সুদীপ্ত রায়চৌধুরী, কলকাতা: রবীন্দ্রনাথের গোরা আর বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা আড্ডা দিচ্ছেন। এককালে বাংলাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল যে দু’টি চরিত্র, বর্তমানে তাঁরা বিস্মৃতপ্রায়। কেউ মনেই রাখেনি। সেই আক্ষেপ নিয়েই কথাবার্তা চালাচ্ছিলেন দু’জনে। তাঁদের কথা কানে এসেছিল বলেই কি লেকটাউন অধিবাসীবৃন্দ পুজোর থিম করল, ‘তবু মনে রেখো’? মণ্ডপে শোনানোর ব্যবস্থা করল ‘গোরা’ আর ‘কপালকুণ্ডলা’র কথাগুলি? এই কাজ হল বলেই, গোরার মেঘমন্দ্রিত গলার আওয়াজ আর কপালকুণ্ডলার ঝরনার জল পড়ার মতো রিনরিনে কণ্ঠস্বর মিলেমিশে সঙ্গীতের মতো অনুরণন তুলবে, আবহসঙ্গীত নয় উপন্যাসের এই দুই মানব-মানবীর কণ্ঠস্বরই এ পুজোর অর্ঘ্য হয়ে উঠবে।
মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ট্যাব আর ইন্টারনেট—নিত্যসঙ্গী এসব গ্রাস করেছে সব। অডিও বুক, সোশ্যাল মিডিয়া, ভিডিও কনটেন্টের ভিড়ে বই পড়া হয় না। ভুলতেই বসেছে সবাই যে, ভালো বই চিন্তা করতে শেখায়, কল্পনা প্রসারিত করে, কঠিন পরিস্থিতিতে পরিণত হতে সাহায্য করে। সে কথা মনে করিয়েই লেকটাউন অধিবাসীবৃন্দ আশ্রয় নিয়েছে রবীন্দ্রনাথের-বঙ্কিমচন্দ্রের। এবার তাদের পুজো ৬৩ বছরে পা দিয়েছে। শিল্পী সুবল পাল। তিনি বললেন, ‘লাইব্রেরির আদলে হচ্ছে মণ্ডপ। রাখা হবে অসংখ্য বই। মণ্ডপের ভিতর পুরনো ছাপাখানা। সেখান থেকে বইয়ের পাতা উড়ে যাচ্ছে। ভাসছে আকাশে।’ পুজো উদ্যোক্তা দেবাশিস দে জানান, ‘বই তো আসলে আমাদের আকাশে উড়তেই শেখায়। এখানে দুর্গা নিজেও বইয়ের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছেন।’
লেকটাউনের আর একটি পুজোও এবার চমকে দিতে তৈরি। সে পুজো হল শ্রীপল্লি ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। তাদের থিম ‘নবীকরণ’। শিল্পী তন্ময় হাজরা। তিনি জানান, নবীকরণ শব্দের অর্থ নবায়ন। অর্থাৎ পুরনো থেকে নতুন অভিমুখে যাত্রা। সেই যাত্রাপথকেই ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে। শিল্পীর কথায়, ‘কাগজ থেকে ডিজিটাল মাধ্যম—খবরের এই বিবর্তনকেই ধরার চেষ্টা করেছি আমরা। মণ্ডপের সামনে থাকছে একটা সাইকেল। খবরের কাগজের সঙ্গে সাইকেল আসলে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে। থাকবে হকারদের প্রস্তুতি পর্ব। কাগজ আসে সকালে। কিন্তু মাঝরাতে প্রেস থেকে বেরয় তা। বাড়ি বাড়ি বিলি করেন হকাররা। সেই কর্মব্যস্ততাকে তুলে ধরা হয়েছে কাঠ, প্লাই, ফাইবারের মডেল দিয়ে। চায়ের দোকান বা সেলুনে বসে কাগজ পড়েন যাঁরা থাকছেন তাঁরাও। পরের পর্যায় রাখা হয়েছে মোবাইলে খবর দেখা। এখন কাগজ এবং ডিজিটাল মাধ্যম দুটোই জনপ্রিয়। প্রতিমার সামনে দেখা যাবে সংবাদের এই দুই মাধ্যমের মেলবন্ধন। প্রায় ১০ লক্ষ সংবাদপত্র দিয়ে তৈরি হচ্ছে মণ্ডপ। একনজরে দেখলে মনে হবে, প্রতিমা খবরের কাগজ দিয়েই তৈরি। কমিটির সম্পাদক শীর্ষেন্দু হাজরা জানান, শহর বদলাচ্ছে। বদলাচ্ছে জীবনযাত্রা। প্রযুক্তির হাত ধরে যে বিবর্তন তা নবীকরণ থিমের মধ্য দিয়ে দেখানো হচ্ছে।