Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

কলম্বাসের আক্ষেপ হয়েই থেকে যাবে কেরলের মুচিরি

কেরল বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নয়নাভিরাম সি বিচ, ব্যাকওয়াটারের দু’পাশে চোখজুড়নো নারকেল গাছের সারি এবং হাউসবোট।

কলম্বাসের আক্ষেপ হয়েই থেকে যাবে কেরলের মুচিরি
  • ১২ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

কেরল বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নয়নাভিরাম সি বিচ, ব্যাকওয়াটারের দু’পাশে চোখজুড়নো নারকেল গাছের সারি এবং হাউসবোট। তবে, এর বাইরেও রয়েছে একটা স্বল্প পরিচিত কেরল। তার গল্প কোনও অংশেই কম বিস্ময়কর নয়। আলেপ্পি, মুন্নারের সৌন্দর্যে ভেসে যাওয়ার পাশাপাশি গন্তব্য তালিকায় রাখুন কোচির অনতিদূরের মুচিরি। ইউরোপীয়রা যেটা মুইজিরিস বলেই চিনত সেকালে।

Advertisement

ইতিহাসবিদদের দাবি, ইতালীয় নাবিক (সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, তিনি স্পেনীয় ছিলেন) ক্রিস্টোফার কলম্বাস ভারতের দক্ষিণে এই অংশেই পৌঁছতে চেয়েছিলেন। মশলার প্রাচুর্যে ভরপুর কেরলের কালিকট বন্দরে ততদিনে পা রেখে ফেলেছেন পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো ডা গামা। এদিকে, কলম্বাস চলে গেলেন উল্টোদিকে। পৌঁছলেন ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে। ‘আবিষ্কার’ হল আমেরিকা মহাদেশ। অর্থাৎ, কলম্বাস যদি ঠিক পথে এগিয়ে মুইজিরিসে পৌঁছতেন, তাহলে বিশ্বরাজনীতি অন্য খাতে বইত! কে বলতে পারে, এখন হয়তো ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবর্তে উত্তর আমেরিকার সর্বময় কর্তা হতেন কোনও রেড ইন্ডিয়ান...!
রাজনীতির প্রসঙ্গ থাক। আসা যাক মুচিরির কথায়। দারচিনি, লবঙ্গ, গোলমরিচের সৌজন্যে বড়সড় বন্দর হয়ে উঠেছিল এই অংশ। সম্প্রতি এমন সব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মিলেছে, তাতে স্পষ্ট, ২০০০ বছর আগেই রীতিমতো কসমোপলিটান এলাকা ছিল এটি। বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল মিশর, পশ্চিম এশিয়া, আরব, পারস্য এমনকী গ্রিস এবং রোমের সঙ্গেও। খননকার্যের পরে ওঠা বিশেষ ধরনের মালার পুঁতি মিশর এবং বিভিন্ন পানীয় এবং ওয়াইন রাখার পাত্র অ্যামপোরার অংশবিশেষ ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যের পরিচয় বহন করে। পারুভুর এবং কোডুঙ্গাল্লুরের পাট্টানাম, কোট্টানাম ফোর্ট প্রভৃতি এলাকায় বর্তমান বসতিকে অক্ষুণ্ণ রেখেই যেভাবে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন এবং মিউজিয়ামের মাধ্যমে সেগুলির সংরক্ষণ হয়েছে, তাও শিক্ষণীয়। অথচ, এত প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন কিন্তু মিলতে শুরু করেছে অতি সম্প্রতিই। ফলে, আরও অনেক চমকপ্রদ তথ্য এখনও উঠে আসা বাকি।
এই এলাকার জন্যই কেরলে বিদেশিরা বারবার পাড়ি দিয়েছে। এখানেই রয়েছে দেশের প্রথম ইহুদি উপাসনালয় কোচাঙ্গাডি সিনাগগ। তা তৈরি হয়েছিল ১৩৪৪ সালে। তার ধ্বংসাবশেষ নয়া সিনাগগের পাশে এখনও সংরক্ষিত। দেশের প্রথম মসজিদ চেরামন জুম্মা মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয় পাঁচের শতকের মাঝামাঝি। সেটি পতুর্গিজরা ধ্বংস করলেও সপ্তদশ শতকে ফের নতুন করে তৈরি হয়। দেশের প্রথম চার্চ প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম শতকে, যিশুখ্রিস্টের মৃত্যুর ৫২ বছর পরে। ত্রিশুরের পাল্লায়ুরে মার থমা মেজর আর্কিপিস্কোপাল চার্চ হিসেবে সেটি পরিচিত। বলা হয়, সেন্ট থমাস নিজে এই চার্চের প্রতিষ্ঠাতা। এছাড়া, গোটা কেরল জুড়েই অজস্র প্রাচীন মন্দির রয়েছে। বিশেষ করে বেশ কিছু শিবমন্দির দু’হাজার বছরেরও বেশ প্রাচীন বলে পরিচিত। ধর্মীয় স্থানগুলির প্রাচীনত্ব যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ণ রাখার চেষ্টাই করেছে কেরল সরকার এবং ভারতীয় পুরাতত্ত্ববিভাগ। একই সঙ্গে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদ দিলে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ ঐতিহাসিকভাবেই যে এখানে মিলেমিশে থাকেন, তা খালি চোখে দেখলেও বোঝা যায়।
প্রকৃতি এবং পরিবেশকে বাঁচিয়ে, পরিচ্ছন্ন রেখে কীভাবে পর্যটনকে উৎসাহ দেওয়া যায়, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে কেরল। বিশেষ করে কুমারাকোম, ভাইকোম, বা এর্নাকুলাম সংলগ্ন বিস্তীর্ণ ব্যাকওয়াটার। পেরিয়ার নদী এতটাই পরিচ্ছন্ন যে চোখ জুড়িয়ে যাবে। ডিজেল দূষণ ঠেকাতে রয়েছে ব্যাটারিচালিত বোট। তার সংখ্যা আরও বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। আর স্থানীয়দের কর্মসংস্থান দেওয়ার জন্য রয়েছে বিশেষ নিয়ম। গাইড হিসেবে তাঁদেরই নিয়োগ করে থাকে বিভিন্ন সংস্থা এবং কেরালা পর্যটন দপ্তর। একেবারে বাড়ির অন্দরমহলে নিয়ে গিয়ে দড়ি পাকানো, মাদুর তৈরি, নারকেলের তাড়ি (স্থানীয় উচ্চারণে টড়ি) তৈরির পদ্ধতি দেখিয়ে দেবেন তাঁরা।
চাষাবাদ এবং মাছ ধরার ক্ষেত্রেও রয়েছে পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা। বর্ষা আসছে। এই সময় কোচি, মুন্নার বা ভাগামন আরও বেশি সুন্দরী হয়ে ওঠে। সবুজে সবুজ পাহাড়ের গা বেয়ে নামতে থাকে অনামী ঝর্ণা। একেবারে ঘরে ঢুকে পড়ে মেঘ। মার্চের বিশেষ সময়ে গেলে অভিজ্ঞতা হতে পারে প্যারাগ্লাইডিংয়ের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার দর্শক হওয়ার। তাছাড়া ঐতিহ্যবাহী বোট রেসের সময়ে গেলে তো জীবনের একটা অনন্য অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবেই। কোথায় কোন সময়ে গেলে তা দেখা যাবে, এর জন্য একটু ইন্টারনেট ঘেঁটে নিলে সুবিধা হবে।
তবে, কেরল ভ্রমণ যে খরচসাপেক্ষ, এই মিথ ভাঙতে চায় কেরল পর্যটন দপ্তর। সেখানকার এক সচিব লিজো বলেন, ইউরোপীয়রা কীভাবে ঘোরেন, ভাবতেই পারবেন না। তাঁরা সরকারি বাস ধরেন, ওয়াটার মেট্রোয় চাপেন, বাইক ভাড়া করে ঘোরেন। থাকার জন্য বেছে নেন হোম স্টে। স্থানীয়দের চেয়েও কম বাজেটে তাঁরা কেরল ভ্রমণ সেরে ফেলেন। তবে, অনেকেই আবার নিরিবিলি কোনও রিসর্ট বা হাউসবোটে থাকতে চান। রেস্ত থাকলে সবরকম সুযোগই রয়েছে। কুমারাকোমের মালাবার আর্কিটেকচারের বিস্তীর্ণ লেকসং বা কোকোনাট লেগুন রিসর্ট বিলাসের অন্যতম সেরা ঠিকানা। তাছাড়াও অনেক রিসর্ট রয়েছে যেগুলি বাজেটের মধ্যেই চলে আসবে আম বাঙালির। ভাগামনে গ্রাসমেয়ারের লোকেশনও দুর্দান্ত।
কেরলে গেলে মশলা, হ্যান্ডমেড চকোলেট কিনবেন বা এলিফ্যান্ট সাফারি করতে যেমন ভুলবেন না, তেমনই বিমানযোগে গেলে ঘুরে দেখতে ভুলবেন না কোচি এয়ারপোর্টটি। বিশ্বের প্রথম ১০০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ চালিত এয়ারপোর্ট এটি। আধুনিকতার সমস্ত পরিকাঠামো থাকলেও এর স্থাপত্যে প্রাচীন মালাবার স্টাইল চোখ টানবেই। এছাড়া রয়েছে মুন্নারের চা বাগান এবং কলকাতার আরপি গোয়েঙ্কা গ্রুপের টি ফ্যাক্টরি। পাতা থেকে কীভাবে বিভিন্ন স্বাদের চা হয়ে ওঠে, তা বোঝানোর জন্য বিশেষজ্ঞদের পাবেন এখানে। মোটামুটি সর্বত্রই লোকজন ইংরেজি তো বটেই, ভাঙা হিন্দিও বোঝেন। গ্রামেগঞ্জে আলাপ চালাতে গেলে অবশ্য সমস্যা। সেক্ষেত্রে গাড়িচালক বা গাইডের সাহায্য নিন। আর নিজে ঘুরতে চাইলে ভাষা সমস্যার সমাধান করতে পারে গুগল ট্রান্সলেটর।
অর্পণ সেনগুপ্ত

সম্পর্কিত সংবাদ