শুভদীপ রায়, কলকাতা: সুমন্ত দে কাটোয়ার বাসিন্দা। পেশায় ব্যাংককর্মী। বই পড়তে ভালোবাসেন। নিয়ম করে আসেন কলকাতা বইমেলা। কেনার থেকেও নতুন বইয়ের খোঁজ নেওয়া তাঁর নেশা। ছোট একটি নোটবুকে লিখে রাখেন নতুন কোন বই এবার বেরোল। তবে এবছর বইমেলায় এসে বইয়ের নাম শুধু লিখছেন না। সঙ্গে থাকা নোটবুকে লিখে রাখছেন খাবারের নামও! তাঁর বক্তব্য, খাবারের এমন বাহারি নাম জন্মে শোনেননি।
গোকুল পিঠে তাও আবার বেকড! নলেন ডাবের পায়েস! নাম পড়ে দোকানের সামনে থমকে গেলেন দমদমের সায়ন পাত্র। বললেন, ‘মেলার বইয়ের দোকানে ডিসকাউন্ট বেশি দেয় না। তাই খুব বেশি বই কিনি না। কিন্তু খাবারের দোকানে ডিসকাউন্ট দিলেও খাব না দিলেও খাব। নিজে তো খাচ্ছিই বাড়ির জন্যও নিয়ে যাচ্ছি।’ তাঁর কয়েক হাত দূরে সৌমাল্য নন্দী দাঁড়িয়ে। তাঁর হাতে সাদা বাটি। তাতে জলভরা সন্দেশ। চামচে আলতো চাপ দিলেন। সাদা বাটি ভরে গেল বাদামি তরলে। হালকা সুগন্ধ এল নাকে, খাঁটি নলেন গুড়। সে সুগন্ধ চাপা পড়ে গেল ভেটকির ফ্রাইয়ের কড়া গন্ধে। পাশেই কেউ কামড় বসিয়েছেন ফিস ফ্রাইয়ে। হাওড়ার ডোমজুড় থেকে মেলায় এসেছেন বিশাখা মিত্র। বললেন, ‘বইমেলায় এলে নলিনের মিষ্টিটা মিস করি না। আমাদের ওখানে ভালো দোকান নেই। তবে শুধু মিষ্টি খেতে তো কলকাতায় আসা হয় না। তাই বইমেলায় এলে খাওয়া-বই কেনা দুই-ই হয়।’ শ্রীরামপুরের সুমিত রায় ডায়মন্ড ফ্রাইয়ের ভক্ত। মেলা ঘুরে ক্লান্ত। এবার জমিয়ে খাওয়াদাওয়া চাই। ভাইপো প্রমিত এসেছে কাকার হাত ধরে। তার হাতের প্লেটে পিৎজা। ছোট্ট প্রমিত সাফ জানাল, তার বাড়ির থেকে অনেক ভালো জায়গা বইমেলা। কারণ, ‘বাড়িতে হাজারবার বললেও কেউ পিৎজা কিনে দেয় না। মেলায় কাকাই কিনে দিল। বইও দিল।’
মেলার এই অংশ যেন আলাদা একটা সাম্রাজ্য। ৯ নম্বর গেট দিয়ে ঢুকে লিটল ম্যাগাজিনের স্টলগুলো পেরলেই সে সাম্রাজ্যে সার দিয়ে সাজানো খাবারের দোকান। মিষ্টি থেকে আইসক্রিম। পিঠে থেকে পিৎজা। ফিস ফ্রাই, রাইস-চিকেন কম্বো আছে সবই। তবে অভিযোগ, ‘খাবারের দাম একটু বেশিই।’ বিশেষ করে বাহারি নামের খাবারগুলোর দাম আকাশছোঁয়া। ৫০০ টাকা দিয়ে ইলিশ বিরিয়ানি কিনতে অনেকেই দু’বার ভাবছেন। তবে দোকানদারদের কথায়, ‘সন্ধ্যার আগে কেবলমাত্র এই খাবারটাই শেষ হয়ে যাচ্ছে।’ ২০০ টাকার ভেটকি পাটিসাপটা দাপটের সঙ্গে ব্যাটিং করছে মেলাপ্রাঙ্গণে। তবে সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছে একজনই, নলেন ডাবের পায়েস। ১০০ টাকা দাম। তবে মুখে দিলে অনায়াসে দাম পুষিয়ে যাবে, দাবি খাদ্যরসিকদের। সস্তায় পেট ভরানোর জন্য ১৫০ টাকায় পোলাও-মাংস আছে। হরিণঘাটার ডায়মন্ড ফ্রাই পেল্লায়। খেয়ে নিশ্চিন্তে কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে ফেলা যাবে। সেই সঙ্গে রয়েছে মাটির ভাঁড়ে চা। পিৎজা, মোমোর দোকান খালি নেই। খিদে পাক না পাক ঘুরতে ফিরতে অনেকেই চেখে দেখছেন খাবারদাবার। অনেকে পাপড়ি চাটে মন ভরাচ্ছেন। ভিড় জমেছে কেক-পেস্ট্রির ‘মিও আমোরে’ দোকানে। নলেনগুড়ের পেস্ট্রির বিক্রি সবথেকে বেশি। এই পর্ব শেষ হচ্ছে বেনারসি পান দিয়ে। বরফের উপর সাজানো সে পানের বাহারি রংদার মশলা। বিশেষ আকর্ষণ কাশ্মীরি কাওয়া। ৫০ টাকা এক কাপ। মৃদু শীত গায়ে মেখে চেখে দেখছেন অনেকে। রকমারি আচারও বিক্রি হচ্ছে বইমেলায়। তাও বাড়ির জন্য কিনছেন অনেকে। ৩ নম্বর গেটের কাছে এমন দোকানও ভিড় মন্দ নয়।
সন্ধ্যার আগে বইয়ের স্টলে তেমন ভিড় না থাকলেও খাবারের দোকানে সন্ধ্যা-বিকেল-দুপুর একই রকমের ভিড়। অনেকেই এসব দেখে বললেন, বইমেলার মধ্যে তো দেখি খাদ্যমেলাও আছে লুকিয়ে। কোথায় যে আগে যাই?
বইমেলায় পেটপুজো। ছবি: শান্তনু বিশ্বাস