পৃথিবী যতই নেটনির্ভর হয়ে উঠছে ততই বাড়ছে সাইবার ক্রাইম। অনলাইনে কেনাকাটা থেকে জীবনের খুঁটিনাটি শখ-আহ্লাদ মেটাতে অভ্যস্ত আধুনিক প্রজন্ম। ফোনের স্ক্রিনে একটা সূক্ষ্ম টাচ বা মাউসের ক্লিকে আমরা অনেক কিছুই হাসিল করে ফেলছি অনায়াসে। পাশাপাশি এই অনলাইন দুনিয়ার সামান্য ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকে পড়ছে অপরাধীর দল। আমাদের অল্প বেখেয়াল বা সামান্য ভুলের সুযোগ নিয়ে তারাই ঘটাচ্ছে মারাত্মক সব অপরাধ। যার মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ফলে এই প্রযুক্তিনির্ভর দুনিয়ায় সাইবার নিরাপত্তার ভীষণ প্রয়োজন। আপনি কি তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে আগ্রহী? সেই নিয়ে পড়াশোনা করছেন? তাহলে রোজগারের উপায় হিসেবে সাইবার নিরাপত্ত বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠার কথা ভাবতে পারেন।
কেরিয়ার কাউন্সেলর অভিষেক দে সরকার জানালেন, ডিজিটাল সিস্টেম, নেটওয়ার্ক ইত্যাদি আমাদের কাছে এখন খুবই সাধারণ কিছু শব্দ। প্রায় সব সংস্থাই এর সঙ্গে পরিচিত। সাধারণ মানুষও ব্যাঙ্ক বা অন্যত্র এই বিষয়গুলোর মুখোমুখি হন। এর যেমন অনেক সুযোগ সুবিধে আছে, তেমনই অসুবিধেও প্রচুর। যে কোনও সংস্থাই অনেকাংশে মেশিন নির্ভর হয়ে পড়েছে। ফলে ব্যক্তিনির্ভরতা কমে যাচ্ছে। তাতে হয়তো কাজের অনেকটাই সুবিধে হচ্ছে, পৃথিবী উন্নততর হয়ে উঠছে, কিন্তু কিছু সমস্যাও দেখা দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে সাইবার অপরাধীর দল চরম ক্ষতিও করে ফেলতে পারছে। ফলে তা আটকানো দরকার। আর এই ক্ষেত্রেই সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন।
কীভাবে এগবেন?
অভিষেকবাবুর কথায়, এই পেশাটি একাধারে ডিগ্রি এবং অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণ। অর্থাৎ কোনও একটা বিষয় নিয়ে পড়লেন আর এই ধরনের চাকরি পেয়ে গেলেন এমন নয়। পড়াশোনার পাশাপাশি আপনার জ্ঞান, ভালোবাসা, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব সবই এই পেশায় সফল হওয়ার জন্য জরুরি। আপনার যদি জানার ইচ্ছে প্রবল হয়, যে কোনও বিষয় খুঁটিয়ে লক্ষ করার ক্ষমতা থাকে এবং একই সঙ্গে সাইবার দুনিয়া, ইন্টারনেট ইত্যাদি বিষয়ে মোটামুটি ভালো জ্ঞান থাকে তাহলে এই পেশা আপনার জন্য উপযুক্ত।
প্রাথমিকভাবে আইটি বিষয়ে খুব ভালো জ্ঞান থাকা দরকার। তার জন্য নেটওয়ার্কিং, সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ও ডেটাবেস সম্পর্কে খুব ভালো জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। এই বিষয়গুলোর উপর সঠিক দক্ষতা থাকলে সাইবার সিস্টেম ও তার গলদ সহজেই ধরে ফেলা যায়।
এই কাজ করতে সফল হতে গেলে
সিস্টেম হ্যাকিং সম্বন্ধে বিশদে জানা জরুরি। যে কোনও সাইবার সিস্টেম কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সেটা যদি না জানেন তাহলে তা প্রতিরোধ করবেন কীভাবে? ফলে নিজেকেও হ্যাকিং বিষয়ে জানতে হবে। তবে এক্ষেত্রে পেশাগত হ্যাকারদের পোশাকি নাম ‘এথিকাল হ্যাকার’। অর্থাৎ সিস্টেম রক্ষা করার জন্যই তার ফাঁকগুলো সঠিক জানা এবং তা ভাঙার নিয়মগুলো সম্বন্ধে সচেতন থাকা।
হাতেকলমে কাজ এবং সেই মারফত অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ও এই পেশার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়ে।
কোন ধরনের সাইবার অপরাধ সচরাচর ঘটে, কোন ধরনের সাইট বিপজ্জনক ইত্যাদি বিষয়ে ধারণা তৈরি হয়। ফলে সেই অনুযায়ী প্রতিরোধের উপায়গুলোও সহজেই বের করা যায়।
যে কোনও কিছু খুব খুঁটিয়ে বিচার করার প্রবণতা থাকা চাই। মানসিকভাবে খুবই সচেতন ও তীক্ষ্ণ হওয়া দরকার। কারণ সাইবার অপরাধীরা খুব সূক্ষ্মভাবে কাজ করে। সামান্য বেখেয়ালেও বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। ফলে তা রোধ করার জন্যও খুব তীক্ষ্ণ মনোযোগ প্রয়োজন।
হাতেকলমে কাজ
এখন প্রশ্ন হল হাতেকলমে কাজের কেমন সুযোগ পাওয়া সম্ভব? প্রাথমিকভাবে যে কোনও নেটওয়ার্কিং সিস্টেম সম্বন্ধে বিশদ জ্ঞান থাকা দরকার। তা কীভাবে কাজ করে, কোন ধরনের নেটওয়ার্ক কেমন কাজে ব্যবহার করা হয় সেগুলো জানা চাই। তাতে গলদটা কোথায় তা খুঁজে বের করা সহজ হবে। এর জন্য কোনও নামী কোম্পানির ইন্টারনেট বিভাগে ইন্টার্নশিপ করা যেতে পারে। অনেক সংস্থায় পরপর কাজ শিখতে পারলে আরও ভালো। যত গোড়া বা ভিত শক্ত হবে ততই কাজে দক্ষতা বাড়বে।
নেটওয়ার্কিং বা অপারেটিং সিস্টেমগুলো কয়েকটা জিনিস নির্ভর। এগুলোকে বলে টুলস। যেমন ফায়ারওয়াল, ইনট্রুশন ডিটেকশন ও প্রিভেনশন, সিকিউরিটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি। এই টুলগুলো নির্দিষ্ট নিয়মে কাজ করে। সেই বিষয়ে গভীর জ্ঞান থাকা চাই। এইসবই হাতেকলমে কাজ করতে করতে তৈরি হয়। ফলে পড়াশোনা যতই ভালো হোক না কেন, সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক কাজ যদি না করা যায়, তাহলে ধারণা স্পষ্ট হবে না।
পড়াশোনার দিক
এই বিষয়ে কাজ পেতে গেলে যে ধরনের পড়াশোনার করতে হবে তার মধ্যে রয়েছে সাইবার নিরাপত্তা, কম্পিউটার সায়েন্স, ইনফরমেশন টেকনোলজি বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি। এই ডিগ্রি থাকলেই কাজ শুরু করা যায়। এরপর আরও বেশি ডিগ্রি যেমন এই বিষয়গুলোতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বা বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় (স্ট্যাফোর্ড, ওয়ারউইক, ডাইকিন) থেকে এই বিষয় নিয়ে ডিগ্রি থাকলে অবশ্যই কাজ পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।
এছাড়া পেশাদারি কিছু সার্টিফিকেট কোর্স করেও এই ধরনের কাজে যুক্ত হওয়া যায়। তার মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা সার্টিফিকেট কোর্স, এথিকাল হ্যাকিং সার্টিফিকেট কোর্স, ক্লাউড সিকিউরিটি সার্টিফিকেট কোর্স উল্লেখযোগ্য।
এই ধরনের কোর্স অনলাইন করা যেতে পারে। অনেক বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ও অনলাইন সার্টিফিকেট বা ডিপ্লোমা কোর্স করার সুযোগ দেয়। খোঁজখবর নিয়ে সঠিক কোর্সটা নির্বাচন করতে হবে।
চাকরির সুযোগ
একদম শুরুর দিকে ইনফরমেশন সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট, সাইবার সিকিউরিটি টেকনিশিয়ান, সাইবার সিকিউরিটি অ্যানালিস্ট জাতীয় কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া ডিগ্রি বেশি থাকলে আইটি এডিটর, ইনসিডেন্ট রেসপন্স ম্যানেজার, ডেটা প্রোটেকশন অফিসার জাতীয় কাজের সুযোগ পাওয়া যায়। সরকারি ও বেসরকারি দু’রকম সংস্থাতেই এই ধরনের কাজের সুযোগ ক্রমশ বাড়ছে।
কমলিনী চক্রবর্তী