যে জিনিসগুলি বেঁচে থাকার জন্য জরুরি, তার মধ্যে বাসস্থান একটি। বাসস্থান মানে, যেখানে একজন মানুষ এবং তার পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়। সেখানে ঘর তৈরি তো করতেই হয়, ওইসঙ্গে থাকে তাদের বাগবাগিচাও। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান—যে-যুগে বেঁচে থাকার ন্যূনতম উপকরণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল, সে-যুগে ভারতবাসীর প্রধান জীবিকা ছিল কৃষি। খাদ্যসংগ্রহের জন্য শিকার আর একমাত্র উপায় নয়; আর গুহাবাসীও নয় তারা; পরবর্তী ধাপে উত্তরণ ঘটে গিয়েছে মানুষের। ফলে, কিছু কৃষিজমিও বাসস্থানের সংজ্ঞার অন্তর্গত তখন। ফলে জমির উপর মানুষের দখলদারি এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই বাড়তে থাকল। কৌটিল্যের আমলেই ব্যক্তিগত জমির মালিকানা, বিক্রয় বা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চালু ছিল। প্রাচীন রাজারা রাজ্যের এক্তিয়ার বৃদ্ধির জন্য যুদ্ধে লিপ্ত হতেন। জয়ী রাজার রাজত্ব সম্প্রসারিত হতো, অন্যদিকে সংকুচিত হতো পরাজিত রাজার রাজ্যের আয়তন। প্রাচীন রাজারা খাজনার বিনিময়ে প্রজাদের জমি ভোগদখলের অধিকার দিতেন। তাঁরা আবার খুশি হয়ে নিষ্কর জমিও দান করতেন বিশেষ বিশেষ ব্যক্তি বা শ্রেণিকে। মোগল এবং ইংরেজ আমলে জমির দলিল ব্যবস্থা অনেকটাই সংগঠিত রূপ পেয়েছিল। আবার তখন থেকেই শুরু হয়েছিল গরিব, দুর্বল ও অশিক্ষিত মানুষকে ঠকিয়ে জমি কেড়ে নেওয়ার কারবার। এই অপরাধ স্বাধীন ভারতে ব্যাপক আকার নিয়েছে। মালিককে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে কোনও কোনও জমি অন্যের নামে রেজিস্ট্রি, এমনকী মিউটেশন পর্যন্ত করে নেওয়া হয়। জমি সংক্রান্ত জালিয়াতি এমনও ভয়াবহ আকার নেয় যে, একই জমি একইসঙ্গে একাধিক ক্রেতাকে বেচে দেওয়া হয়। জাল দলিল ও পরচা দেখিয়ে একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণগ্রহণের ঘটনাও সামনে আসে। ক্রেতা-বিক্রেতার আধার-প্যান নিয়ে হাজারো কড়াকড়ি সত্ত্বেও জালিয়াতদের দাপাদাপি অব্যাহত।
ফলে সরকারকে ফলপ্রসূ বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতেই হচ্ছে। আর এখানেই মিলেছে সুখবর, জমি-বাড়ি রেজিস্ট্রেশনে বাংলাতেই চালু হচ্ছে ফেস রেকগনিশন ব্যবস্থা এবং তা দেশের মধ্যে প্রথম। জমি-বাড়ি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছতা ও দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করতে উদ্যোগী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। জমি-বাড়ি রেজিস্ট্রেশনে যুক্ত হতে চলেছে ফেস রেকগনিশনের মাধ্যমে ভেরিফিকেশন। এই পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির ক্রেতা, বিক্রেতা ও সাক্ষীর মুখমণ্ডল ‘স্ক্যান’ করা হবে। রেজিস্ট্রি অফিসে আসা বিক্রেতাই সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির প্রকৃত মালিক কি না, তা এই প্রক্রিয়ায় সহজেই যাচাই করা যাবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একটি অ্যাপও আনছে ডিরেক্টরেট অফ রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড স্ট্যাম্প ডিউটি।
ওইসঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরও একটি অনবদ্য উদ্যোগ। জমি-বাড়ির অতীত মালিকানার সব তথ্য মিলবে রাজ্য পোর্টালে, ১৯৮৫ সালের আগের দলিলও খুঁজে দেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর প্রযুক্তি। জমি-বাড়ি কিনতে গেলে প্রথমেই খোঁজ পড়ে চেইন ডিডের। অর্থাৎ, আগে ভালোভাবে জানতে হয়, অতীতে ওই জমি বা বাড়ির মালিকানা কার বা কাদের ছিল এবং কখন কীভাবে মালিকানার বদল হয়েছে। সরকারি তথ্য-ভাণ্ডারে জমিটির অস্তিত্ব আছে কি না, সেটিও জানা জরুরি। এক্ষেত্রে ১৯৮৫ সাল পরবর্তীকালের তথ্য অনলাইনে পাওয়া যায়। কিন্তু তার আগের দলিলসহ তথ্যাদি পেতে দ্বারস্থ হতে হয় রেজিস্ট্রি অফিসের। সেখানে গিয়ে ‘সার্চিং’ রিপোর্ট নিতে হয় মোটা টাকার বিনিময়ে। ব্যাপারটি সময়সাপেক্ষও বটে। অবশেষে শেষ হতে চলেছে এই হয়রানির দিন। কারণ, এবার থেকে জমি-বাড়ির অতীত মালিকানার যাবতীয় তথ্য সংবলিত দলিল (চলতি অর্থে চেইন ডিড) মিলবে মাত্র এক ক্লিকেই! রাজ্য অর্থদপ্তরের আওতাভুক্ত ডিরেক্টরেট অফ রেজিস্ট্রেশন এবং স্ট্যাম্প ডিউটির নির্দিষ্ট পোর্টালেই তা মিলবে। গোটা প্রক্রিয়ায় সাহায্য নেওয়া হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার। ১৯৮৫ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত যত জমি-বাড়ির রেজিস্ট্রেশন হয়েছে, সেই সমস্ত দলিল ডিজিটাইজড করে ফেলেছে রাজ্য। এসব দলিলের ছবি সংরক্ষিত রয়েছে রাজ্যের অনলাইন তথ্য-ভাণ্ডারে। এবার ১৯৮৫ পূর্ববর্তী দলিলগুলি ডিজিটাইজেশনের পালা। কাজটি হবে দুটি ধাপে—১৯৭০-১৯৮৫ এবং ১৯৭০ পূর্ব। এখানেই থাকবে এআই-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। জরাজীর্ণ দলিলেরও পাঠোদ্ধার করে দেবে এই প্রযুক্তি। জমির খতিয়ান বা দাগ নম্বরের নির্ভুল তথ্যাদি পেতে এটি অবশ্যই বড় ভরসা হতে চলেছে। এই ব্যাপারে প্রুফ অফ কনসেপ্ট তৈরির জন্য ইতিমধ্যেই দরপত্র আহ্বান করেছে রাজ্য। দেশের বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে আমেরিকা, ইউরোপ এবং সিঙ্গাপুরের একাধিক সংস্থা। রাজ্যবাসী এই প্রশংসনীয় উদ্যোগের সাফল্যের দিকে চেয়ে থাকবে। জমি-বাড়ির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর স্থাবর সম্পত্তির হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা ফেরাতে এই উদ্যোগ পথ দেখাবে সারা দেশকেই।