রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিসের লক্ষণ
রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস এক বিশেষ ধরনের বাত যা শরীরের একাধিক অস্থিসন্ধিকে আক্রমণ করতে পারে। এই ধরনের বাত শরীরের ক্ষুদ্র অস্থিসন্ধিতে শুরু হয়। তবে তা ধীরে ধীরে শরীরের অন্যান্য বৃহৎ অস্থিসন্ধিগুলিকেও রেয়াত করে না। কবজি, কাঁধ, হাঁটু, গোড়ালিও আক্রান্ত হয়।
লক্ষণ
কোনও ব্যক্তি গত একমাস ধরে সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরেই যদি অনুভব করেন হাত ও পায়ের ছোট ছোট জয়েন্টগুলি অনমনীয় হয়ে যাচ্ছে, ব্যথা হচ্ছে,স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে প্রবল বেগ হচ্ছে এবং বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে জয়েন্টের আড়ষ্টভাব কমতে থাকছে— তাহলে অবশ্যই তাঁর চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
অন্যান্য রিউম্যাটোলজিক্যাল বা অটোইমিউন ডিজিজ
মানুষের ধারণা, রিউম্যাটোলজিক্যাল ডিজিজের অর্থ হল নানা জয়েন্টে ব্যথা। তবে মনে রাখতে হবে, রিউম্যাটোলজি বা বাতবিদ্যা মানুষের রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা নিয়ে কাজ করে।
ভ্রূণ যখন গর্ভে থাকে তখন থেকেই কোষের একটা প্রশিক্ষণ হতে থাকে যে কোনটি নিজের কোষ এবং কোনটি অপরের কোষ। একইসঙ্গে শেখানো হয় যে বাইরের কোনও কিছু শরীরে প্রবেশ করলেই তাকে আক্রমণ করতে হবে, নাহলে সে শরীরের ক্ষতি করবে। এভাবেই তৈরি হয় শরীরের ইমিউন সিস্টেম। ইমিউন সিস্টেমের এই চেনা বা না চেনার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে কিছু কিছু সিগন্যালের উপর। অর্থাত্ কোষগুলি থেকে যে রাসায়নিক বেরয় সেগুলি দ্বারাই ইমিউন সিস্টেম বোঝে তার কাছে যে কোষ আছে তা ঘরের লোক নাকি বাইরের!
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শরীরে সংক্রমণ হলে কোষ থেকে এমন কিছু রাসায়নিক বেরয় যা ইমিউন সিস্টেমের কাছে খবর পৌঁছে দেয় যে বাইরের বস্তু শরীরের ঢুকেছে। ইমিউন সিস্টেম সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বাইরের যে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করেছে তাকে ড্যামেজ করে যাতে ওই বস্তুটি শরীরের ক্ষতি না করতে পারে।
এইরকমই কোনও কোনও ক্ষেত্রে যখন ইমিউন সিস্টেমে গণ্ডগোল দেখা দেয় বা শরীরের যে টিস্যুগুলো আছে বা যে কোষগুলি থেকে যেমন সিগন্যাল আসা উচিত ছিল তা যদি না আসে তাহলে ওই ইমিউন সিস্টেম মনে করে যে কোষগুলি আছে সেগুলির মনে হয় সেটা বাইরের জিনিস। ফলে শরীরের ইমিউন সিস্টেম তা বুঝতে না পেরে সে নিজের শরীরেরই ক্ষতি করতে থাকে। এই বিষয়টিই হল অটো ইমিউনিটিই রিউম্যাটোলজির মূল কথা। এখন বিষয়টি যেহেতু কোষ সংক্রান্ত বিষয় তাই বিষয়টি শরীরের যে কোনও জায়গাতেই প্রভাব ফেলতে পারে।
আক্রান্ত হতে পারে চোখ, কিডনি, ফুসফুস, ত্বক। এমনকী বার বার প্রেগন্যান্সি লস হতে পারে রিউম্যাটোলজিক্যাল ডিজিজ-এর উপসর্গ।
রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও হার্ট ডিজিজ
রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস থাকার অর্থ হল শরীরে প্রদাহের মাত্রাও বেশি থাকা। এই প্রদাহ হার্টেরও সমস্যা তৈরি করতে পারে। হার্টে জমতে পারে জল। এছাড়া রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস থাকলে করোনারি আর্টারি ডিজিজ হওয়ার আশঙ্কা ১.৫ থেকে ২ গুণ বেশি থাকে। এমনকী হার্ট ফেলিওর হওয়ার আশঙ্কাও থাকে বেশি।
রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও রিউম্যাটিক আর্থ্রাইটিস
রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস ও রিউম্যাটিক আর্থ্রাইটিস— দু’টি সম্পূর্ণভাবে আলাদা বিষয়। রিউম্যাটিক আর্থ্রাইটিস সাধারণভাবে শিশুদের হয়। এক্ষেত্রে একটা দুটো জয়েন্টে ব্যথা এবং তার সঙ্গে হার্টের ভালভ আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মূলত স্ট্রেপটোকক্কাস সংক্রমণ ও তার চিকিত্সা না হলে শরীরে যে প্রদাহ হয় তা হার্টের ভালভের ক্ষতি করে। বর্তমানে অ্যান্টিবায়োটিকের সহজলভ্যতার কারণে ও অভিভাবকদের সচেতনতার বৃদ্ধির ফলে এই অসুখের হার ক্রমশ কমে আসছে।
চিকিত্সা
আগে রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস অনেক দেরিতে সনাক্ত হতো। ফলে হাতে পায়ে বৈকল্য দেখা দিত। যা সারানো অসম্ভব ছিল। তবে যেভাবে মানুষ সচেতন হয়েছেন এবং চিকিত্শাস্ত্রের যা উন্নতি হয়েছে তাতে একটা বিষয় পরিষ্কার যে আগামী ১০ বছরে আর বৈকল্যের সমস্যা থাকবে না। চিকিত্সা ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি হয়েছে ডিজিজ মডিফাইং অ্যান্টি রিউম্যাটিক ড্রাগ (ডিএমএআরডিএস) আসার পর রিউম্যাটয়েডের চিকিত্সা করতে এখন স্টেরয়েড বা বেদনানাশকের দরকার পড়ে না।