চলছে রান্নাবান্নার গল্প আর রেসিপি নিয়ে বিভাগ হারানো রান্নার গল্প। এই বিভাগে একটি পদ নিয়ে একটা গল্প শোনাবেন রন্ধন বিশেষজ্ঞ ও গবেষক শুভজিৎ ভট্টাচার্য, সঙ্গে থাকবে সেই রান্নাটির রেসিপি। আজকের পর্বে পাঁঠার বাংলা।
চলছে রান্নাবান্নার গল্প আর রেসিপি নিয়ে বিভাগ হারানো রান্নার গল্প। এই বিভাগে একটি পদ নিয়ে একটা গল্প শোনাবেন রন্ধন বিশেষজ্ঞ ও গবেষক শুভজিৎ ভট্টাচার্য, সঙ্গে থাকবে সেই রান্নাটির রেসিপি। আজকের পর্বে পাঁঠার বাংলা।
বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রজয়ন্তী বা পঁচিশে বৈশাখ এক পার্বণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই সকাল থেকেই রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজানোর চল আজও রয়েছে বহু বাঙালি বাড়িতে। শুধু তাই নয়, এই অনুষ্ঠানের রেশ আরও কয়েকদিন বঙ্গ মনে থেকে যায়। সেই হিসেব করেই গতকাল রবীন্দ্রজয়ন্তী পালনের পর আজ সেই ঘরানারই (ঠাকুরবাড়ির প্রিয়) একটি রান্নার গল্প বলব আপনাদের।
সেটা ছিল ১৯৪০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষবারের মতো কালিম্পং গিয়েছিলেন ওই সময়। তাঁর শরীর তখন ভেঙে পড়েছে। কালিম্পংয়ে বেশিদিন থাকতে পারেননি সেবার। উত্তরবঙ্গের পাহাড়ের ভিজে ঠান্ডাটা সহ্য হয়নি তাঁর। তড়িঘড়ি তাঁকে কলকাতায়, জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ফিরিয়ে আনতে হয়। তবে সেখান থেকে একটু সুস্থ হলেই কবির মন চলে যায় শান্তিনিকেতন। অসুস্থ শরীরেও কারও বারণ শোনেননি তিনি। মৃত্যুর মাত্র সপ্তাহদুয়েক আগে শেষবারের মতো তাঁর শান্তিনিকেতন যাওয়ার ব্যবস্থা করতেই হয়েছিল। কয়েক দিনের মধ্যেই অবশ্য অসুস্থতা বেড়ে গেলে আবারও কলকাতাতেই ফিরিয়ে আনতে হয়েছিল তাঁকে। যাই হোক, কালিম্পং থেকে ফিরে সেবার জোড়াসাঁকোয় যখন ছিলেন, অসুস্থ রবীন্দ্রনাথের কিছুই মুখে রুচত না। শরীর রোগে ক্লিষ্ট, খেতে পারেন না ঠিকমতো, সবমিলিয়ে শরীর তাঁর আরও ভেঙে পড়ছিল। এদিকে শহরের ডাক্তাররা পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানোর কথা বললেন। বাড়িতে সকলেরই তখন একই চিন্তা। কী খাওয়ানো হবে কবিকে যা তাঁর মুখে রুচবে। সেই সময় কবির পুত্রবধূ, কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী, প্রতিমা দেবী একটা বিশেষ পদ্ধতিতে রান্না করলেন কচি পাঁঠার ঝোল। গরম ভাত সহযোগে কবিকে পরিবেশন করা হল এই খাবার। ভারি তৃপ্তিভরে নাকি রবীন্দ্রনাথ পুত্রবধূর হাতে রান্না করা মাংসের ঝোল খেয়েছিলেন। শোনা যায় বেঁচে থাকতে কবির স্ত্রী মৃণালিনী দেবীও নাকি এই রান্নাটি বার কয়েক করে খাইয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। ঠাকুরবাড়ির ছোঁয়া সহ বাঙালি এই মাংস রান্নার পদ্ধতিটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল অচিরেই। গ্রীষ্মের দহন দিপ্রহরে মাংসের এই হালকা রান্না অতি উপাদেয়। চলুন সেই পদটিই আপনাদের শিখিয়ে দিই।
পাঁঠার বাংলা
উপকারণ: কচি পাঁঠার মাংস ৫০০ গ্রাম, ৩টে আলু ডুমো করে কাটা, ৩টে পেঁয়াজ বাটা, ২টো পেঁয়াজ চার টুকরো করে কাটা, নুন স্বাদমতো, মিষ্টি সামান্য, সর্ষের তেল কাপ, দই ২৫০ গ্রাম, আদাবাটা ২ চা চামচ, ধনেগুঁড়ো ৩ চা চামচ, কাশ্মীরি লঙ্কা গুঁড়ো ২ চা চামচ, হলুদ গুঁড়ো ১ চা চামচ, গোটা জিরে ২ চা চামচ।
পদ্ধতি: প্রথমেই শুকনো চাটুতে জিরে ভেজে নিন। তারপর তা গুঁড়ো করে নিন। এবার কড়াইতে তেল গরম করে নিন। তারপর তাতে পেঁয়াজ ও আদা বাটা দিয়ে কষিয়ে নিন। বাদামি রং ধরলে হলুদ গুঁড়ো, কাশ্মীরি লঙ্কার গুঁড়ো ও ধনেগুঁড়ো দিয়ে আরও ভাজুন। অল্প জল দিয়ে ফুটতে দিন। জল সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেলে তাতে খানিকটা দই দিন। নেড়েচেড়ে মিশিয়ে আরও একটু জল দিন। ফুটে উঠলে বাকি দই দিয়ে মিশিয়ে দিন। এবার নুন দিয়ে নেড়ে মিশিয়ে নিন। একটু ফুটতে দিন। তারপর মাংস দিয়ে দিন। ভালো করে মশলার সঙ্গে মাংস মিশিয়ে নিন। আলুগুলো দিয়ে দিন। আবারও সবটা একসঙ্গে মেশান। এবার টুকরো করে কেটে রাখা পেঁয়াজ দিয়ে দিন। পরিমাণ মতো গরম জল দিয়ে ঢিমে আঁচে ঢাকা দিয়ে রান্না করুন। ঘণ্টা দুয়েক এইভাবে বসিয়ে রেখে দিন। মাঝেমধ্যে নেড়ে দেবেন। মাংস সেদ্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। তারপর ঢাকা খুলে অল্প চিনি মিশিয়ে দিন। সব শেষে ভাজা জিরের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিন। নেড়ে মিশিয়ে নামিয়ে নিন।