দীপন ঘোষাল, রানাঘাট: ওগো... তোমার নাকটা কি সুন্দর গো! ইচ্ছে করে কামড়ে খেয়ে নিই—স্ত্রীকে একান্তে পেলেই কাছে টেনে কানে কানে বলত এই একটাই কথা। কতবার যে বলেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। শুনেই লাজুক হাসি হেসে কাজে চলে যেতেন স্ত্রী। কিন্তু তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি এমন সোহাগমাখা কথার আড়ালে স্বামী লালন করে চলেছে সৌন্দর্য্যের প্রতি বিদ্বেষ। অন্যের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার সন্দেহ থেকে যার জন্ম। পরিণতিও হল ভয়ঙ্কর। বৃহস্পতিবার রাতে অঘোরে ঘুমোচ্ছিলেন স্ত্রী। চুপিসারে তাঁর বাঁশির মতো নাকে কামড় বসালেন স্বামী! আর্তচিৎকার করে উঠে দেখেন, সাধের নাকটাই নেই। রক্ত বেরুচ্ছে গলগল করে। এমন বিরল ঘটনার সাক্ষী হয়ে থাকল
শান্তিপুর শহরের ১১ নম্বর ওয়ার্ড।
স্বামী যে ঈর্ষাবশত এই কাণ্ড ঘটিয়েছে, তা বুঝতে পেরেই থানার দ্বারস্থ হন ওই বধূ। নাকে ব্যান্ডেজ। হাতে প্রেসক্রিপশন। অভিযোগ শুনে তাজ্জব পুলিস অফিসাররাও। মধু খাতুন নামে ওই বধূকে পুলিসকে জানিয়েছেন, এর আগেও একাধিকবার অ্যাসিড ছুড়ে তাঁর মুখশ্রী নষ্ট করে দেওয়ার হুমকি দিত স্বামী। তখনও বিষয়টিকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি। নাক কেটে নেওয়ার কথাতেও পাত্তা দিচ্ছিলেন না। ভেবেছিলেন, সৌন্দর্য্যের প্রতি ‘মুগ্ধ’ বলেই হয়তো এসব বলছেন। কিন্তু সত্যিই সত্যিই নাক কেটে নেওয়ায় তাঁর ভুল ভাঙে। স্বামীর বিরুদ্ধে সরাসরি খুনের চেষ্টার অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিস কীর্তিমান স্বামী বাপন শেখকে গ্রেপ্তার করে শ্রী ঘরে পাঠিয়েছে।
বেরপাড়া এলাকার বাসিন্দা বাপন। প্রায় ন’বছর আগে মধুকে প্রেম করে বিয়ে করেন। তাঁদের আট বছরের কন্যাসন্তান রয়েছে। বিয়ের পরপর সংসার বেশ সুখের ছিল। পরে বাপনের অতিরিক্ত মদ্যপানের জেরে দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। তাতে অনুঘটকের কাজ করে মধুর রূপ-লাবন্য। সেই রূপের মোহে অন্য কোনও পুরুষ স্ত্রী জীবনে আসতে পারে বলে সন্দেহ করতেন বাপন। মাঝেমধ্যেই বলতেন, তোমার নাক-মুখটা যত নষ্টের গোড়া। কী সুন্দর তোমার মুখশ্রী। তোমার নাকটাও আমার খুব ভালো লাগে। আবার, মদ্যপ অবস্থায় থাকলে কিংবা অশান্তি হলে মধুর মুখে অ্যাসিড ছুড়ে সৌন্দর্য নষ্ট করে দেওয়ারও হুমকি দিতেন বাপন।
এভাবেই চলছিল। অঘটন ঘটে বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে। মধুর দাবি, তিনি তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। আচমকাই তাঁর নাকে হিংস্রভাবে কামড় বসায় বাপন। কামড়ে নাকের সামনের অংশ খুবলে নেয় সে। অসহ্য যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে ওঠেন তিনি। বাপন নাক ছেড়ে কামড়ে ধরে স্ত্রীর বাঁ হাতের একটি আঙুল। ততক্ষণে অবশ্য চিৎকার চেঁচামিচিতে চলে আসেন পরিবারের লোকজন। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করা হয়। নিয়ে যাওয়া হয় শান্তিপুর স্টেট জেনারেল হাসপাতালে।
মধু রবিবার বলছিলেন, ‘প্রায়ই আমার রূপের প্রশংসা করত বাপন। খুনসুঁটি করত। আমারও ভালো লাগত। কিন্তু এভাবে আমার নাকের ডগা কামড়ে ছিঁড়ে দেবে, তা ভাবতেই পারিনি। পরে, ওর অতীতের সব কথাগুলি সাজিয়ে নিয়ে বুঝতে পারি, বাপন আমাকে আসলে খুন করার চেষ্টা করেছিল। সেদিন রাতে নাক কেটে নেওয়ার পরও গায়ের জোরে আমার গলা টিপে ধরেছিল। কোনওমতে প্রাণে বেঁচেছি। বাধ্য হয়েই আমি পুলিসের দ্বারস্থ হয়েছি। ওর কঠিন শাস্তির দাবি করছি।
মধুর বাপের বাড়ির লোকজনের দাবি, নিয়মিত মদ্যপান করত বাপন। এ নিয়ে প্রায়শই সাংসারিক অশান্তি লেগেই থাকত। রূপের প্রশংসার পাশাপাশি অ্যাসিড ছুড়ে তাদের বাড়ির মেয়ের মুখশ্রী নষ্ট করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছিল বাপন। তাই বাপনের বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে শান্তিপুর থানায়। এদিকে, তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, বধূর অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নেমে গ্রেপ্তার করা হয়েছে স্বামীকে। তার বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টা সহ একাধিক ধারায় মামলা রুজু করে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ধৃত বাপনকে রানাঘাট মহকুমা আদালতে তোলা হয়। বিচারক তার ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন।