্ষে নিয়ে এসেছেন মমতা। এদিন মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভয় দেখানো, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া এবং নিশানা করার একটি পরিকল্পিত নোংরা চক্রান্ত চলছে। এই অসাংবিধানিক আগ্রাসন জনবিরোধী এবং এটি বিজেপির বিপজ্জনক ষড়যন্ত্রকে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট করে দিচ্ছে। দেখিয়ে দিচ্ছে, গণতান্ত্রিক সুরক্ষাকে ধ্বংস করে বাংলার মানুষের পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা চালাচ্ছে বিজেপি।’
এদিন সব বিরোধী দলকে একজোট হয়ে ‘বিজেপির বিভাজনমূলক ও দমন-পীড়নের রাজনীতি’র বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ডাকও দিয়েছেন মমতা। সেইসঙ্গে তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘ভারতবর্ষের সাংবিধানিক কাঠামোকে ধ্বংস করা হলে, বাংলা চুপ করে থাকবে না।’