শান্তনু দত্তগুপ্ত: ইডেনের ম্যাচ। কেকেআর ব্যাট করছে। কিন্তু গোটা স্টেডিয়াম তাকিয়ে ক্লাব হাউসের বাঁদিকে, বি ব্লকের উপরে প্ল্যাটিনাম লাউঞ্জের বক্সের দিকে। বিশেষ করে বি ব্লকের দর্শকরা। মাঠের উলটোদিকে ঘুরে গিয়েছেন তাঁরা। কারণ, তাঁদের মাথার ঠিক উপরে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়িয়েছেন শাহরুখ খান। দুই ওভারের মাঝ বরাবর। তাই বল গড়ালেও চিৎকার চলছে। উচ্ছ্বাস এমন... যেন বিরাট কোহলি ছক্কা হাঁকিয়েছেন। মাঠের দিকে পিছন ফিরে স্টেডিয়াম তখন দু’চোখ ভরে দেখছে ওই লোকটাকে। কী জাদু আছে তাঁর? অসাধারণ হ্যান্ডসাম নয়, ব্যারিটোন গলার আওয়াজ নেই, গড়পড়তা সাড়ে পাঁচ ফিটের একটু বেশি হাইট... কিন্তু আসমুদ্রহিমাচল তাঁর এক ঝলকের জন্য পাগল। ১০ বছর ছেলে তার মাকে বলছে, ‘মা এত চেঁচিও না। গলা চিরে যাবে।’ উত্তেজিত মা তাঁর ছেলেকে বলছেন, ‘ওরে, আজ আমাকে থামাস না। আমি কি আর খেলা দেখতে এসেছি? ইডেনে এসেছি তো শুধু ওই লোকটাকে দেখব বলে!’ দুটো টিকিটই জোগাড় করতে পেরেছিলেন কর্তাবাবু। তাই তাঁর আর ইডেনে আসা হয়নি। গিন্নি, আর ছেলেকে পাঠিয়েছেন। তিনি কিন্তু ক্রিকেটের ভক্ত। আর শাহরুখ খানেরও। তবে জানেন, তাঁর স্ত্রীয়ের থেকে বেশি নন। তাই কর্তা অফিসে। খানিকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেই। টিভিতে দেখছেন, ঢেউ উঠছে স্টেডিয়ামে... আবেগের। কারণ, হাত নাড়ছেন উনি। হাসছেন। মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানাচ্ছেন। আশপাশের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের গ্ল্যামার ফিকে লাগছে। মরুভূমিতে উষ্ণতার পারদের মতো বাড়ছে উচ্ছ্বাস। আবেগ। সব বয়সের। সব শ্রেণির। সব ধর্মের। সব জাতের। ৩৩ বছর ধরে তিনি কথা রেখে চলেছেন। এন্টারটেনমেন্ট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছেন। এখনও রাত ২টো পর্যন্ত শিফটে শ্যুটিং করছেন। বাড়ি ফিরে ওয়ার্ক আউট। ভোর পাঁচটায় ঘুমোতে যাওয়ার আগে অন্তত কোনও না কোনও বইয়ের একটা পাতা পড়ছেন। আজ তিনি ৬০। পাক ধরেছে চুলে। কুঁচকে গিয়েছে চোখের নীচের চামড়া। কিন্তু ওই মা-ছেলের মতো বাকিরাও সেটা দেখতে পায় না। দেখতে চায় না। বুঝতে চায় না যে, তাদের হিরো বৃদ্ধ হয়েছেন।
ফ্ল্যাশব্যাক। ২৫ বছর আগে।
ভোর সাড়ে চারটেয় বাড়ি থেকে বেরিয়েছে ছেলেটি। বাস নেই। হেঁটেই যেতে হবে সাদার্ন অ্যাভিনিউ। ৯টায় কাউন্টার খুলবে। কিন্তু ভোর ভোর না পৌঁছতে পারলে ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শোয়ের টিকিট মিলবে না। তাই হাঁটা শুরু করেছে সে। মেনকার সামনে যখন পৌঁছল, ঘড়ির কাঁটায় ৫টা ১০। অন্তত সাড়ে তিনশো জনের লাইন। দমে গেল ছেলেটা। এত ভোরে এসেও এই অবস্থা! এরা কি রাতেই লাইন দিয়েছে নাকি? ‘লাস্ট কি আপনি?’... জিজ্ঞেস করে দাঁড়িয়ে গেল সে। ভিড় বাড়ছে। ছড়িয়ে পড়ছে ফুটপাতের উপর। নেমে পড়ছে রাস্তায়। দু’জন-পাঁচজনের গুনগুন আলোচনা গমগমে রূপ ধরেছে। তার মাঝেই ছিটকে বেরিয়ে আসছে ‘জিও শাহরুখ’ চিৎকার। সেটাই সমাবেশের স্লোগানের মতো কাঁপিয়ে দিচ্ছে গোটা চত্বর। গলায় গলা মিলছে, হয়ে উঠছে ভক্ত-সংগীত। হঠাৎ যেন মাটি ফুঁড়ে উদয় হল দু’জন পুলিশ কনস্টেবল। সাইড হতে বলছে। লাইনে যেতে বলছে। হাতে লম্বা লাঠি। হঠাৎ কী যেন একটা হল... বেশ হুলুস্থুল। পা লক্ষ্য করে লাঠি চালাচ্ছে পুলিশ দুটো। একটা এসে পড়ল ছেলেটির পায়ে... ‘উরে ব্বাবা’। পা ধরে বসে পড়েছে ছেলেটি। তাও লাইন ছাড়েনি। ধীরে ধীরে ভিড়টা ‘অ্যাসেম্বলড’ হয়ে গেল। এবার কাউন্টার খুলবে। আর ১০ মিনিট। পায়ে টসটসে ব্যথা নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে ছেলেটা। দাঁতে দাঁত চেপে। সিনেমার জন্য নয়। শাহরুখ খানের জন্য। ওই নামটাই তার কাছে একটা আবেগ। কাট।
কাঠ-বাস্তবে ফিরে এলেন ভদ্রলোক। পুরোনো ছবিগুলো ছেড়ে ছেড়ে যাচ্ছে। কাজটা তাড়াতাড়ি গুটিয়ে নিয়েই বাড়ি রওনা দিতে হবে। প্রত্যেক মধ্যবিত্তের একটা স্বপ্ন থাকে। সে চায় একদিন বড়ো হতে। বয়সে নয়। বহরে নয়। প্রভাবে। এই স্বপ্ন ভদ্রলোক চোখের সামনে পূরণ হতে দেখেছেন শাহরুখ খানের মধ্যে। সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা একটি ছেলে... স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মুম্বই শহরে। থাকার জায়গা ছিল না বলে শুয়ে ছিল জুহু বিচের উপর বেঞ্চে। শপথ নিয়েছিল, এই শহরে একদিন সে রাজত্ব করবে। বাবা মীর তাজ মহম্মদ খান বিশ্বাস রাখতেন, ছেলে কিছু একটা করবে... ‘অওর অগর কুছ না কর সকা তো কামাল করেগা।’ শাহরুখ সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রেখেছেন। ‘কামাল’ই করেছেন। কারণ, ঠিক করে নিয়েছিলেন, বাকিরা যা করবে, আমি তা করব না। কয়ামত সে কয়ামত তক, ম্যায়নে প্যায়ার কিয়া রিলিজ হয়ে যাওয়ার পর ময়দানে এসেছিলেন তিনি। চকোলেট বয়, রোম্যান্টিক হিরোর বাজার মাত করছেন আমির-সলমন। আসছে সুরজ বরজাতিয়ার হাম আপকে হ্যায় কওন। আর শাহরুখ? বাজিগর, ডর, অঞ্জামের মতো ছবিতে নেগেটিভ হিরো তিনি। যে ছাদের উপর থেকে শিল্পা শেঠিকে ফেলে দেয়, ছবির প্রথম সিন থেকে শেষ পর্যন্ত সন্ত্রস্ত করে রাখে জুহি চাওলাকে, মাধুরী দীক্ষিতের উপর ইগো স্যাটিসফাই করার জন্য রাগের মাথায় আগুন লাগিয়ে দেয় নিজের বিলাসবহুল গাড়িতে। সিরিয়ালও করেছেন... ফৌজি, সার্কাস...। সেই সময়ের সহ অভিনেতারা বলতেন, কী পরিশ্রমই না করতে পারে ছেলেটা! আজ তাঁর কো-স্টাররা কী বলেন? ওই এক কথা, ‘কী পরিশ্রমই না করতে পারে লোকটা। এই বয়সেও।’ আর যাকে বলে ডিরেক্টরস অ্যাকটর। ফ্লোরে পা দিয়ে ফেললে পরিচালক যা বলবেন, সেটাই তাঁর কাছে বেদবাক্য। জওয়ান ছবির শ্যুটিংয়ের সময় পরিচালক অ্যাটলি ভয়েই ছিলেন। এত বড়ো স্টার... ওঁকে কীই বা বলব? ম্যানেজার পূজা দাদলানি বলতেন, ‘আরে আপনিই তো বলবেন। কী করতে হবে, বুঝিয়ে দিন শাহরুখকে। ও আপনার নির্দেশের অপেক্ষাতেই রয়েছে।’ ‘চক দে ইন্ডিয়া’র শ্যুটিংয়ের সময় একটু টেনশনেই ছিলেন পরিচালক শিমিত আমিন। শেষ পেনাল্টি শট নেবে অস্ট্রেলিয়া। গোলের সামনে বিদ্যা। পায়ের মুভমেন্ট লক্ষ করার পর বিদ্যাকে সোজা দাঁড়িয়ে থাকার ইশারা করবে কবীর খান। গোলমুখী শট আটকে দেবে বিদ্যা। তারপরই টেনশনের মুহূর্ত শিমিত আমিনের। শাহরুখ পারবেন তো? জয়ের আনন্দ, এত বছর জমে থাকা অপমান থেকে মুক্তি, নিজেকে প্রমাণ করা... কবীর খান পিছনের রেলিং ধরে বসে পড়বে।
চোখে জল আসবে, কিন্তু তা গড়িয়ে পড়বে না। পারবেন তো? শিমিত জিজ্ঞেস করলেন শাহরুখকে। হাসলেন তিনি...‘চিন্তা করবেন না। হয়ে যাবে।’ আবার প্রশ্ন করলেন শিমিত, ‘বুঝতে পেরেছেন তো? চোখে জল আসবে, কিন্তু পড়বে না।’ আবার হাসলেন শাহরুখ। শটটা নেওয়ার সময় শিমিত দেখেছিলেন, বেকারই তিনি ভয় পাচ্ছিলেন। লোকটার নাম শাহরুখ খান। যখন কাট বলার কথা, তারপরও বেশ কিছুক্ষণ ক্যামেরা রোল করিয়ে গিয়েছিলেন শিমিত। ইচ্ছে করে। ভাবটা এমন, দেখি কত বড়ো অভিনেতা! তখনও একফোঁটা জল চোখের কোল বেয়ে নামেনি শাহরুখের। নিজের কাজের প্রতি ডেডিকেটেড, আবেগতাড়িত। দেখেছে সমাজ। একের পর এক প্রজন্ম। তাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের আইকন হিসেবে দাঁড় করিয়েছে লোকটাকে। অভিনেতা নয়, মানুষ শাহরুখ খান। কোনও যুবক ত্রিকোণ প্রেমে পিছিয়ে আসছে বুকে পাথর চেপে... তখন তার মনে পড়ছে ‘কভি হাঁ কভি না’র সুনীলকে। সম্পর্কের সঙ্গে যখন সে লড়াই করছে সমাজের সঙ্গে... সেখানে ‘দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে যায়েঙ্গে’র রাজ এসে হাত ধরছে। ছোটো শহর থেকে জনসমুদ্রে ভেসে কেউ প্রতিষ্ঠিত হতে চাইছে, তখন রাজুর গেয়ে যাওয়া কলি ভেসে আসছে কানে... ‘মেরি মনজিল দূর হ্যায়, পর যানা জরুর হ্যায়।’ প্রেমিকা চেয়েছে, আমার স্বপ্নের সাথী হোক শাহরুখের মতো। মা প্রশ্ন করেছে, আমার ছেলে কেন তোমার মতো হল না? ভাই খুঁজেছে কাঁধে রাখার মতো হাত... যে বলবে, ‘ম্যায় হুঁ না।’ বাবা ভেবেছে, আমার ছেলে হোক তোমার মতো। দিনভর হুল্লোড় করুক। কিন্তু দিনের শেষে সংস্কার ভুলে যাবে না। ছেলে ভেবেছে, আমার বাবা কেন শাহরুখ খানের মতো হবে না। মাথার উপর আকাশ ভেঙে পড়লেও যে আয়রন ডোম হয়ে দাঁড়াবে। বলবে, ‘বেটে কো হাত লাগানে সে পেহলে বাপ সে বাত কর।’ ‘জওয়ান’ ছবিতে এই ডায়লগটা ছিল একজন বাবারই লেখা। যার ছেলেকে মাদক মামলায় পরানো হয়েছিল আইনের শেকল। তখন বাবা কিন্তু আইনের পথেই উদ্ধার করে এনেছিলেন ছেলেকে। একটা শব্দ খরচ করেননি প্রকাশ্যে। তাঁর ভক্তকুলকে উসকানি দেননি। শুধু দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে গিয়েছিলেন। ২০১৩ সালের চেন্নাই এক্সপ্রেসের পর একটাও হিট ছিল না। মুখ থুবড়ে পড়েছে ফ্যান, জিরো। তারপর ছেলে আরিয়ানের নামে কেচ্ছা। শাহরুখ তাও শান্ত। ২০২০ সালের ২০ নভেম্বর যখন তিনি যশ রাজ স্টুডিওর অফিসে ঢুকলেন, তখনও তাই। আদিত্য চোপড়া বললেন তাঁকে, ‘একটা ছবি বানাব। করবে? অ্যাকশন।’ শাহরুখ অবাক দৃষ্টিতে তাকালের আদির দিকে। ২৫ বছর আগের দৃশ্যগুলো যেন স্লাইড শোয়ের মতো চলে গেল সামনে দিয়ে। তাঁর অ্যাকশন হিরো হওয়ার স্বপ্ন, সেখান থেকে ডিডিএলজে’র রাজ হয়ে যাওয়া, নেগেটিভ হিরো থেকে রোমান্টিক নায়কে বদলানো... এবার কি তাহলে সত্যিই অন্যরকম কিছু হবে? অন্যরকমই অপেক্ষা করে ছিল বটে। ছবি রিলিজের আগেই দীপিকার গেরুয়া পোশাক বিতর্ক, পাঠান নাম নিয়ে আপত্তি, বয়কট বলিউডের ডাক, হলের সামনে বিক্ষোভ... তাও শান্ত শাহরুখ। উত্তর আসবে। বিগ স্ক্রিনে। প্রথম দিন ৫০ কোটির কালেকশন আশা করেছিল যশ রাজ স্টুডিও। কিন্তু হল ৭৫ কোটি। পাঠান হিট। আর তারপর জওয়ান। কোথাও কোথাও ছাপিয়ে গেল পাঠানকেও। শাহরুখ খান বুঝিয়ে দিলেন, তিনি রাজনীতির মধ্যে নাই থাকতে পারেন, কিন্তু সস্তার রাজনীতিকে যেমন খুশি লাট খাওয়াতে পারেন। লোকে বলল, দ্য কিং ইজ ব্যাক। রিটার্ন অব দ্য কিং। সত্যিই কি তাই? রাজা বিদায় কবে নিয়েছিলেন? পাঁচটা সিনেমা বক্স অফিসে না চলা মানে শাহরুখ খান ফুরিয়ে যায় না। তিনি ওই সময়টা রান্না শিখেছেন, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন, ওয়ার্ক আউট করেছেন, প্রচুর পড়েছেন, আর অপেক্ষায় থেকেছেন... সঠিক সময়ের। শান্ত। স্থির। কেরিয়ারের ৩৫ বছর কাটিয়ে ফেলার পর প্রথম জাতীয় পুরস্কার। ‘জওয়ান’-এর জন্য। সেখানেও বাড়তি উচ্ছ্বাস নেই। পেতে পারতেন ‘কভি হাঁ কভি না’র জন্য। কিংবা স্বদেশ, মাই নেম ইজ খান, চক দে ইন্ডিয়া...। হয়নি। তাতে কী? সময় আসবে। সময় এল।
শাহরুখ কতগুলো সিনেমা করেছেন, তার কতগুলো হিট... এই সব প্রশ্ন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের দৌড়ে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। রাজেশ খান্না, দিলীপ কুমার, অমিতাভ বচ্চন... তিন প্রজন্মের তারকা তাঁরা। কিন্তু তারপর? আরও তিনটে প্রজন্ম পেরিয়ে গিয়েছে। স্টারের নাম বদলায়নি। তিনি শাহরুখ খান। ‘লাস্ট অব দ্য স্টারস’। সাড়ে ১২ হাজার কোটির মালিকানা, একের পর এক হিট তাঁর সাফল্য নয়। শাহরুখ খান সফল, কারণ তিনি মানুষের মধ্যে পৌঁছে গিয়েছেন। হিট ছবি নয়, মানুষ পেয়েছেন তিনি। প্রত্যেকের জীবনের দৌড়ে তাঁর সঙ্গে আম আদমি নিজেকে রিলেট করেছে। কানেক্ট করেছে। মনে করেছে, তার সফরও তো শাহরুখ খানের থেকে আলাদা কিছু নয়! স্ত্রী-ছেলেকে ইডেনে ম্যাচ দেখতে পাঠানো ওই ভদ্রলোকও তো তাই। কৈশোর থেকেই দেখেছেন তিনি শাহরুখকে... পড়েছেন, জেনেছেন তাঁর সম্পর্কে। তাঁর স্ট্রাগল সম্পর্কে। ভেবেছেন, শাহরুখ খান পারলে আমিও পারব। তার মানে কি অভিনয়ের মঞ্চে? না, তা নয়। মঞ্চ যাই হোক না কেন, লড়াই এবং লড়াইয়ের মানসিকতা যেন শাহরুখ খানের মতোই হয়। দিল্লি মধ্যবিত্ত পরিবারের সাধারণ এক সদস্য যদি আজ ‘দি এসআরকে’ উঠতে পারে, তাহলে তা নিজ নিজ ক্ষেত্রে যে কেউ পারবে। পরিশ্রম করলেই। প্রত্যেকে নিজের নিজের ফিল্ডে শাহরুখ খান হতে পারেন। আলবাৎ পারেন। আর এটা দুনিয়াকে শাহরুখ নিজেই শিখিয়েছেন। ট্যালেন্ট থাকলে তা লোকে চিনবেই। তার জন্য সেলিব্রিটি বাবা-মায়ের দরকার নেই। ‘অগর কিসি চিজ কো দিল সে চাহো, তো পুরি কায়নাত উসে তুমসে মিলানে কি কোশিশ মে লগ যাতি হ্যায়।’
শাহরুখ খান স্টার। সুপারস্টার। এবং ‘শেষ স্টার’ হতে পারেন। কিন্তু এই সবের আগে তিনি মধ্যবিত্তের ইগো। প্রত্যেক মধ্যবিত্ত পুরুষ চায় একদিন বড় হতে। কতটা বড়ো? মুম্বই কা কিং? না, একটা শহর, একটা রাজ্য, একটা দেশ নয়... গোটা বিশ্ব। পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ একটা ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, ‘বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গিয়েছি। কত বড়ো বড়ো নাম সেখানে। লিওনার্দো ডি-ক্যাপ্রিও পর্যন্ত। কিন্তু যাঁকে দেখার জন্য উন্মত্ত মানুষের ভিড়... দীর্ঘ লাইন... তিনি শাহরুখ খান।’ হলিউডে সিনেমা করতে চাননি তিনি। ইংরেজি জানেন না বলে মজা করেছেন, তারপর ভয়ঙ্কর কনভিকশনের সঙ্গে বলেছেন, হলিউডে যাওয়া আমার লক্ষ্য নয়। যদি যেতেই হয়, আমার দেশকে, আমার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে বিশ্বের দরবারে নিয়ে যাব। শাহরুখ খান এখানেই আলাদা। এখানেই তিনি সফল। কারণ, বিশ্বের দরবারে ভারতের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর তিনিই। সেই প্রচার তাঁকে করতেও হয় না। যারা বিদেশে গিয়েছে, তারাই এই বাস্তবের সাক্ষী। শ্রেয়া ঘোষাল, দিলজিৎ দোসাঞ্জ বা গুলশন গ্রোভার... যে কোনও নাম ভেবে নেওয়া যেতে পারে। বিদেশে গিয়ে একটিই প্রশ্নের মুখে পড়েছেন তাঁরা... ‘ইন্ডিয়া! তুমি শাহরুখ খানের দেশ থেকে এসেছ? তুমি শাহরুখকে চেনো?’ গুলশন গ্রোভার গিয়েছেন মরক্কোয় শ্যুটিংয়ে। কাসাব্লাঙ্কা থেকে ওয়ারজাত এসেছেন। ফ্লাইটের সময় আছে। ভাবলেন, শহরটা ঘুরে দেখলে কেমন হয়? ওখানে ভিসা অন অ্যারাইভালের সুবিধা আছে। গেলেন তিনি ইমিগ্রেশনে। এক ভদ্রমহিলা বসে। গুলশন বললেন, ‘কয়েক ঘণ্টার জন্য শহরটা ঘুরে দেখতে চাই।’ মহিলা উত্তর দিয়েছিলেন, ‘নো ভিসা।’ অবাক হয়েছিলেন গুলশন। কেন রে বাবা? সবাই তো যাচ্ছে। আমাকে দেবে না কেন? খুব নম্রভাবে জিজ্ঞেস করলেন তিনি... ‘এই দেখুন, আমার ওয়ার্ক ভিসা আছে। আমি শুধু কয়েক ঘণ্টার জন্য শহরটা ঘুরে দেখতে চাই।’ ওই মধ্যবয়স্কা অফিসার আবার মাথা নাড়লেন। গুলশন প্রশ্ন করলেন, ‘কিন্তু কেন?’ তখন চিৎকার করে তাঁর উত্তর, ‘তুমি শাহরুখ খানকে মারো। তোমাকে ভিসা দেব না।’ গুলশন গ্রোভারের তো মাথায় হাত। এই কারণ! তিনি তখন বোঝাতে শুরু করলেন, ‘আরে ডুপ্লিকেট সিনেমায় আমি ওকে মারিনি। ওটা শ্যুটিং। শাহরুখ আমার বন্ধু!’ মোবাইলে শাহরুখের সঙ্গে ছবি দেখিয়ে তারপর ভিসা পেয়েছিলেন গুলশন। আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকা... সর্বত্র এমনই ফ্যানবেস শাহরুখের। তারা কিং খানের চুলের স্টাইল নকল করে, জওয়ান না পাঠান বেশি ভালো, সে নিয়ে তর্ক করে, দু’হাত ছড়িয়ে সিগনেচার পোজ দিয়ে ছবি তোলে। ব্রেট লি, মিচেল মার্শ, এ বি ডি ভিলিয়ার্স, এড শিরিন, বাভুমা, গর্ডন র্যামসে... ওই আইকনিক পোজ দিয়ে ছবি তোলেন। আর সাধারণ মানুষ তর্ক করে, কোন ছবিতে এই পোজ প্রথম দেখা গিয়েছিল। শাহরুখ খান তাই কোনও একজন অভিনেতা নন। তিনি সেন্টিমেন্ট। কিং খান নিজেও সেটা বোঝেন। তাই ধীরে ধীরে নিজেকে পরিণত করেছেন তিনি। মানুষের জন্যই। এক সময়ের উদ্ধত শাহরুখ তাই শান্ত হয়ে যান মাঝ সমুদ্রের মতো। কেউ তাঁকে গালি দিলেও রিঅ্যাক্ট করেন না। বলেন, ‘আমি নিশ্চয়ই কোনও ভুল করেছি। সেই জন্য ওরা আমাকে গালি দিচ্ছে।’ মানুষের ভালোবাসার সামনে মাথা নত করেন। হেমা মালিনী থেকে নবাগতা নীতাংশি... মঞ্চে ওঠার সময় হাত বাড়িয়ে দেন। তাঁরাও আশ্বস্ত হন, শাহরুখ আছেন। পড়ে যেতে গেলে যিনি ধরে ফেলবেন। জুতো খুলে গেলে নিজেই তুলে আনবেন। রানির আঁচল মাটিতে লুটিয়ে হোঁচট খাওয়ার মতো অবস্থা হলে সঙ্গে সঙ্গে ধরে নেবেন, কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে রাখির পাশে দাঁড়িয়ে বাংলায় বলবেন, ‘ও আমার দেশের মাটি’... আর ততই মানুষের মনে আরও বেশি জায়গা করে নেবেন।
দীপিকা পাড়ুকোন বলেন, ‘আমার প্রথম সিনেমা ছিল ওম শান্তি ওম। তখন শাহরুখ আমাকে একটা বিষয় শিখিয়েছিল... রেকর্ড ভাঙার জন্য কাজ করবে না। কাজ করবে ভালো কিছু দেওয়ার জন্য... ওই মানুষগুলোকে, যারা তোমার অপেক্ষায় আছে। তারা আনন্দ পেলেই তোমার সাফল্য।’ মানুষ... এটাই প্রাপ্তি শাহরুখ খানের। এই ৬০ বছরে পৌঁছেও। জন্মদিনে মন্নতের সামনেটা ভক্তের বান ডাকে। বাড়ির দরজার বাঁদিক-ডানদিক মিলিয়ে এক কিলোমিটার শুধু কালো মাথা। কেউ আগের রাতে এসে দাঁড়িয়েছেন, কেউ ভোর। সবার লক্ষ্য একটাই... উনি একবার এসে উপরের রেলিংটা ধরে দাঁড়াবেন। এক ঝলক দেখব তাঁকে। হাত দুটো একবার ছড়িয়ে আইকনিক পোজ দেবেন। আর কী চাই? আর শাহরুখ নিজে? তিনিও তো এই অপেক্ষাতেই থাকেন। যারা তাঁকে স্টার বানিয়েছেন, তাদের উপেক্ষা করা শাহরুখ খানের সংস্কার নয়। শুধু ওই মুখগুলোর জন্য তিনি ফুরিয়ে যান না। হেরে যান না। উৎসাহ, পরিশ্রম বাড়তে থাকে... টিন এজারের মতো। তাই শাহরুখ খানের বয়স বাড়ে। তিনি বৃদ্ধ হন না। কখনও না। তাই ষোড়শীর আবেগের সঙ্গে পাল্লা দেয় ষাটোর্ধ্বের স্নেহ। ফার্স্ট ডে ফার্স্ট শোয়ের টিকিটের লাইনে আঠারোর পিছনে দাঁড়িয়ে যান পঞ্চাশের প্রৌঢ়। ইডেন থেকে ফিরে বছর দশেকের ছেলেটি উচ্ছ্বাসের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বলছে, ‘জানো বাবা, আজ সামনে থেকে শাহরুখ খানকে দেখলাম।’ প্রজন্ম বদলাবে। কিন্তু তিনি আছেন। থাকবেন... ‘বস ইতনা সা খোয়াব হ্যায়’।
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : উজ্জ্বল দাস