নিজস্ব প্রতিনিধি, ঝাড়গ্ৰাম: জামবনী ব্লক শুখা এলাকা। উঁচু জমি এলাকায় বছরে একবার ধানচাষ হতো। সেচের জলের অভাব ছিল। কাপগাড়ি, পরিপাটি, গিধনী এলাকার মহিলা চাষিরা এখন গোবিন্দভোগ ধান চাষ ও বাজারে বিক্রয় করে তাক লাগাচ্ছেন। সেই চাল চলে যাচ্ছে অন্ধ্রপ্রদেশে। জেলা কৃষিদপ্তরের তরফে বীজ দেওয়া থেকে বিপণনের কৌশল শেখানো হচ্ছে। মহিলা চাষিদের হাত ধরে গ্ৰামীণ অর্থনীতি বদলে যাচ্ছে।
সুগন্ধী গোবিন্দভোগ ধান চাষ লাভজনক হয়ে উঠছে। জৈব সার ব্যবহার করায় গোবিন্দভোগ ধান চাষের খরচ তুলনামূলকভাবে কম। সরকারের সহায়ক মূল্যে দেশি ধানের দাম কুইন্টাল প্রতি সাধারণত ২ হাজার ৩০০ টাকা। সরকারি ক্রয়কেন্দ্রে ধান বিক্রি করলে ২০ টাকা উৎসাহ-ভাতা পাওয়া যায়। গোবিন্দভোগ ধান চাষ করে সেখানে কুইন্টাল প্রতি ৫ হাজার টাকা মিলছে। যাতায়াতের অসুবিধার জন্য খোলা বাজারে অনেক সময় ধান বিক্রি করে দিতে হতো। লাভের পরিমাণ কমত। জামবনী ব্লকের মহিলা চাষিরা এখন ধান চাষ করার পাশাপাশি চাল প্যাকেটজাত করে ভিন রাজ্যেও পাঠাচ্ছেন। দীর্ঘদিনের ধান উৎপাদন থেকে ক্রয় বিক্রয়ের চেনা ছবি বদলে গিয়েছে। জামবনী ব্লকে নদী তীরবর্তী এলাকায় দু’বার চাষ হলেও উঁচু জমি এলাকায় একবার ধান চাষ হতো। সেচের জলের অভাব সেই চাষ করাও কষ্টসাধ্য ছিল। প্রশাসনের উদ্যোগে শুখা ভূমি এলাকায় সেচের জলের জন্য সাবমার্সিবল বসানো হচ্ছে। কৃষিদপ্তর থেকে বিনামূল্যে বীজ সরবরাহ করা হচ্ছে। লুপ্ত হতে বসা দেশি ধান চাষেও উৎসাহিত করা হচ্ছে। উৎপাদিত ধান বিপণনের জন্য এখন কর্মশালাও করা হচ্ছে। বিপণনের কৌশল আয়ত্ত করে তাঁরা নিজেরাই ধান বিক্রি করার কাজে এগিয়ে এসেছেন। উৎপাদিত ধান স্থানীয় ফড়েদের কাছে বিক্রি করতে হচ্ছে না। স্থানীয় বাজারের সঙ্গে ভিন রাজ্যের বাজার খুলে গিয়েছে।
জামবনীর ধরসা গ্ৰাম পঞ্চায়েতের ছোট এনাটা গ্ৰামের কাপুরমনি মান্ডি বলেন, চাষবাস আগেও করতাম। গ্ৰামের মহিলারা দল বেঁধে গোবিন্দভোগ ধান চাষ করায় উৎসাহিত হয়েছিলাম। উৎপাদিত ধান থেকে তৈরি চাল প্যাকেটজাত করে বিক্রি করছি। গতানুগতিক ধান চাষ করে যে টাকা পেতাম, গোবিন্দভোগ ধান চাষ করে তার বেশি লাভ হচ্ছে। গতবছর দেড় বিঘা জমিতে গোবিন্দভোগ ধান লাগিয়েছিলাম। রোজগার বাড়ায় সংসারের হালও ফিরছে। শালবনি এলাকার চাষি দুলালি টুডু বলেন, বীজতলা, ধানকাটা, নিড়ানি থেকে ঝাড়াই বাছাই মেয়েরাই করে থাকে। বীজ সংরক্ষণ, জৈব সার তৈরির কাজ শিখেছি। উৎপাদক দল গঠন হওয়ায় আমাদের কাজ সহজ হয়েছে।
উৎপাদক গোষ্ঠীর সহায়তার কাজে যুক্ত কৌশিক মুদি বলেন, জামবনী ব্লকে গত দু’বছর ধরে গোবিন্দভোগ ধান চাষ শুরু হয়েছে। ব্লকের ৬০০০ মহিলা নিয়ে ১৯৫টি উৎপাদক দল গঠন করা হয়েছে। ধান উৎপাদন থেকে বিপণন মহিলারা নিজেরাই করছেন। ভিন রাজ্যে সুগন্ধি গোবিন্দভোগ ধান যাচ্ছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদার উপর আমাদের নির্ভর করতে হচ্ছে না। জামবনী ব্লকের কৃষিদপ্তরের আধিকারিক তন্ময় দাস বলেন, বিকল্প চাষবাসে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। গ্ৰামীণ এলাকার মহিলারা চাষবাসের কাজে নানাভাবে যুক্ত থাকেন। কৃষিদপ্তর জৈব সার দিয়ে চাষবাস, বিপণনের প্রশিক্ষণে কর্মশালা করছে। আনন্দধারা, মাটির সৃষ্টি প্রকল্প সুখা ব্লকের চাষে পরিবর্তন এনে দিয়েছে। অন্ধ্রপ্রদেশে প্যাকেটজাত গোবিন্দভোগ চাল রপ্তানি করা হচ্ছে। প্রান্তিক মহিলাদের হাত ধরে গ্ৰামীণ অর্থনীতি বদলে যাচ্ছে। -নিজস্ব চিত্র