অতি ছোট জীবন্ত কিছু থেকে বড় আকারের জীব সৃষ্টি হলে প্রাচীন লাতিন ভাষায় তাকেই বলা হতো জার্মান। শব্দটির অর্থ বীজ। ইংরেজি ভাষায় শব্দটিকে একটু ছোট করে বলা হয় ‘জার্ম’।
অতি ছোট জীবন্ত কিছু থেকে বড় আকারের জীব সৃষ্টি হলে প্রাচীন লাতিন ভাষায় তাকেই বলা হতো জার্মান। শব্দটির অর্থ বীজ। ইংরেজি ভাষায় শব্দটিকে একটু ছোট করে বলা হয় ‘জার্ম’।
অনেকে মনে করেন, এই শব্দের সঙ্গে প্রাচীন জার্মান জাতির একটা সম্পর্ক আছে। প্রাচীনকালে জার্মানির পশ্চিমাংশে এক উপজাতির বসবাস ছিল। রোমান সাম্রাজ্যে তাদের পরিচয় ছিল জার্মানি হিসেবে। এই উপজাতি রোমানদের কাছে অসভ্য আর বর্বর হিসেবে কুখ্যাত ছিল। তাই তখন থেকেই বর্বর বা ক্ষতিকর কিছু বোঝাতে ইউরোপের অনেক দেশে ‘জার্মান’ শব্দটি ব্যবহার হতো। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকের দিকে অতিক্ষুদ্র কিছু একটা মানবদেহে রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল ইউরোপের মানুষ। সেই সময় জার্ম বা ‘রোগের বীজ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছিল। ১৭৯৬ সালে শব্দটি প্রথম ইংরেজিতে ব্যবহার হয়। জার্ম শব্দটির বাংলা জীবাণু। এই শব্দ তৈরি হয়েছে জীব ও অণু শব্দ দু’টি যোগ করে। অর্থাৎ সব ধরনের ক্ষুদ্র বা আণুবীক্ষণিক জীব বোঝাতে শব্দটির ব্যবহার শুরু হয়েছিল বলেই মনে হয়। তবে এখন শব্দটি শুধু সেই সব ক্ষুদ্র জীবের জন্যই ব্যবহার করা হয়, যারা অন্য জীবদেহে রোগ সৃষ্টি করতে পারে। জীবাণু বা অণুজীব প্রাণীজগতে যেমন আতঙ্কের বিষয়, তেমনই গবেষকদের কাছে এরা রহস্য।
তোমরা শুনলে অবাক হবে, ব্রিটেনে রয়েছে জীবাণুদের আস্ত একটা লাইব্রেরি। ইংল্যান্ডের উইল্টশায়ারে পোর্টন গ্রামের উত্তর–পূর্বে রয়েছে রোগ-জীবাণুদের সেই লাইব্রেরি। নাম, পোর্টন ডাউন। সেখানে সংরক্ষিত আছে ১০ হাজারের বেশি ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাক। ইবোলা, প্লেগ ও অ্যানথ্রাক্সের মতো ব্যাকটেরিয়াও রয়েছে এই জীবন্ত লাইব্রেরি নামে খ্যাত পোর্টন ডাউনে। সেখানে অত্যন্ত গোপনীয় ও সশস্ত্র পাহারায় সংরক্ষিত রয়েছে বিশ্বের বিপজ্জনক সব জীবাণু। শত বছরের পুরনো এই জীবন্ত লাইব্রেরিতে প্রাণঘাতী জীবাণু নিয়ে গবেষণা করেন গবেষকরা। তাঁরা যা করেন, তার অনেক কিছুই নাকি বিজ্ঞান-কল্পকাহিনির মতো।
ইংল্যান্ডের উইল্টশায়ারের স্যালিসবারির বাইরে পাঁচ মাইল দূরে এই পোর্টন ডাউন। ১৯১৬ সালে চালু হয়েছিল সাত হাজার একরের এই গবেষণাগার। শুরুতে এটি ছিল ব্রিটেনের সামরিক বিভাগের পরীক্ষামূলক স্টেশন। নাম দেওয়া হয়েছিল ‘রয়্যাল ইঞ্জিনিয়ার্স এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশন’। মূলত যুদ্ধের রাসায়নিক অস্ত্র পরীক্ষার জন্য খোলা হয়েছিল এই পরীক্ষাগার। এখানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের উপর জার্মানির প্রয়োগ করা রাসায়নিক অস্ত্র ক্লোরিন, মাস্টার্ড গ্যাস ও ফসজিন নিয়ে গবেষণা হতো। এই মারণাস্ত্র থেকে রেহাই পেতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা। শুধু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ নয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও ব্যবহার করা হয় এই পরীক্ষাগার। রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে প্রধান বিশ্ব শক্তিগুলি ১৯২৫ সালে জেনেভা প্রোটোকলে স্বাক্ষর করে। কিন্তু পাঁচের দশকে, শীতল যুদ্ধের সময়, পোর্টন ডাউনের বিজ্ঞানীরা দু’টি অভিনব রাসায়নিক এজেন্ট তৈরি করে ফেলেন। যার মধ্যে প্রথমটি এখনও মাঝে মাঝে মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়। এটিকে ‘সিএস গ্যাস’ বলা হয়। তবে এটি টিয়ার গ্যাস নামেই বেশি পরিচিত। কাঁদানে গ্যাস প্রাণঘাতী নয়। এখনও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে পোর্টন ডাউনে তৈরি অপর রাসায়নিক পদার্থটি ছিল অবশ্যই বিপজ্জনক।
বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর এটি গবেষণার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। একটি দ্বিতল ভবন এই পরীক্ষাগারের মূল কেন্দ্র। দেখতে অনেকটা হাসপাতালের মতো। তবে এখানে প্রবেশাধিকার খুব সীমিত। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় পরিচালিত হয় সবকিছু। পরীক্ষাগারের ভিতরে চারটি বিভাগ রয়েছে, যেগুলি রোগ-জীবাণুর বিপদের মাত্রার ঊর্ধ্বক্রম অনুসারে সাজানো। পরীক্ষাগারের ভিতরে প্রবেশ করতে পরতে হয় বিশেষ ধরনের পোশাক। এখানে কাজ করেন ৩ হাজারেরও বেশি বিজ্ঞানী। কেউ কেউ বলেন, দুনিয়ার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান।
বর্তমানে পোর্টন ডাউন নামে পরিচিত এই জীবন্ত লাইব্রেরিতে বিশাল বিশাল সব ধাতব পাত্রে সংরক্ষিত আছে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও ছত্রাক। এগুলি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়। পোর্টন ডাউনের সংগ্রহে আছে ৫ হাজার ৫০০ ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ৩০০ ধরনের ভাইরাস ও বিভিন্ন মানবকোষ। এগুলি অ্যান্টিবায়োটিক গবেষণা, আলঝাইমার ও ক্যান্সারের মতো রোগের চিকিৎসায় সাহায্য করে। কোভিড-১৯-এর সময়ে বিজ্ঞানীদের টিকা উদ্ভাবনে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এখানে প্রাণঘাতী ইবোলা নিয়ে গবেষণা করা হয়। গবেষণা করা হয় প্রাণঘাতী প্লেগ নিয়েও।