Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

ঐরাবতের গ্রামে

ছেলেবেলাতে আমাদের মফস্‌সল শহরে সার্কাসের তাঁবু পড়ত। তখনও সার্কাসে বন্য প্রাণীদের নিয়ে খেলা দেখানো এ দেশে নিষিদ্ধ হয়নি।

ঐরাবতের গ্রামে
  • ৮ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মেখে: কী সুন্দর মায়াময় এই বিশাল পৃথিবী! সুনীল সাগর থেকে উত্তুঙ্গ পর্বতমালা, ঊষর মরুভূমি থেকে গহীন অরণ্য, গগনচুম্বী অট্টালিকার নগরী থেকে প্রাচীন জনপদ—সর্বত্রই ছড়িয়ে রয়েছে অপার সৌন্দর্য। তারই সন্ধানে ছুটে ঩বেড়ায় ভ্রমণ পিয়াসী মন। তাই তো পাখির ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মেখে উড়ে চলা।  দলবদ্ধভাবে কিংবা একা।

Advertisement

 

হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত: ছেলেবেলাতে আমাদের মফস্‌সল শহরে সার্কাসের তাঁবু পড়ত। তখনও সার্কাসে বন্য প্রাণীদের নিয়ে খেলা দেখানো এ দেশে নিষিদ্ধ হয়নি। বাঘ-সিংহর পাশাপাশি আমাদের ছোটদের কাছে অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল সার্কাসের হাতি। কী বিশাল বিশাল সব প্রাণী! কী বুদ্ধি তাদের, কত মজার মজার খেলা দেখাত তারা! ফুটবল খেলা, শুঁড় দিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে সংখ্যা লেখা, হাঁটু মুড়ে বিশাল বিশাল টুলের ওপর মানুষের ঢঙে বসা, আরও কত কী! যখন তাদের খেলা থাকত না, তখন তাদের বেঁধে রাখা হতো তাঁবুর বাইরে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা প্রায় নিয়ম করে সার্কাসের তাঁবুর বাইরে ভিড় জমাত হাতি দেখার জন্য। কখনও কখনও হাতিগুলোকে আবার দিনের বেলায় মাহুতের দল বাড়তি উপার্জনের আশায় তাঁবুর আশপাশের পাড়া-মহল্লায় নিয়ে বেরত। পাড়ায় পাড়ায় গৃহস্থ বাড়ির সামনে এসে হাজির হতো তারা। যে যার সাধ্য মতো কলা, নারকেল অথবা পয়সা বাড়িয়ে দিত তাদের দিকে। খাবার, পয়সা নিয়ে বিশাল প্রাণীগুলো যখন শুঁড় তুলে প্রণাম জানাত তখন খুব আনন্দ হতো আমাদের। যতদূর মনে পড়ে আমার প্রথম হস্তী দর্শন এভাবেই।
তবে শুধু আফ্রিকা নয়, আমাদের প্রতিবেশী দ্বীপরাষ্ট সিংহল বা অধুনা শ্রীলঙ্কাকে হাতির দেশ বললে অত্যুক্তি হয় না। এশিয়া মহাদেশের মধ্যে এদেশে হাতির ঘনত্ব সর্বাধিক। দেশটা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দেশ। হাতি বৌদ্ধ ধর্মের প্রতীকও বটে। প্রকৃত শিলালিপিতে বুদ্ধকে কস্তুরী হাতি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর সেই প্রাচীন বৌদ্ধ কাহিনি তো অনেকেরই জানা। একদিন কপিলাবস্তুর রানি মায়াদেবী স্বপ্ন দেখলেন এক শ্বেত হস্তী তাঁর পালঙ্কের পাশে এসে দাঁড়াল। তার শুঁড়ে একটি শ্বেত পদ্ম। হাতিটি তিনবার তাঁর শয্যা প্রদক্ষিণ করার পর তাঁর গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সেই রাতের পরই রাজবৈদ্যরা তাঁকে জানান যে, তিনি গর্ভবতী হয়েছেন। তাঁর স্বপ্নের এই ছবি নানান প্রাচীন ভাস্কর্যে দেখা যায়। জাতক কাহিনির একটিতে বুদ্ধকে ‘ছদান্ত’ অর্থাৎ ছয় দাঁতওলা হাতি হিসাবেও উল্লেখ করা হয়েছে। অশোকের একটি শিলালিপিতে ‘গজতমে’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। যে অশোক একদিন এই সিংহল দ্বীপে তাঁর পুত্র মহেন্দ্রকে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য পাঠিয়েছিলেন। এবং লোক কথা অনুসারে মহেন্দ্র তাঁর সঙ্গে বেশ কিছু হাতিও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতীক হিসাবে এদেশে এনেছিলেন সিংহলের রাজা ও ভূস্বামীদের উপহার দেওয়ার জন্য। তাই এ দেশটা শুধু হাতির বাসভূমি বলেই নয়, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কারণেও লঙ্কা দ্বীপের মানুষের সঙ্গে এই বিশালাকৃতির প্রাণীটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। সিংহলের বা শ্রীলঙ্কার জাতীয় পতাকাতে তরবারি হাতে স্বর্ণ সিংহ আঁকা থাকলেও নানান চিত্রে ভাস্কর্যে, মঠ-মন্দিরে হাতির ছবি প্রায়শই চোখে পড়ে। কলম্বো এয়ারপোর্টে নামলেও একই চিত্র দেখা যায়।
বহু বিদেশি পর্যটক এই দ্বীপ রাষ্ট্রে আসেন শুধুমাত্র এশীয় হাতি দেখার জন্য। ঠিক যেমন তাঁরা মাউন্ট কিলোমাঞ্জারের পাদদেশে ছুটে যান আফ্রিকান হাতি দেখার জন্য। শ্রীলঙ্কার উদাত্তয়ালাওয়ে, ইয়ালা, লুনুগামভেহেরা, উইলপাটু আর সিনোরিয়া—এই চারটি অভয়ারণ্য বুনো হাতি দেখার জন্য আদর্শ স্থান। আর যে সব পর্যটক নানা কারণে সে সব স্থানে যেতে পারেন না, অথবা খুব কাছ থেকে হাতি দেখতে চান, তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানতে চান, এমনকী তাদের স্পর্শ নিতে চান তাঁদের জন্য আদর্শ স্থান হল শ্রীলঙ্কার শৈলশহর ক্যান্ডির পাদদেশে হাতির গ্রাম বলে অবিহিত পিলাওয়ালা বা পিন্নাওয়ালা এলিফ্যান্ট অরফানেজ। শ্রীলঙ্কা সরকারের হাতিদের অনাথ আশ্রম। আমার গন্তব্য শ্রীলঙ্কার হাতিগ্রাম পিন্নাওয়ালা।
মার্চ মাসের মাঝামাঝি শ্রীলঙ্কার আবহাওয়া মোটামুটি কলকাতারই মতো। তবে দেশটা সমুদ্র ঘেরা বলে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়। বিশেষত কলম্বো ও ক্যান্ডি পার্বত্য অঞ্চলে। কলম্বো শহর থেকে ক্যান্ডি যাওয়ার পথে পিন্নাওয়ালার দূরত্ব একশো কিলোমিটারের কাছাকাছি। গাড়িতে সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা মতো। কলম্বোর হোটেল থেকে ঝলমলে রৌদ্রের গন্ধ মাখা সকালে একটা ছোট গাড়িতে যাত্রা শুরু করলাম। প্রথমে পিন্নাওয়ালা দেখে তারপর ক্যান্ডির বিখ্যাত বুদ্ধ মন্দিরে যাব। হোটেল থেকে বেরবার পর সমুদ্রের গায়ের রাস্তা বরাবর চলতে শুরু করল গাড়ি। পথের বাঁ পাশে সিংহল সমুদ্রর নীল জলরাশি আর ডান পাশে কলম্বো শহরের ঘরবাড়ি। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম কলম্বো-ক্যান্ডি হাইওয়ের টোল প্লাজাতে। এখানকার টোল প্লাজার ব্যবস্থা আমাদের দেশের থেকে খানিকটা আলাদা। হাইওয়েতে প্রবেশের মুখে টোল প্লাজা থেকে প্রথমে রশিদ নিতে হয়। আর টোল ট্যাক্সের টাকা দিতে হয় সে রাস্তা শেষে বেরনোর মুখের টোল প্লাজায়। মসৃণ রাস্তা। মাথার ওপর নীল আকাশ আর পথের দু’পাশে কিছুটা তফাতে নারকেল বাগান। এদেশের নারকেল আকারে বেশ বড় হয়। হাইওয়েতে ওঠার কিছুক্ষণ পর সিংহলি চালক কাকে যেন ফোন করে স্থানীয় ভাষায় কী সব কথাবার্তা বলল। তারপর ফোন রেখে আমাকে জানাল—‘স্যার, একজন আমাকে জানাল, পিন্নাওয়ালা এলিফ্যান্ট অরফ্যানেজ আজ বন্ধ। আজ সেখানে সাপ্তাহিক ছুটির দিন।’
কথাটা শুনে আমি তাকে জিজ্ঞাস করলাম, ‘তবে কি পিন্নাওয়ালাতে গিয়ে হাতি দেখা হবে না আমার?’
সে আমাকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘কেন হবে না স্যার? পিন্নাওয়ালা তো হাতিদেরই গ্রাম। আরও বেশ কয়েকটা এলিফ্যান্ট অরফ্যানেজ, এলিফ্যান্ট রিসর্ট আছে ওখানে। তার একটাতে আপনাকে 
নিয়ে যাব।’
কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ে গেল কোনও একটা ট্রাভেল ব্লগে যেন দেখেছিলাম, গাড়ির ড্রাইভাররা নাকি নানা ছলছুতো করে ট্যুরিস্টদের পিন্নাওয়ালার বেসরকারি এলিফ্যান্ট হোমগুলোতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তাতে ড্রাইভারদের কমিশন থাকে। কথাটা মাথায় আসতেই মোবাইল ফোন ঘেঁটে পিন্নাওয়ালার সরকারি অরফানেজের ওয়েব সাইটে প্রবেশ করে দেখলাম সে জায়গা আজ দিব্যি খোলা। সেখানে নদীতে হাতি স্নান দেখার জন্য এদিনের অনলাইন টিকিট কাটাও যাচ্ছে! তবে, তার সঙ্গে ঝগড়ায় না গিয়ে বললাম, ‘বন্ধ হোক বা খোলা। পিন্নাওয়ালার যে সরকারি জায়গাতে আমার যাওয়ার কথা আমি সেখানেই প্রথমে যাব।’ কথাটা শুনেই গাড়ির চালক কেমন যেন বিমর্ষ হয়ে গেল, তারপর চুপচাপ গাড়ি চালাতে লাগল। হাইওয়ে অতিক্রম করতে এক ঘণ্টার মতো সময় লাগল আমাদের। তারপর জনবসতিতে প্রবেশ করলাম। বড় জনপদ নয়, ছোট ছোট সব লোকালয়। রাস্তার পাশে দোকানে বিক্রি হচ্ছে বিশাল নারকেলের কাঁদি, কোথাও বিক্রি হচ্ছে নারকেলের দড়িতে বোনা বা নারকেল গাছ থেকে তৈরি নানা ধরনের জিনিস। আরও কিছুটা পথ এগবার পর দূরে সার সার নারকেল গাছের মাথার ওপর ধীরে ধীরে ভেসে উঠতে লাগল পাহাড়ের সারি। সেদিকেই এগিয়ে চললাম আমরা। ক্রমশ আমাদের চারপাশ ঘিরে ধরতে শুরু করল সবুজ পাহাড়েরা। পাকদণ্ডী রেখে উঠতে শুরু করল গাড়ি। পাহাড়ের গায়ে নারকেল গাছ তো আছেই, তাছাড়া আছে আরও নানা ধরনের গাছ। পাখির দল উড়ে বেড়াচ্ছে তাদের মাথায়। পাখি তো বড় ভালোবাসার, আদরের প্রাণী শ্রীলঙ্কার মানুষের কাছে। খেয়াল করে দেখেছি শ্রীলঙ্কার কাগজের টাকাগুলোয় কোনও না কোনও পাখির ছবি রয়েছে। নয়নাভিরাম সবুজ পাকদণ্ডীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে খানিকটা ওপরে ওঠার পর হাতির ছবি আঁকা একটা সাইন বোর্ড চোখে পড়ল। তাতে লেখা ‘ওয়েলকাম টু পিন্নাওয়ালা এলিফ্যান্ট ভিলেজ।’
হাতির গ্রাম পিন্নাওয়ালা পাহাড়ের ঢালে অবস্থিত। যাত্রা পথে চোখে পড়ছে কাঠের তৈরি ঢালু ছাদওয়ালা ঘর-বাড়ি। বেশ কিছু রিসর্ট— হাতিদের বাসস্থানের প্রবেশদ্বার। তাদের নাম ফলকের সঙ্গে আছে হাতিদের ছবি, তাদের স্থানের দৃশ্য। তেমনই এক রিসর্টের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার কানে এল একটা শব্দ। বৃংহতি—হাতির ডাক। যে শব্দ সার্কাসের তাঁবুর গায়ে প্রথম শুনেছিলাম। শুনেছি মাউন্ট কিলিমাঞ্জারেলোর পাদদেশেও। তাদের প্রাচীর ঘেরা আবাস স্থল বাইরে থেকে দেখা না গেলেও এটা যে তাদের আবাসস্থল ওই শব্দের মাধ্যমে জানান দিচ্ছে তারা। যে ডাক শুনে ছেলেবেলার মতোই আনন্দ অনুভূতি হল আমার। পাহাড়ি নদীর ওপর একটা সাঁকো পেরলাম আমরা। নদীর নাম ওয়া। এই ওয়া নদীতেই পিন্নাওয়ালার হাতিদের জলকেলি দেখতে ছুটে আসেন দেশ বিদেশের পর্যটক-ফোটোগ্রাফাররা। কয়েকটা বাঁক অতিক্রম করে সামনে পড়ল ছবিতে দেখা একটা জায়গা। পাহাড়ের একটা অংশ যেখানে যাত্রা পথের মাথার ওপর আচ্ছাদন রচনা করেছে। তার নীচ দিয়ে রাস্তা, দেখতে অনেকটা তোরণের মতো। সেই তোরণ অতিক্রম করে কিছুটা এগিয়েই পৌঁছে গেলাম আমার গন্তব্যে পিন্নাওয়ালা এলিফ্যান্ট অরফানেজের সামনে। জায়গাটা বেশ জমজমাট। অরফানেজের ঠিক উল্টো দিকে একটা রাস্তা আছে। ও রাস্তার ছবি ট্রাভেল ভগ্লকে দেখেছি আমি। ও পথেই হাতিদের স্নান করতে নিয়ে যাওয়া হয় নদীতে। তবে ও পথে প্রবেশ করতে হলে হাতিদের জলক্রীড়া দেখার জন্য টিকিট লাগে। আমার ঘড়িতে সাড়ে বারোটা বাজে। হাতিদের দুটো ভাগে ভাগ করে বেলা দশটা আর দুপুর দেড়টা-দুটো নাগাদ স্নান করতে নিয়ে যাওয়া হয়। ঋতু পরিবর্তন হলে সময়েরও কিছু পরিবর্তন হয়। 
সুদৃশ্য তোরণ অতিক্রম করে ভিতরে প্রবেশ করলেই টিকিট ঘর। সার্ক গোষ্ঠীভুক্ত দেশগুলোর জন্য টিকিটের মূল্য কম। এ জায়গাতে ডিসপ্লে করা আছে পিন্নাওয়ালার সরকারি হস্তী অনাথালয় সম্পর্কে নানান তথ্য। প্রাথমিক অবস্থায় এই অনাথালয় ব্যক্তিগত উদ্যাগে প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৭৫ সালে শ্রীলঙ্কার বন্যপ্রাণী বিভাগ একে অধিগ্রহণ করে। পরিত্যক্ত বা দলছুট হস্তী শাবকদের এখানে আশ্রয় দেওয়া হয়, বড় করে তোলা হয়। কেউ কেউ তাদের ব্যক্তিগত হস্তীশাবকদের প্রতিপালিত না করতে পেরে তাদের তুলে দিয়েছে এই প্রতিষ্ঠানে। একসময় যে হাতিদের এখানে শিশু অবস্থায় আনা হয়েছিল এখন তাদের অনেকেই প্রাপ্তবয়স্ক। তাদেরই একজন, সুরঙ্গী নামের এক হস্তিনী। কয়েক বছর আগে এখানে যমজ বাচ্চা প্রসব করেছে। যা অতি বিরল ঘটনা। মূল প্রাঙ্গণে প্রবেশ করার আগে টুক করে ঢুকে পড়লাম স্যুভেনির শপে। এখানে কিছু অদ্ভুত জিনিস পাওয়া যায়। তাহল হাতির গোবরকে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাগজে রূপান্তর করে তা দিয়ে বানানো খাতা বা ডায়েরি এবং ওই কাগজের মণ্ড দিয়ে বানানো হাতির মূর্তি।
ভিতরে জায়গাটা বেশ কয়েক একর হবে। পাহাড়ের ধাপে অবস্থিত বলে জায়গাটা উঁচু-নিচু। সিঁড়ি বেয়ে পৌঁছে গেলাম এলিফ্যান্ট অবজারভেশন শেডে। সেখানে দেশ-বিদেশের পর্যটকদের ভিড়। রেলিং-এর কিছুটা ওপাশে উন্মুক্ত স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাতির দল। নানা আকৃতির হাতি। তারা কেউ একে অপরের গায়ে শুঁড় বুলিয়ে দিচ্ছে, কেউ খেলা করছে, কেউ বা স্নান করতে যাওয়ার আগে শুঁড় দিয়ে ধুলো তুলে নিয়ে সারা অঙ্গে মাখছে। চারপাশে শুধু হাতি আর হাতি! তাদের ছবি তুলছেন পর্যটকরা। কিছুক্ষণ সে জায়গা দেখার পর আশপাশের জায়গাগুলো ঘুরে দেখতে লাগলাম। বেশ কিছু দানব পুরুষ হাতিকে শিকল বন্দি অবস্থায় রাখা আছে। আবার পর্যটকদের জন্য হাতিদের খাবার দেওয়ার ব্যবস্থাও আছে। কাঠের তৈরি উঁচু মঞ্চ থেকে খাবার বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে আর বাচ্চা হাতিরা শুঁড় বাড়িয়ে খাবার সংগ্রহ করছে। এসব দেখতে দেখতে বেশ খানিকটা সময় অতিবাহিত হয়ে গেল আর তারপরই হঠাৎই যেন সূর্যের আলো কমে এল। দেখলাম কোথা থেকে যেন মেঘের দল এসে উপস্থিত হয়েছে আকাশের বুকে। জলভরা কালো মেঘ। বৃষ্টি নামবে। আর এরপরই দেখলাম কিপার বা মাহুতের দল হাতিদের স্নান করাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি শুরু করেছে। আমিও এবার সেখানে যাব বলে পা বাড়ালাম। পিন্নাওয়ালার প্রবেশ তোরণের বাইরে বেরিয়ে কিছুটা হেঁটে সেখানে পৌঁছতে হয়।
হস্তী স্নান দর্শনের জন্য জায়গাটা পাথুরে। রেলিং ঘেরা যে জায়গায় পর্যটকরা সেই স্নান দেখার জন্য অপেক্ষা করছেন তার সামনে দিয়ে ঢালু পথ নেমে গিয়েছে পঁচিশ-তিরিশ ফুট নীচে ওয়া নদীর বুকে। বেশ চওড়া নদী। মাঝে মাঝে তার বুকে জেগে আছে পাথর খণ্ড। নদীর দু’পাশে সবুজ পাহাড়। আমিও গিয়ে খাদের গায়ের রেলিং ধরে দাঁড়ালাম উৎসাহী পর্যটকদের সঙ্গে। কিছুক্ষণের মধ্যে শোরগোল শোনা যেতে লাগল তারা আসছে! হ্যাঁ, এসে পড়ল তারা। বিশাল বিশাল সব হাতির দল, আর তাদের পাশে ছুটতে ছুটতে আসছে মাহুতেরা। কান আর শুঁড় দোলাতে দোলাতে কোন কিছু ভ্রূক্ষেপ না করে, পদভারে চারপাশের মাটি কাঁপিয়ে তারা সোজা নেমে যেতে লাগল ওয়া নদীতে। কেউ কেউ নদীতে নেমেই শুয়ে পড়ল, কেউ আবার শুঁড় দিয়ে জল ছিটাতে লাগল নিজেদের অঙ্গে। কিছু হস্তী শাবক আবার স্নান করতে চায় না। 
বয়সে তারা ছোট হলেও তাদের বিরাট কলেবর। ওপর থেকে হোস পাইপে জল ছিটিয়ে দেওয়া শুরু হল জলে ডুব দিতে না চাওয়া হস্তী শাবকদের গায়ে। কয়েকজন মাহুতও জলে নেমে পড়ল নারকেলের খোল বা মালা দিয়ে হাতিদের পিঠ পরিষ্কার করার জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেঘ ঢেকে দিল সূর্যকে। তারপর ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি নামল। বৃষ্টি নামতেই যেন হাতিদের শুঁড়গুলো আনন্দে নেচে উঠল। বৃষ্টি যত বাড়তে লাগল হস্তীকুলের উচ্ছ্বাস তত বাড়তে লাগল। দু’পাশে পাহাড়ের রং গাঢ় সবুজ, আর তাদের ছায়া পড়ে মোয়া নদীর জলও সবুজ বর্ণ ধারণ করেছে। মাথার ওপর উন্মুক্ত আকাশ থেকে ঝমঝম করে বৃষ্টি ঝরে পড়ছে ওয়া নদীর বুকে। যেখানে বন্ধনহীন উন্মুক্ত পরিবেশে আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠেছে বিশাল বিশাল হাতির দল। হঠাৎ একসময় খেয়াল করলাম আমি আর আমার আশপাশের পর্যটকরাও, বৃষ্টির জল আর মহামাতঙ্গদের জলক্রীড়া, আনন্দ উৎসব দেখে তাদেরই মতো অনধিক আনন্দে সিক্ত হয়ে 
উঠেছি। পিন্নাওয়ালা ওয়া নদীর বুকে দেখা এ এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।  

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ