নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা: এগারো জন নীল জর্সি পরে ফুটবল নিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মাঠে। আর তাদের আটকাতে হিমশিম খাচ্ছেন প্রতিপক্ষের ফুটবলাররা। স্টেডিয়ামে নীল জার্সির সমর্থকদের ঢেউ আছড়ে পড়ছে প্রতিপক্ষের ফুটবলারদের মানসিক দৃঢ়তাকে চুরমার করে দিতে। আর হবে নাই বা কেন, কারণ মাঠ দাপাচ্ছে ৪ বারের বিশ্বজয়ী ইতালি। বিশ্ব ফুটবলে যারা পরিচিত ছিল দুর্ভেদ্য রক্ষণের জন্য। কিন্তু বিশ্ব ফুটবলে আজ্জুরিদের সেই গৌরব আজ অন্ধকারের অতলে। ২০১৮, ২০২২ এরপর ২০২৬ বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনেই ব্যর্থ হয়েছে ইতালি।
ইতালির এই পতন পুরো ফুটবল বিশ্বকে রীতিমতো চমকে দিয়েছিল। কিন্তু ইতালির রাস্তায় যখন ফুটবলের শোক, ঠিক তখনই নিঃশব্দে জন্ম নিচ্ছিল এক নতুন স্বপ্নের। নীল জার্সিধারী একঝাঁক তরুণ তখন বুঁদ ছিলেন নতুন স্বপ্ন লিখতে। ব্যাট-বলের বিপ্লব। ফুটবল যখন ইতালিতে ধুঁকছে তখন ব্যাটে-বলে জাদু দেখাচ্ছেন একদল খেলোয়াড়। সেই স্বপ্নই এবার বাস্তবায়িত হতে চলেছে ইতালি থেকে প্রায় ৬০০০ কিলোমিটার দূরে ভারতের মাটিতে। কারণ, সবাইকে চমকে ফুটবলের দেশ ইতালি এবার খেলবে আসন্ন টি-২০ বিশ্বকাপে। আর এই ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে বসেছে এ শহরের নামও। আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি ইডেন গার্ডেন্সে ক্রিকেট বিশ্বকাপে অভিষেক হতে চলেছে আজ্জুরিদের। স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে।
আজ্জুরিদের ক্রিকেটের ইতিহাস কিন্তু নতুন নয়। ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে দেখা যায় ইতালিতে ক্রিকেটের প্রথম উল্লেখ মেলে ১৭৯৩ সালে। নেপলস বন্দরে যাত্রাবিরতির সময় অ্যাডমিরাল নেলসনের নাবিকদের দ্বারা খেলা একটি ম্যাচে। অ্যাডমিরাল নেলসন ছিলেন ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির অফিসার। এর পর ১৯ শতকের শেষের দিকে তৈরি হয় বেশ কয়েকটি সম্মিলিত ক্রিকেট এবং অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল ক্লাব । যার অন্যতম বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব এ.সি. মিলান। মূলত ক্রিকেট এবং ফুটবল খেলার জন্যই মিলান ক্লাব পথ চলা শুরু করেছিল। কিন্তু যত দিন এগিয়েছে ততই ক্রিকেট হারিয়ে গিয়েছে এই ক্লাব থেকে। গুরুত্ব বেড়েছে ফুটবলের। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফের ক্রিকেট শুরু হয় ইতালিতে। ১৯৭০-এর দশকের শেষের দিকে রোমে ক্রিকেট খেলা পুনরায় শুরু হয়। ১৯৮০ সালে তৈরি হয় ডোরিয়া পামফিলি ক্রিকেট ক্লাব। এই ক্লাবটি তৈরি করেন ইতালীয়-শ্রীলঙ্কান ফ্রান্সিস আলফোনসাস জয়রাজা, ইতালীয়-ভারতীয় মাসিমো দা কস্তা, অস্ট্রেলিয়ান ডেসমন্ড ও'গ্র্যাডি এবং সিরিয়ান ইসাম কাহালে।
১৯৮০ সালে তৈরি হয় ইতালীর ক্রিকেট ফেডারেশন। যা পরিচিত ফেডেরাজিওন ক্রিকেট ইতালিয়ানা নামে। আজ্জুরিরা ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেট কাউন্সিলের মান্যতা পায় ১৯৮৪ সালে। ১৯৯৫ সালে আইসিসির অ্যাসোসিয়েট সদস্য হিসাবে উন্নিত হয় ইতালি। এরপর ক্রমশ এগোতে থাকে ইতালির ক্রিকেট যাত্রা। অবশেষে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে অপেক্ষার অবসান, বিশ্বকাপ টি-২০ তে যোগ্যতা অর্জন করে ইতালি।
বিশ্বকাপের ইউরোপিয়ান কোয়ালিফায়ারের ফাইনালে স্কটল্যান্ডকে ১২ রানে হারিয়ে এক নতুন ইতিহাসের সূচনা করেন জো বার্নসরা। দলকে শক্তিশালী করতে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ইতালির সঙ্গে যোগ রয়েছে এমন ক্রিকেটারদের দলে টানেন সে দেশের ক্রিকেট কর্তারা। এই ভাবেই ইতালির সঙ্গে যুক্ত হন অস্ট্রেলিয়া জাতীয় দলের ক্রিকেটার জো বার্নস, দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়েন ম্যাডসেনরা। ওয়েনের নেতৃত্বেই এবার বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে মাঠে নামবেন আজ্জুরিরা।
একদিকে ফুটবলের পুরোনো গৌরব হারানো আর অন্যদিকে ক্রিকেটে নতুন সূর্যের উদয়। ফুটবলে ইতালির এই ব্যর্থতার কারণ হিসেবে বলা হয় নতুন প্রতিভার অভাব এবং স্ট্র্যাটেজিক ভুল সিদ্ধান্তকে। অন্যদিকে, ক্রিকেটে ইতালি তাদের 'হেরিটেজ প্লেয়ার' যাদের পূর্বপুরুষ ইতালিয়ান কিন্তু দেশের বাইরে ক্রিকেট খেলে বড় হয়েছেন এবং স্থানীয় প্রতিভার মেলবন্ধন ঘটিয়ে তৈরি করেছে তাঁদের ক্রিকেট দলকে।
আর কয়েকদিন পরে ভারত এবং শ্রীলঙ্কার মাটিতে যখন ইতালির জাতীয় সংগীত বাজবে, তখন গ্যালারিতে হয়তো ফুটবলের সেই বিষণ্ণ নীল রঙ আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। ফুটবল ভক্তরা হয়ত আফসোস করবেন, আর সেই আফসোস মেটাতেই ক্রিকেটকে সামনে রেখে তৈরি হচ্ছেন জাস্টিন মোস্কা, হ্যারি মানেতি, জসপ্রিত সিংরা। কারণ, ইতালির নতুন প্রজন্ম এখন ব্যাটে-বলে স্বপ্ন দেখছে। ফুটবলের সেই শূন্যস্থান কি ক্রিকেট পূরণ করতে পারবে? সেকথা অবশ্য সময় বলবে। তবে আপাতত ইতালির স্লোগান একটাই- "ফুটবল নেই তো কী হয়েছে, আমরা ক্রিকেটে লড়ব!"