নিতাই সাহা, সিউড়ি: হাত-পা অসাড়। ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। বাবা বাইকে করে স্কুলে পৌঁছে দেন। বেশিরভাগ সময় হুইলচেয়ারই ভরসা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে উচ্চ মাধ্যমিকে ৬৫ শতাংশ নম্বর পেয়েছেন সিউড়ির কড়িধ্যা যদুরায় মেমোরিয়াল অ্যান্ড পাবলিক ইন্সটিটিউশনের ছাত্র মহাদেব শর্মা। অভাবের সংসারে দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে ভালো ফল করেছেন একই স্কুলের ছাত্রী প্রিয়াঙ্কা সোরেন। ৮৬শতাংশ নম্বর পেয়েছেন। দু’জনেই আগামী দিনে ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা এগিয়ে নিয়ে যেতে চান। শিক্ষক হওয়াই তাঁদের স্বপ্ন। স্কুলের শিক্ষক ও পরিচালন কমিটি দুই পড়ুয়ার পাশে দাঁড়িয়েছে।
আবদারপুরের বাসিন্দা মহাদেবের বাবা সুভাষ শর্মা পেশায় কাঠমিস্ত্রি। মা সুনীতা শর্মা গৃহবধূ। সংসারের কাজ সামলে বেশিরভাগ সময়ই ছেলের দেখভালে কেটে যায়। বাইকে ছেলেকে স্কুলে নিয়ে যান সুভাষবাবু। তারপর হুইলচেয়ারে বসে চলাফেরা করেন। তাঁর বাঁ পা অসাড়। সেইসঙ্গে দুই হাতও একপ্রকার কর্মক্ষমতাহীন। তবে সেই হাতের সাহায্যেই কোনওরকমে লেখালেখি ও ছবি আঁকার কাজ চালিয়ে যান। যদিও পরীক্ষার হলে নির্দিষ্ট সময়ে সমস্ত প্রশ্নের উত্তর লিখতে তাঁকে রাইটারের সাহায্য নিতে হয়। মাধ্যমিকের পর উচ্চ মাধ্যমিকেও রাইটারের সাহায্য নিয়েই তিনি পরীক্ষা দিয়েছেন। মোট ৩২৫নম্বর পেয়েছেন। মহাদেব বলেন, পড়াশোনার পাশাপাশি আমি ছবি আঁকতে ভালোবাসি। বাচ্চাদের পড়ানোই আমার স্বপ্ন। শিক্ষক হতে চাই। আমাকে জয়ী হতেই হবে। মহাদেবের মা ও বাবা বলেন, ছেলের সাফল্যে আমরা খুবই খুশি। কিন্তু, চিন্তাও হয়। আমাদের পর ছেলেকে কে দেখবে! ছেলে স্বপ্ন পূরণ করতে পারলে অন্তত স্বস্তি পাব।
প্রিয়াঙ্কার বাড়ি নলহাটিতে। সিউড়ির সাজানোপল্লিতে মাসির বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেন। শৈশবেই তাঁর বাবার মৃত্যু হয়েছে। সংসারের হাল ধরতে মা ললিতা সোরেন কৃষিকাজ করেন। দাদা রাকেশ সোরেন পাথর খাদানে কাজ করেন। ছোট থেকেই দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করছেন। উচ্চ মাধ্যমিকে ৪২৯নম্বর পেয়েছেন। শিক্ষিকা হয়ে ছোটদের পড়াতে চান। প্রিয়াঙ্কা বলেন, ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে চাই। শিক্ষিকা হওয়াই আমার স্বপ্ন।
স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক যামিনীকান্ত সাহা বলেন, মহাদেব ও প্রিয়াঙ্কা সমস্ত প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে সফল হয়েছে। ওই দুই পড়ুয়া স্কুলের গর্ব। আমরা ওদের সাফল্যে গর্বিত। স্কুল পরিচালন কমিটির সভাপতি দেবাশিস চট্টোপাধ্যায় বলেন, আমরা দুই পড়ুয়ার পাশে রয়েছি। আগামী দিনে ওদের উচ্চশিক্ষার সমস্ত দায়িত্ব আমরা নিচ্ছি। -নিজস্ব চিত্র