নয়াদিল্লি: হিন্দুরাষ্ট্র এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধি। রামমন্দির প্রতিষ্ঠার পর এই দুই এজেন্ডা সফলের স্বপ্ন দেখছে গেরুয়া শিবিরের হর্তাকর্তারা। আর এই এজেন্ডায় ফরমুলা একটাই—বিভাজন। শুধু দেশে নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও বিজেপির বিরুদ্ধে এহেন অভিযোগের বিস্ফোরণ লাগাতার ঘটছে। সবচেয়ে বড় কথা, ঘৃণা-ভাষণে সুপ্রিম কোর্ট লাগাম টানতে বলার পরও হেলদোল নেই খোদ কেন্দ্রের শাসক দলের। উপরন্তু, এবার মোদি সরকারের আর্থিক সহায়তায় আয়োজিত সম্মেলনের মঞ্চ থেকেই অভিযোগ উঠল ঘৃণা-ভাষণের। একঝাঁক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর উপস্থিতিতে দেশ থেকে ‘মুসলিম খেদানো’র দাবি তোলা হল সেখানে। কোনো বক্তা দাবি তুললেন, ভারতীয় মুসলিমদের ২৫ শতাংশকে দেশ থেকে তাড়াতে হবে। ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র বানাতে হবে। কারও আবার নিদান, দেশ থেকে গণহারে মুসলিম তাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
গত ১৩-১৪ ডিসেম্বর দিল্লির ভারত মণ্ডপমে ‘সনাতন রাষ্ট্র শঙ্খনাদ মহোৎসব’ নামে ওই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। আয়োজক, সনাতন সংস্থা নামে একটি সংগঠন। তথ্যের অধিকার আইনে (আরটিআই) করা একটি আবেদনের জবাবে জানা গিয়েছে, মোদি সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রক ও দিল্লির পর্যটন দপ্তরের সহায়তায় আয়োজিত এই সম্মেলন আয়োজনের জন্য সংগঠনটিকে ৬৩ লক্ষ টাকার আর্থিক সহায়তা করেছে কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রক। আর এই মঞ্চ থেকেই খুল্লামখুল্লা মুসলিম খেদানোর ডাক দেওয়া হয়েছে! কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত, শ্রীপদ নায়েক, সঞ্জয় শেঠ, দিল্লির বিজেপি সরকারের পর্যটনমন্ত্রী কপিল মিশ্রর উপস্থিতি সত্ত্বেও। রিপোর্ট অনুযায়ী, সুদর্শন টিভির প্রধান সুরেশ শাভাঙ্কে বলেছেন, ‘ভারতে ২৫ শতাংশ মুসলিম অনুপ্রবেশকারী। তারা বাংলাদেশি, পাকিস্তানি, আফগান। এনআরসি চালু করে এদের দেশ থেকে তাড়াতে হবে। ভারতে মুসলিম জনসংখ্যায় লাগাম টানা প্রয়োজন।’ বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘প্রত্যেক হিন্দু যদি অন্তত একজনকেও ধর্মান্তরিত করতে পারে, তাহলেই আমাদের উদ্দেশ্য পূরণ হবে। এখানে অনেক ব্যবসায়ী রয়েছেন। তাঁরা সহজেই (মুসলিম) কর্মীদের ধর্মান্তরিত করতে পারেন।’ হিন্দু ফান্ডের রাহুল দেওয়ান বলেছেন, ‘আমাদের আক্রমণাত্মক কৌশল প্রয়োজন। সাংবিধানিকভাবে হিন্দুরাষ্ট্র চাই আমাদের।’
কেন্দ্রের পৃষ্ঠপোষকতায় এহেন ‘বিভাজনের সম্মেলন’ তুমুল বিতর্ক তৈরি করেছে। বিজেপির বিরুদ্ধে সরব হয়েছে কংগ্রেস-তৃণমূল সহ বিরোধীরা। কংগ্রেস মুখপাত্র রাগিনী নায়েকের প্রশ্ন, ‘সংবিধানের শপথ নেওয়া ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের সরকার কীভাবে এ ধরনের সংস্থাকে অর্থ সাহায্য করতে পারে? সনাতন শঙ্খনাদ নামে অনুষ্ঠানে আদতে দেশের ঐক্য নষ্ট করার ষড়যন্ত্র হয়েছে। বন্দেমাতরমের সার্ধশতবর্ষ পালনের অনুষ্ঠানে মুসলিমদের দেশছাড়া করার স্লোগান! আর সেখানে উপস্থিত দেশের সংস্কৃতিমন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত এবং দিল্লি সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রী কপিল মিশ্র? বিজেপি যেভাবে রামনামের নামে যুদ্ধংদেহি আচরণে স্লোগান তোলে, তাতেই স্পষ্ট এরা আদতে ধর্মে ধর্মে লড়াই লাগাতে চায়। মোদিজি কি ভারতের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য ধ্বংস করতে চান? এ ধরনের সংগঠনকে প্রশ্রয় দিয়ে দেশে অশান্তির পরিবেশ তৈরি করতে চান? কেন সরকারি অর্থ খরচ করে এ ধরনের ঘৃণা ভরা আলোচনার অনুষ্ঠানকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে? প্রধানমন্ত্রীকে জবাব দিতে হবে। হেট স্পিচ রুখতে সংসদে আইন আনতে পারবেন কি মোদিজি? আছে ক্ষমতা?’ রাজ্যের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত অর্থ প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের প্রতিক্রিয়া, ‘বিষয়টিকে তুচ্ছভাবে দেখলে চলবে না। এটা ভারতের সংবিধানের পরিপন্থী। সংবিধান এর অনুমতি দেয় না। আমরা যেমন বিধায়ক বা সাংসদ তহবিল থেকে কোনো ধার্মিক কাজে টাকা দিতে পারি না, একইভাবে কেন্দ্রীয় সরকারও এই কাজ করতে পারে না। এটা অপরাধ।’ বিতর্ক চলছে। বিভাজনের বিতর্কে দিল্লির পর্যটন দপ্তরের জবাব কিন্তু রাত পর্যন্ত মেলেনি। কেন্দ্রেরও না।