Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রবিবার

পরিপ্রেক্ষিত

খেলাটা বেশ জমে উঠেছে। জানলার ফাঁক দিয়ে সুন্দরী রমণীর কমনীয় হাত প্রসারিত হচ্ছে শুধু। এক-আধখানা নয়, গোটা ছয়েক হাত।

পরিপ্রেক্ষিত
  • ১১ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুকুমার রুজ: খেলাটা বেশ জমে উঠেছে। জানলার ফাঁক দিয়ে সুন্দরী রমণীর কমনীয় হাত প্রসারিত হচ্ছে শুধু। এক-আধখানা নয়, গোটা ছয়েক হাত। হস্ত-ধারিণীগণ যবনিকার অন্তরালে। অন্তরাল থেকে প্রমিলা বাহিনীর কলস্বরে ঝংকার— খুঁজে নিন মেজ-জামাইবাবু, মেজদি’র হাতখানা। ভুল হাত ধরলেই একশো টাকা জরিমানা।

Advertisement

এ কী! সব হাতই যে একরকম। চেনার জো নেই। সব আঙুলেই একই রঙের নেলপলিশ। চুড়ি, আংটি, শাঁখা, পলাগুলোও খুলে রেখেছে পাজির দল। ন্যাড়ান্যাড়া ছ’টা হাতের মধ্যে কোনটা বউয়ের? এ তো বেশ ফাঁপরে পড়া গেল। মেজ জামাইবাবুটিকে বেশ হতাশ মনে হয়। কিন্তু যে কোনও একটা হাত না ধরেও নিস্তার নেই। ভেতর থেকে হুমকি— টাকা খসার ভয়ে হাত না খুঁজে পিঠটান দিলে পেটে টান পড়বে বলে দিচ্ছি। এ হাতের সেবা থেকে এক সপ্তাহ বঞ্চিত হতে হবে।
কী আর উপায়! একখানা হাত ধরতেই হয়। সঙ্গে সঙ্গে ছাতারে পাখির ক্যাঁচক্যাচানি— ছি ছি ছি জামাইবাবু! শেষে কিনা আমার ননদের হাতটাই পছন্দ হল? অ্যাঁ! মনে মনে এইসব! দিদি, নজর রাখিস। হাত ছাড়ুন, আর একশো টাকা ছাড়ুন। পর স্ত্রীর হাত ধরার জরিমানা।
শুধু কি জরিমানা! তার সঙ্গে ভর্ৎসনা— ছ্যা-ছ্যা-ছ্যা জামাইবাবু। অগ্নিসাক্ষী করে যদিদং-তদিদং মন্তর-টন্তর পড়ে যে-হাত হাতে নিয়েছেন, কয়েক বছর ধরে যে-হাতের সেবা নিচ্ছেন; এখনও সেই হাতটাই চিনে উঠতে পারলেন না। গোটা দিদিকে চিনতে তো এ জম্মটা কাবার হয়ে যাবে!
শুধু মেজ নয়, বড়, সেজ, ছোট সব বাবুরই এক দশা। ‘বাঁশ বনে ডোম কানা’ বলে না; এ হয়েছে সেই দশা। কেউ কেউ জিদে পড়ে চার-পাঁচশো অবধি গচ্ছা দিয়েছে। সব জামাই ভাবছে, এ তো বেশ ‘লেজে-গোবরে’ হয়ে গেলাম। ফাজিল মেয়েগুলোর কাছে কী করে প্রেস্টিজ বাঁচানো যায়?
ছোট-জামাই গোঁফ চুলকে বলে, আমরা তো তোমাদের চাঁদমুখের দিকে তাকাই সুন্দরী। হাতফাত দেখার সময় কোথায়?
কয়েক পলক চুপচাপ। তারপর ছোট শ্যালিকার চ্যালেঞ্জ-অ্যাকসেপ্টিং গলা— ঠিক হ্যায়। সবসময় যখন মুখ দেখেন, নিশ্চয় মুখের উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ নাকটাও চোখে পড়ে। জানলার পর্দার ফাঁক দিয়ে এবার শুধুমাত্র নাক বেরবে। চিনতে পারলে একশো ফেরত, না পারলে দু’শো ফাইন। রাজি?
বড় জামাইবাবু মুখ খোলে— ঠিক আছে রাজি।
সব জামাইবাবুই রাজি। ভাবে, যদি অন্তত একশো টাকা উশুল হয়।
মিনিট তিনেক পর নাক প্রদর্শন। দুটো পর্দার মাঝখানে ছ’-ছ’টা নাক। নথ খোলা, নাকের টাব খোলা সব নাকই এক। বড় জামাইবাবু ভেবেছিল, গিন্নির নাকটা তো বসা। ঠিক চিনে নেব। ও বাবা! কোথায় খাঁদা নাক? সবই যেন এক। নাকের আশপাশের জায়গাগুলো দেখা গেলে খাঁদা-বোঁচা যেত বোঝা।
জামাইবাবুদের মানিব্যাগ ক্রমশ হালকা হচ্ছে। ওরা আর মজা পাচ্ছে না। বড় জামাইবাবু তো গজরাতে শুরু করেছে— কার মাথা থেকে বেরল?
মেজ বলল— নিশ্চয় ওই মিটমিটে শয়তান ছোটশালির বুদ্ধি।
ছোট বলে— যাই বলুন দাদা। ব্যাপারটা নিয়ে কিন্তু ভাবার আছে। আমরা সবাই সবাইকে চিনি, আবার কেউ কাউকে চিনি না।
সে আবার কী?
হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। একজনের চোখমুখের গড়ন, সাজপোশাক, আচার-আচরণ এসব দেখে চেনা যায়। আংশিক কিছু দেখে যে চেনা যায় না তার প্রমাণ তো মানিব্যাগেই। এককথায় বলতে গেলে পার্সপেক্টিভ অর্থাৎ পরিপ্রেক্ষিত থেকেই একজনকে অন্যের থেকে আলাদা করা যায়।
ঘরের ভেতর থেকে ছোট শ্যালিকার আস্ফালন— কী গো! তুমি বিয়ে বাড়িতে এসেও দর্শনের ক্লাস নেওয়া শুরু করলে নাকি? আমি বাধ্য হয়ে মাঝেসাঝে তোমার ছাত্রী হই, বেচারা জামাইবাবুরা তোমার ছাত্র হতে যাবে কোন দুঃখে?
মেজ-জামাই হাঁক পাড়ে— এই যে মিসেস তুবড়ি। তুমি থামবে? ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং। বল তো ভায়া কী বলছিলে।
এই বড়দার কথাই ধরা যাক; আমরা বড়দাকে দেখতে অভ্যস্ত ধুতি-পাঞ্জাবিতে। আর মুখে সবসময় পান। এখন এই ভিড়ভাট্টা বিয়ে বাড়িতে বড়দা যদি কাউকে কিছু না জানিয়ে, কোট-প্যান্ট-টাই টুপি মাথায়, চুরুট ধরিয়ে আমাদের সামনে দিয়ে হেঁটে যায়, আমরা কি বড়দাকে চট করে চিনতে পারব?
বাঃ! বা-বা-বা-বাঃ! বেশ বলেছ তো!— খুশির আতিশয্যে গাবদাগোবদা বড় জামাইয়ের মুখের কষ বেয়ে পানের পিক গড়ায়।
ইতিমধ্যে ঘরের প্রমীলা বাহিনীও বেরিয়ে এসে ছোট জামাইয়ের মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে গেছে। শুধু তুবড়ি কর্তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছে, তার এই মজার খেলা উদ্ভাবনের গূঢ় রহস্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে।
ছোট-জামাইয়ের কথা শুনে বড়দি বলে ওঠে— ও যতই কোট প্যান্ট পরুক, আমি ঠিক চিনে ফেলব। বারো বছর ধরে ওকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনেছি।
মেজ-জামাই ফুট কাটে— দিদি! জামাইবাবুর হাড় ছাড়া আর কোন জিনিসটা আপনার বেশি চেনা?
সবাই হো-হো করে হেসে ওঠে। এমন সময় বাড়ির চাকর মানিক এসে হাউমাউ করে বলে— বড়দিমণি, জামাইবাবু, আপনারা একেনে বসে হাসি-তামাশা কচ্চো; ওদিকে ঝিমিকে কখন থেকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে নাকো। কত্তা-মা কান্নাকাটি কত্তে লেগেছে। শিগগিরি এসো।
কয়েক মুহূর্ত শব্দহীন। মানিকের কথাগুলো মগজে বসতে একটু সময় নেয় বোধহয়। নীরবতা ভাঙে নাকি সুরে বড়দির হাহাকার— ওগো আমার মেয়ে কোথায় গেল গো, এই তো একটু আগে নীল জামা পরে ঘুরছিল আর কাঠি-লজেন চুষছিল গো...।
শ্যালিকা-জামাইবাবুদের মজার খেলা পণ্ড হয়ে যায়। এখন সবারই চিন্তান্বিত মুখ। পুরো বিয়ে বাড়ি তোলপাড়। সব বাচ্চা আছে শুধু তিন বছরের ঝিমি নেই। বড় মেয়ে রিমি অহেতুক মায়ের বকুনি খায়— সারাটা দিন ধিঙ্গিপনা! বোনকে একটু খেয়াল রাখতেও পার না? আর কোনওদিন যদি নিয়ে আসি তোমাদের।
রিমি মাকে কিছু বলতে চেষ্টা করে— আমি তো, আমি তো বোনকে...।
মা ওর কথা কানে তোলে না। গানে একটা থাপ্পড় কষিয়ে দেয়— আবার মুখের ওপর কথা। খুঁজে নিয়ে আয় আমার সোনামান্তুকে। ওগো আমার এ কী হল গো...।
মায়ের সুরটানা কান্নার সঙ্গে মেয়ের ফোঁসফোঁসানি মিশে যায়। দশ বছরের রিমি লজ্জা ও কান্না ঢাকতে ছোটে ঘরের কোণে।
এদিকে সমস্ত ঘর, ছাদ, কুয়োতলা, কুয়োর জল, খড়ের পালার তলা, কোথাও ঝিমি নেই। বাড়ির বাইরে খোঁজাখুঁঝি শুরু হয়েছে। রাস্তায় আশপাশের বাড়িতে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে— ওগো! নীল ফ্রক পরা বছর তিনেকের ফুটফুটে একটা মেয়েকে দেখেছ কেউ? বাড়ির পাশের পুকুরে এখটি নীল রঙের কিছু ভেসে থাকতে দেখে সঙ্গে সঙ্গে দু’জনের জলে ঝাঁপ। ঝপাং ঝপাং শব্দে এগচ্ছে দু’জনে। লক্ষ্য নীল বস্তুটি। না জামা নয়, নীল লুঙ্গি-ছেঁড়া!
কেউ সান্ত্বনা দেয়— গায়ে-হলুদের গাড়ি বেরল তো এখুনি, দেখ ওই গাড়িতে হয়তো উঠে পড়েছে।
ছোট বোন তুবড়ি বলে— তা হতে পারে দিদি। বাপন-তোতন গায়ে হলুদের গাড়িতে গেল তো! ওরা হয়তো নিয়ে গেছে ও যাওয়ার বায়না করতে। ওদের বাড়ি কি ফোন আছে? তা হলে একটু...।
এমন সময় বাড়ির ভেতর হইহই শোনা যায়, পাওয়া গেছে ঝিমিকে পাওয়া গেছে। সবাই পড়ি মরি করে দৌড়োয় বাড়ির ভেতর। একটা ঢোলা প্যান্ট আর একটা হাফ শার্ট গায়ে ঝিমি দাঁড়িয়ে। ওর হাতে একটা শালপাতার ঠোঙা। ঠোঙাতে কিছুটা ছানা। ছানা খেতে ভুলে গেছে ও। হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে। ওকে ঘিরে বাড়ির সমস্ত লোকজন।
খামার বাড়িতে, যেখানে ভিয়েন হচ্ছে, ওখান থেকে মানিক ওকে আবিষ্কার করেছে। খুঁটিতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছানা খাচ্ছিল। বড়-জামাই তো ভিয়েনের কারিগরকে এই মারে সেই মারে। বাচ্চাটা এখানে আছে তোমরা বলছ না। আমরা সারা বাড়ি খুঁজে মরছি।
কী করে জানব বাবু ওই ছেলেটাকে খুঁজছেন! আপনারা তো নীল জামা পরা একটা মেয়েকে খুঁজছিলেন। আপনারাও তো বারকতক এখানে খুঁজে গেলেন। অনেকক্ষণ ধরে খুঁটির কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাই হাতে একটু ছানা দিলাম ঠোঙায় করে। আমাদের কী দোষ!
বড়দি মেয়েকে পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে নাক টেনে কান্নার তলানিটুকু শেষ করে। তারপর শুধোয়, তোকে তোতনের প্যান্ট-জামা কে পরিয়ে দিল?
ছোট্ট ঝিমি এত লোক দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। মুখে কিছু বলছে না। ওর চোখ দুটো খুঁজে বেড়াচ্ছে দিদিকে। দিদিকে নজরে পড়ছে না। সে ঘরের কোণে বসে এখনও ফোঁপাচ্ছে। মা ওর পুরো কথাটা না শুনেই ওকে মারল।
ছোট-জামাই বড়-জামাইয়ের কাঁধে হাত দেয়— নিন দাদা সিগারেট ধরান। আর টেনশন নেবেন না। এও ওই পার্সপেক্টিভের খেলা। এবার শুধু আমরা নই, সবাই হেরে গোহারা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ