অমর মিত্র: একবার এক সংবাদপত্রের তরফে আমাকে পুরস্কার দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। মঞ্চে উঠেছি। পুরস্কার তুলে দিলেন প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক শংকর। তার পরেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। বক্তৃতা দিতে শুরু করার পর শংকর আর থামতে পারছেন না! শ্রোতাদের মধ্যে থেকে দাবি ক্রমাগত দাবি উঠছে, আরও কিছু বলুন, আরও কিছু বলুন। সেই অনুরোধের চাপে টানা দেড় ঘণ্টা অনর্গল কথা বলতে হয় তাঁকে। পাঠক-শ্রোতাদের মধ্যে
শংকরের জনপ্রিয়তা কতটা, এই ঘটনা থেকেই স্পষ্ট।
প্রখ্যাত এই সাহিত্যিক কথা বলতেন বৈঠকী ভঙ্গিতে। মজলিশি মেজাজে। ফলে শ্রোতারা তাঁর কথা শোনার জন্য মুখিয়ে থাকতেন। লেখক হিসাবেও ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। সেই জনপ্রিয়তার মাত্রা কেমন ছিল? তা বোঝাতে একটা ছোট্ট উদাহরণই যথেষ্ট। বছর ৩০-৪০ আগে বাঙালি বিয়েবাড়িতে উপহার হিসাবে বই ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। আর শংকরের বই উপহার দেওয়া হয়ে গিয়েছিল ‘অলিখিত’ এক রীতি! অবস্থা এমনই হয়েছিল যে, তাঁর একই বইয়ের একাধিক কপি উপহার পেতেন নবদম্পতিরা। আমার বিয়েতেই ‘স্বর্গ মর্ত পাতাল’ বইটি পেয়েছিলাম
আট কপি!
খুব অল্প বয়সে পড়েছিলাম শংকরের ‘কত অজানারে’। সেই বইয়ের হাত ধরে একটা অদ্ভুত, অজানা জগত্ খুলে গিয়েছিল চোখের সামনে। বারওয়েল সাহেব, হাইকোর্ট, আদালতের সঙ্গে যুক্ত কত মানুষ, মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের সেই আখ্যান কোনোদিন ভুলতে পারব না। আর একটা অদ্ভুত উপন্যাস ছিল ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’। এক বিজ্ঞানী চান পৃথিবীর যাবতীয় ক্ষতিকর কীটপতঙ্গের জন্ম নিয়ন্ত্রণ করতে। তাতেই দূর হবে ফসল ধ্বংস হওয়া। বিজ্ঞানীর স্ত্রী চান তাঁদের কন্যারা একটা বিলাসি জীবন পাক। তাদের ভালো ঘরে বিয়ে হোক। একদিকে দাম্পত্যের আকুতি, অন্যদিকে এক বিজ্ঞানীর নাছোড়বান্দা স্বার্থহীন গবেষণায় জড়িয়ে থাকা। তার সঙ্গে কীটপতঙ্গ নিয়ে নিখুঁত বর্ণনা—সব মিলিয়ে সেটাও এক আশ্চর্য দুনিয়া। লেখক হিসাবে শংকর কখনো সময়কে এড়িয়ে যেতেন না। যে সময়ে বাস করতেন, সেই সময়ের চাহিদা আর সংকটের কথা ধরা পড়ত তাঁর উপন্যাসে। ‘সীমাবদ্ধ’, ‘জন-অরণ্য’ এই কারণেই আজও আমার ভীষণ প্রিয়। মানুষ হিসাবেও শংকর ছিলেন অত্যন্ত স্নেহবান। যতবার দেখা হয়েছে, প্রত্যেকবারই নানান বিষয়ে খোঁজখবর নিতেন। ক্রমশ ধর্ম, আধ্যাত্মিকতাকে আঁকড়ে ধরছিলেন। মানবিক লেখা লিখতেন বরাবর... বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারই প্রসার ঘটেছিল।