নিজস্ব প্রতিনিধি, কোচবিহার: প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি ছিলেন প্রার্থনার লাইনে। হঠাৎই দেখলেন এক সহকর্মীর চোখে জল। তিনিই জানালেন, সর্বোচ্চ আদালতের রায় বেরিয়েছে। ২০১৬ সালের এসএসসির প্যানেল বাতিল। প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকার চাকরি চলে গিয়েছে। এরপর থেকে কার্যত মুষড়ে পড়েছেন কোচবিহারের তল্লিগুড়ি হাইস্কুলের এডুকেশনের শিক্ষক ফণীভূষণ সাহা।
আদপে গ্রামের মানুষ। দক্ষিণ দিনাজপুরের হরিরামপুর ব্লকের এসডিএম হাইস্কুল থেকে পড়াশুনোর শুরু। ছোটবেলাতেই বাবা-মায়ের মৃত্যু হয়। পরে পড়াশুনোর সূত্রে রায়গঞ্জে চলে আসা। সেখান থেকে বিএসসি আইটি। পরে এডুকেশন নিয়ে এমএ পাশ করেন ও বিএড। এরপরেই এসএসসির মাধ্যমে স্কুলে শিক্ষকতার কাজে যোগদান। গ্রামের বাড়ি ছেড়ে রাজনগর কোচবিহারের টানে এখানে এসেই ঘর বেঁধেছিলেন ফণীবাবু। চোখে ছিল অপার স্বপ্ন। সুন্দর সমাজ গড়ার লক্ষ্যে তিনি শুধু শিক্ষকতার মধ্যেই নিজেকে আটকে রাখেননি। কিছুদিন আগেই স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে মেতে ওঠেন চন্দ্রযানের মডেল তৈরিতে। বিরাট আকারের সেই মডেল এলাকায় হইচই ফেলে দেয়। প্রত্যন্ত ওই গ্রাম থেকেই তিনি ‹তল্লি› নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ শুরু করেন। গ্রামীণ ছেলেমেয়েদের লেখালিখির প্রতি আকৃষ্ট করতেই এই উদ্যোগ। কোচবিহার শহরে আর্ট এগজিবিজশন আয়োজন করা সহ বিভিন্ন সেবামূলক শিবিরের আয়োজন করার নেশা রয়েছে তাঁর। কিন্তু যে স্কুল ও শিক্ষকতাকে কেন্দ্র করে ফণীবাবুর এতো স্বপ্ন তা যেন হঠাৎই এক প্রবল ঝড়ে কেঁপে উঠেছে।
সদ্য চাকরিহারা শিক্ষক ফণীভূষণ সাহা বলেন, আমাদের একদলে ফেলে দেওয়া হল। এমন ভাবে পিষে দেওয়া হল যে সেই জ্বালাটা কাউকে বলে বোঝাতে পারছি না। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া পাঠশালা বন্ধের মতো এখানে পাঠদান বন্ধ করে দেওয়া হলো। একটা ভয়ঙ্কর সময়ের মধ্যদিয়ে যাচ্ছি। ছাত্রছাত্রীদের মন থেকেও তো বিশ্বাস উঠে গেল! তিনি আরও বলেন, ওইদিন আমি প্রার্থনার লাইনে ছিলাম। আমার পাশের এক শিক্ষকের চোখে জল দেখতে পাই। তিনিই আমাকে বলেন আজকের পর থেকে আর হয়ত স্কুলে আসতে হবে না। আমি কোনওমতে আবেগ সংবরণ করে স্কুল থেকে বেরিয়ে আসি। ভেবেছিলাম যোগ্যদের অন্তত বেছে নেওয়া হবে। এত বড় বড় এজেন্সি যদি দুর্নীতি বাছতে না পারে তাহলে আর কী বলার আছে! হতাশ লাগছে। কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। -নিজস্ব চিত্র